টেস্টের ১৫০ বছরের ইতিহাস ওলটপালট করতে হবে বাবরদের; সিলেটে জয়ের সুবাস পাচ্ছে টিম টাইগার্স
ক্রীড়া প্রতিবেদক, টুডে টিভি বিডি | ১৯ মে, ২০২৬
সিলেট — চা-বাগান ঘেরা সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টেস্ট ক্যারিয়ারের এক ঐতিহাসিক ও নান্দনিক সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন মুশফিকুর রহিম। তাঁর ১৩৭ রানের রেকর্ড গড়া ইনিংসের ওপর ভর করে দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৯০ রান সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ। ফলে সফরকারী পাকিস্তানের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়িয়েছে ৪৩৭ রানের এক আকাশসমান পাহাড়। টেস্ট ক্রিকেটের ১৪৯ বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এত রান তাড়া করে ম্যাচ জেতার কোনো রেকর্ড নেই। পরিসংখ্যান এবং মাঠের লড়াকু চিত্র—সব মিলিয়ে সিলেট টেস্টের তৃতীয় দিন শেষেই জয়ের সুবাস পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ।
🏏 মুশফিকের রেকর্ড ও লিটনের দারুণ সঙ্গ
২৬১৮তম এই আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচের তৃতীয় দিনে ৩ উইকেটে ১১০ রান নিয়ে খেলা শুরু করে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং বিপর্যয় এড়াতে দলের হাল ধরেন সাবেক অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম ও প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান লিটন দাস। পঞ্চম উইকেট জুটিতে এই দুই অভিজ্ঞ ব্যাটার স্কোরবোর্ডে মূল্যবান ১২৩ রান যোগ করেন। লিটন দাস ৬৯ রান করে আউট হলেও মুশফিক তুলে নেন তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের ১৪তম সেঞ্চুরি।
এই সেঞ্চুরির মাধ্যমে মুশফিকুর রহিম এককভাবে বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির রেকর্ড নিজের করে নিলেন। তিনি টপকে গেছেন ৭৭ টেস্টে ১৩টি সেঞ্চুরি করা মুমিনুল হককে। শেষ ব্যাটার হিসেবে আউট হওয়ার আগে ২৩৩ বলে ১২টি চার ও ১টি ছক্কার সাহায্যে ১৩৭ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেন ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’। সপ্তম উইকেটে তাইজুল ইসলামকে (২২) সঙ্গে নিয়ে আরও ৭৭ রানের জুটি গড়েন তিনি। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ১০২.২ ওভারে ৩৯০ রানে অলআউট হয়।
📊 পরিসংখ্যানের আয়নায় লক্ষ্য ও ইতিহাস
৪৩৭ রানের এই লক্ষ্য তাড়া করতে হলে পাকিস্তানকে টেস্ট ইতিহাসের ১৫০ বছরের পুরোনো বিশ্ব রেকর্ড ভাঙতে হবে। টেস্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ডটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের। ২০০৩ সালে সেন্ট জোন্সে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪১৮ রান তাড়া করে জিতেছিল তারা।
টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ডসমূহ
| দল | প্রতিপক্ষ | সাল | রান তাড়া |
|---|---|---|---|
| ওয়েস্ট ইন্ডিজ | অস্ট্রেলিয়া | সেন্ট জোন্স (২০০৩) | ৪১৮ রান |
| দক্ষিণ আফ্রিকা | অস্ট্রেলিয়া | পার্থ (২০০৮) | ৪১৪ রান |
| পাকিস্তান (নিজেদের সর্বোচ্চ) | শ্রীলঙ্কা | পাল্লেকেলে (২০১৫) | ৩৭৭ রান |
| চলতি ম্যাচের লক্ষ্য (পাকিস্তানের জন্য) | বাংলাদেশ | সিলেট (২০২৬) | ৪৩৭ রান |
বাংলাদেশের মাটিতে সর্বোচ্চ ৩৯৫ রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের (২০২১, চট্টগ্রাম)। তবে পাকিস্তানের নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান তাড়ার রেকর্ডটি ৩৭৭ রানের, যা তারা ২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে করেছিল। ফলে ম্যাচটি জিততে হলে বাবর আজমদের নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাস নতুন করে লিখতে হবে।
💬 ‘সবই সম্ভব’ বনাম ‘শৃঙ্খলা মেনে বোলিং’
তৃতীয় দিনের শেষ ভাগে জয়ের লক্ষ্যে নেমে পাকিস্তান ২ ওভার ব্যাটিং করে কোনো রান না হারিয়ে ০/০ স্কোরে দিন শেষ করেছে। ক্রিজে আছেন দুই ওপেনার আজান আওয়াইস এবং আবদুল্লাহ ফজল। শরিফুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদ দুজনেই নিজেদের প্রথম ওভার মেইডেন করেছেন।
ম্যাচের পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের স্পিনার তাইজুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে কিছুটা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন:
”আমরা যদি স্কোরবোর্ডে আরও ২০-৩০-৪০ রান যোগ করতে পারতাম, হয়তো দলের জন্য ভালো হতো। চতুর্থ ইনিংসে উইকেট এখনো ভালো আছে। তবে তারা যখন ৪৩৭ রানের এই বিশাল সংখ্যাটা দেখবে, তখন মাথায় অনেক চাপ কাজ করতে পারে। আমাদের শুধু শৃঙ্খলা মেনে ঠিকঠাক বোলিং করে যেতে হবে।”
অন্যদিকে, অবিশ্বাস্য এই লক্ষ্য তাড়া করা অসম্ভব কিছু নয় বলে মনে করছেন পাকিস্তানের পেস বোলিং কোচ উমর গুল। সংবাদ সম্মেলনে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন:
“ক্রিকেটে সবকিছুই সম্ভব, দুই দলেরই সম্ভাবনা আছে। আমাদের হাতে এখনো দুই দিন (১৮০ ওভার) সময় আছে। যদিও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত। ৪ ambition বা ৪ showcase দেখানোর কিছু নেই, ৪৩৭ রান তাড়া করতে হলে আমাদের সাহসী ও ইতিবাচক ক্রিকেট খেলতে হবে। দুই-তিনটি ভালো জুটি গড়তে পারলে আমরা জয়ের জন্যই খেলব, ড্র করতে চাই না।”
📌 শেষ দুই দিনের সমীকরণ
সিলেট টেস্টের এখনো পুরো দুই দিন বাকি। উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য উপযোগী থাকলেও চতুর্থ ও পঞ্চম দিনে স্পিনাররা বাড়তি সুবিধা পেতে শুরু করবেন। পাকিস্তান যেমন ম্যাচটি জিতে বিশ্ব রেকর্ডের অনন্য নজির গড়তে মরিয়া, তেমনি বাংলাদেশ শিবিরেও বইছে ঐতিহাসিক এক টেস্ট জয়ের সুবাস। পিন্ডি টেস্টের পর সিলেটেও পাকিস্তানি ব্যাটারদের ওপর নাহিদ রানা, তাইজুলদের আধিপত্য বজায় থাকলে জয় এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।
তথ্যসূত্র: ইএসপিএন ক্রিকইনফো লাইভ ম্যাচ সেন্টার।



