Homeটুডে বাংলাশিক্ষার বাতিঘর ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত কিংবদন্তি শিক্ষাবিদ ওয়ালীউল্লাহ পাটোয়ারী

শিক্ষার বাতিঘর ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত কিংবদন্তি শিক্ষাবিদ ওয়ালীউল্লাহ পাটোয়ারী

সাত দশক ধরে একটি বিদ্যালয়কে গড়েছেন শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে; হারিকেন হাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা তদারকির অনন্য দৃষ্টান্ত

অনলাইন ডেস্ক

বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে যাঁদের অবদান প্রজন্মের পর প্রজন্ম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়, তাঁদের অন্যতম কিংবদন্তিতুল্য শিক্ষাবিদ ওয়ালীউল্লাহ পাটোয়ারী। চাঁদপুরের কৃতি এই সন্তান শুধু একজন প্রধান শিক্ষক ছিলেন না, বরং একজন শিক্ষাদর্শন নির্মাতা, আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর এবং শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পুরস্কার (বর্তমান স্বাধীনতা পদক) লাভ করেন।

জন্ম ও শৈশব

ওয়ালীউল্লাহ পাটোয়ারী ১৮৯৫ সালের ১৫ মার্চ (কিছু সূত্রে ১৯০৫ সাল উল্লেখ রয়েছে) চাঁদপুর জেলার বর্তমান ফরিদগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম জয়শ্রী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

শিক্ষা জীবন

গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ১৯১৯ সালে বাবুরহাট হাইস্কুলে ভর্তি হন। ১৯২৪ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯২৬ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ১৯২৯ সালে বিএসসি (B.Sc.) ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবনের শুরু

স্নাতক সম্পন্ন করার পর মতলবগঞ্জ জে.বি.এইচ.ই. স্কুলে তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তবে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ এবং শিক্ষাদর্শনে মুগ্ধ হয়ে মাত্র ২৪ দিনের মধ্যেই তাঁকে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

একটি বিদ্যালয়কে কিংবদন্তিতে রূপ দেওয়ার গল্প

১৯৩১ সালে তিনি মতলবগঞ্জ জে.বি. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে সময় বিদ্যালয়টি ছিল একটি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, কঠোর শৃঙ্খলা, শিক্ষার মানোন্নয়নে নিরলস প্রচেষ্টা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার ফলে বিদ্যালয়টি অল্প সময়েই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

তাঁর সময়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে মাধ্যমিক পরীক্ষার মেধাতালিকায় শীর্ষস্থান অর্জন করত, যা প্রতিষ্ঠানটির সুনামকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেয়।

শিক্ষাদানে ছিল অনন্য দৃষ্টান্ত

ওয়ালীউল্লাহ পাটোয়ারীর শিক্ষকতা ছিল কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

তিনি রাতের বেলা হারিকেন হাতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিতেন—কে পড়াশোনা করছে, কে করছে না। প্রয়োজনে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলতেন, শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতেন এবং পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করতেন।

একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর এই নিবেদন আজও বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

সাত দশকের নিবেদিত জীবন

তিনি প্রায় ৪০ বছর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে আরও প্রায় ৩০ বছর রেক্টর (আজীবন শিক্ষক) হিসেবে একই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

অর্থাৎ জীবনের প্রায় ৭০ বছর তিনি একই বিদ্যালয়ের শিক্ষা বিস্তার, প্রতিষ্ঠান গঠন এবং শিক্ষার্থী তৈরির কাজে উৎসর্গ করেন—যা বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল দৃষ্টান্ত।

খ্যাতিমান শিক্ষার্থীরা

ওয়ালীউল্লাহ পাটোয়ারীর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য শিক্ষার্থী পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তাঁর বিখ্যাত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তাঁর জামাতা ড. আবদুল মতিন পাটোয়ারী, যিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাহিত্যচর্চা

শিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি সমাজ, নৈতিকতা, মানবকল্যাণ ও শিক্ষাবিষয়ক প্রায় ১৫টি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর লেখায় আদর্শ মানুষ গঠন এবং সমাজ উন্নয়নের বার্তা প্রতিফলিত হয়েছে।

স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত

শিক্ষাক্ষেত্রে আজীবন অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে। এটি দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মান।

মৃত্যু

১৯৯৯ সালের ২৫ আগস্ট এই মহান শিক্ষাবিদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তাঁর আদর্শ, কর্মনিষ্ঠা এবং শিক্ষার প্রতি অসীম ভালোবাসা আজও অসংখ্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

শিক্ষা শুধু পেশা নয়, ছিল তাঁর জীবনদর্শন

ওয়ালীউল্লাহ পাটোয়ারী বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষার ওপর। তাই তিনি শুধু পাঠদান করেননি; মানুষ গড়ার আন্দোলনে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। আজও চাঁদপুরসহ সমগ্র বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক চাইলে একটি বিদ্যালয়ই নয়, একটি সমাজ এবং একটি প্রজন্মকে বদলে দিতে পারেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments