Homeটুডে টেকমিশরের ‘অক্টাগন’: পেন্টাগনের পর বিশ্বের নতুন সামরিক সদর দপ্তর?

মিশরের ‘অক্টাগন’: পেন্টাগনের পর বিশ্বের নতুন সামরিক সদর দপ্তর?

কায়রোর পূর্বে ২২ হাজার একরজুড়ে গড়ে ওঠা ‘দি অক্টাগন’ উদ্বোধন করেছে মিশর। কমপ্লেক্সটি শুধু আকারে বড় নয়; AI, কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল, নিরাপদ যোগাযোগ ও সংকট ব্যবস্থাপনার এক কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে একে।

কায়রো | ৫ জুলাই ২০২৬

মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি শনিবার দেশের নতুন কৌশলগত সামরিক কমান্ড সদর দপ্তর ‘দি অক্টাগন’ উদ্বোধন করেছেন। কায়রো থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার পূর্বে নিউ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যাপিটালে নির্মিত এই কমপ্লেক্সকে মিশর বিশ্বের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর হিসেবে তুলে ধরছে।

অক্টাগনের আগে পেন্টাগন

এতদিন ধরে বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক সদর দপ্তর ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগন। ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের নথি অনুযায়ী, পেন্টাগন প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন বর্গফুটের একটি বিশাল অফিস কমপ্লেক্স, যেখানে প্রায় ২৩,৯০০ কর্মী কাজ করেন; এবং এটি সরকারি প্রশাসনে ব্যবহৃত বিশ্বের বৃহত্তম অফিস ভবনগুলোর একটি।

পেন্টাগনের বিশেষত্ব শুধু আয়তন নয়, এর নকশাও। পাঁচটি সমকেন্দ্রিক রিং, ১৭.৫ মাইলের মতো করিডর, এবং এমন এক বিন্যাস—যার ফলে ভবনের যেকোনো দুই প্রান্তের মধ্যে হেঁটে যেতে দশ মিনিটেরও কম সময় লাগে। দীর্ঘদিন ধরে এটিই ছিল সামরিক সদর দপ্তরের ক্ষমতা, দক্ষতা ও প্রতীকী প্রভাবের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ।

অক্টাগনের বৈশিষ্ট্য

মিশরের রাষ্ট্রীয় তথ্যসেবা সংস্থা জানায়, অক্টাগন কমপ্লেক্সটি প্রায় ২২,০০০ ফেডান বা প্রায় ৯২ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এবং এতে ১৩টি সমন্বিত কৌশলগত ও লজিস্টিক জোন রয়েছে।

The Times of Israel-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই স্থাপনা আটটি আন্তঃসংযুক্ত অষ্টভুজাকার ভবনের সমন্বয়ে গঠিত, আর সেখান থেকেই এর নাম ‘The Octagon’। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, এটি কায়রোর পূর্বে অবস্থিত নিউ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যাপিটালের কেন্দ্রীয় অংশে দাঁড়িয়ে আছে।

মিশরীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কমপ্লেক্স এখন দেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিমান প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে একটি একক কমান্ড-পরিকাঠামোর মধ্যে আনছে। অর্থাৎ, এটি শুধু একটি ভবন নয়; বরং এক ধরনের “সেন্ট্রাল কমান্ড আর্কিটেকচার”।

কি কি প্রযুক্তি আছে?

এই নতুন সদর দপ্তরের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এর প্রযুক্তিগত স্তর। মিশরের রাষ্ট্রীয় তথ্যসেবার নথি অনুযায়ী, কমপ্লেক্সটিতে AI-powered systems রয়েছে, যা বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে বড় কমান্ড স্ক্রিনে ফলাফল দেখাতে পারে এবং রিয়েল-টাইম সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।

The Times of Israel-এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই সদর দপ্তরটি command, control, communications এবং artificial intelligence systems একত্রে ব্যবহার করবে; আর সেটিকে “state’s command system”-এর কোর বা কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফলে এটি যুদ্ধক্ষেত্রের রণকৌশল, জরুরি পরিস্থিতি, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃসংস্থাগত সমন্বয়—সবকিছুর জন্য একটি একীভূত প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে এর তাৎপর্য এখানেই: আধুনিক সামরিক সদর দপ্তর এখন শুধু অফিস বা দাপ্তরিক ভবন নয়; এটি ডেটা ফিউশন, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ, AI-সহায়িত বিশ্লেষণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্তের একটি কেন্দ্র। মিশর সেই ধারায় নিজেকে বসাতে চাইছে।

বিশ্বের আর কোথায় বড় সামরিক কমান্ড হাব আছে?

যুক্তরাষ্ট্রের আল উদেইদ এয়ার বেস, কাতার এখনো অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ড নোডগুলোর একটি। Financial Times-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক স্থাপনা; এখানেই US Central Command-এর Combined Air Operations Center এবং ব্রিটিশ RAF-এর Gulf headquarters অবস্থিত। ঘাঁটিতে ১০ হাজারের বেশি মার্কিন কর্মী রয়েছে। তবে এটি সদর দপ্তর-ধর্মী কমান্ড হাব হলেও, অক্টাগনের মতো স্থায়ী জাতীয় সামরিক সদর দপ্তর নয়।

চীনের “Beijing Military City” এখনো নির্মাণাধীন। Financial Times এবং Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি পেন্টাগনের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বড় হতে পারে এবং অন্তত ১,৫০০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এতে ভূগর্ভস্থ বাংকার ও কঠোর সুরক্ষাব্যবস্থা থাকবে—যা যুদ্ধকালীন কমান্ড সেন্টার হিসেবে এর ভূমিকাকে ইঙ্গিত করে।

অর্থাৎ, বর্তমানে পেন্টাগন ছিল দীর্ঘদিনের মানদণ্ড, মিশরের অক্টাগন নতুনভাবে সেই দাবি চ্যালেঞ্জ করছে, আর চীনের প্রকল্পটি ভবিষ্যতে এই প্রতিযোগিতাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

মিশরের জন্য এই প্রকল্পের গুরুত্ব কেবল অবকাঠামোগত নয়। নতুন প্রশাসনিক রাজধানীতে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নেওয়ার যে নীতি কায়রো নিয়েছে, অক্টাগন সেই বৃহত্তর পুনর্বিন্যাসের অংশ। পুরোনো রাজধানীর জনঘনত্ব, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও প্রশাসনিক চাপ কমিয়ে একটি কেন্দ্রীয়, প্রযুক্তিনির্ভর কমান্ড কাঠামো তৈরি করাই এর মূল উদ্দেশ্য বলে মিশরীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এটি মিশরের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিও বদলে দেওয়ার চেষ্টা। কারণ যুদ্ধ, সাইবার হুমকি, সীমান্ত নিরাপত্তা, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ সংকট—সবকিছু এখন দ্রুত তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। সেই অর্থে অক্টাগন মিশরের জন্য একটি কমান্ড সেন্টার, আর একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তাও।

সংক্ষেপে

আগে বিশ্বসামরিক সদর দপ্তরের প্রধান মানদণ্ড ছিল পেন্টাগন। এখন মিশর দাবি করছে, দি অক্টাগন সেই মানদণ্ড পেরিয়ে গেছে। আর পেন্টাগন, আল উদেইদ ও চীনের নির্মাণাধীন Beijing Military City—এই তিনটি উদাহরণ দেখাচ্ছে, আধুনিক সামরিক কমান্ড এখন আর কেবল অস্ত্র বা সেনাসংখ্যার বিষয় নয়; এটি অবকাঠামো, ডেটা, AI, নিরাপদ যোগাযোগ এবং সংকট ব্যবস্থাপনারও প্রতিযোগিতা।

তথ্যসূত্র

The Times of Israel, Egypt State Information Service, U.S. National Park Service, Reuters, Financial Times, এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments