প্রতিরক্ষা বাজেট ও লজিস্টিক সাপ্লাই চেইনের গভীর বিশ্লেষণ; নিজস্ব উৎপাদনে বছরে সাশ্রয় শত কোটি টাকা, বাড়ছে অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান।
ঢাকা | ১৮ মে ২০২৬
“আর্মি কেন ফার্নিচার বানায়?” কিংবা “সেনাবাহিনী কেন জুতা বা টিনজাত খাবার তৈরি করে?”—সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এই প্রশ্নগুলো প্রায়ই আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। একটি পেশাদার সেনাবাহিনী যেখানে সীমান্ত রক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত, সেখানে তাদের এমন উৎপাদনমুখী বা বাণিজ্যিক কার্যক্রমে জড়ানো নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কৌতূহল স্বাভাবিক।
তবে সামরিক বিশ্লেষক এবং প্রতিরক্ষা বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একটি আধুনিক সেনাবাহিনী কেবল সম্মুখ সমরের কিছু সৈনিকের দল নয়; বরং এটি একটি সম্পূর্ণ ‘সেলফ-সাসটেইনিং সিস্টেম’ বা স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।
বাজেটের ওপর চাপ কমানো, জরুরি অবস্থায় বাজারের ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং নিজস্ব লজিস্টিক সাপ্লাই চেইন সচল রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গাজীপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (BMTF)-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজস্ব ফার্নিচার, বুট জুতা এবং ইউনিফর্ম উৎপাদন করে আসছে।
📌 প্রেক্ষাপট: একটি আধুনিক সেনাবাহিনীর ত্রিভুজ কাঠামো
একটি আধুনিক সেনাবাহিনী কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে হলে প্রথমে এর তিনটি মূল বিভাগ সম্পর্কে জানা জরুরি:
- Fighting Arms (কম্ব্যাট ফোর্স): ইনফ্যান্ট্রি (পদাতিক) এবং আর্মার্ড কোর (ট্যাংক ইউনিট), যারা সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়।
- Supporting Arms (সহায়ক শক্তি): আর্টিলারি (দূরপাল্লার কামান), ইঞ্জিনিয়ার্স কোর এবং সিগন্যালস কোর, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ ও কৌশলগত সহায়তা দেয়।
- Service Support Corps (লজিস্টিক ও লজিস্টিশিয়ান): আর্মি সার্ভিস কোর (ASC), অর্ডন্যান্স কোর, ইএমই (EME), আর্মি মেডিকেল কোর এবং আর্মড ফোর্সেস নার্সিং সার্ভিস। এই বিভাগের কাজ হলো পুরো বাহিনীকে সচল রাখা। খাবার, জ্বালানি, পরিবহন, চিকিৎসা, এবং আসবাবপত্রসহ সব ধরনের লজিস্টিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এই উইংয়ের মূল দায়িত্ব।
📊 মূল বিশ্লেষণ: ৪১ হাজার কোটি টাকার প্রতিরক্ষা বাজেট ও লজিস্টিকস
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের সামগ্রিক ডিফেন্স বা প্রতিরক্ষা বাজেট ৪০,৬৯৮ কোটি টাকা। এই বিশাল বাজেটের ভেতরের আর্থিক সমীকরণটি বিশ্লেষণ করলে ব্যয়ের খাতগুলো স্পষ্ট হয়:
- পরিচালন ব্যয় (Operating Expenses): প্রায় ৩৭,৮১২ কোটি টাকা (যার বড় অংশই যায় রেশন, পেট্রোল, চিকিৎসা এবং রক্ষণাবেক্ষণে)।
- উন্নয়ন ব্যয় (Development Expenses): ৯১৬ কোটি টাকা।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট উপাত্ত অনুযায়ী, বেতন-ভাতার বাইরে সামগ্রিক বাজেটের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যয় হয় লজিস্টিক সাপোর্টে।
লজিস্টিক খাতের আনুমানিক বার্ষিক ব্যয় বিন্যাস:
- রেশন ও খাদ্য সরবরাহ: ২,৫০০ – ৩,২০০ কোটি টাকা (প্রায় ২ লক্ষাধিক সদস্যের দৈনিক ক্যালরি নিশ্চিতকরণ)।
- জ্বালানি (POL): ১,৮০০ – ২,২০০ কোটি টাকা (ট্যাংক, এপিসি, ট্রাক ও এভিয়েশন মুভমেন্ট)।
- অস্ত্র ও গোলাবারুদ (অপারেশনাল): ৪,০০০ – ৫,৫০০ কোটি টাকা (ট্রেনিং ও রি-প্লেনিশমেন্ট)।
- চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ: ৮০০ – ১,২০০ কোটি টাকা (সিএমএইচসহ সামরিক হাসপাতাল পরিচালনা)।
- ফার্নিচার ও ফিক্সচার: ৩৫০ – ৫০০ কোটি টাকা (নতুন ইউনিট স্থাপন এবং পুরাতন আসবাবপত্র প্রতিস্থাপন)।
🔎 বিশ্লেষণ: কেন বাইরে থেকে না কিনে নিজেদের ফার্নিচার নিজেরা বানায়?
সেনাবাহিনী যদি বার্ষিক ৫০০ কোটি টাকার ফার্নিচার ও ফিক্সচার বাজারের বড় বড় বেসরকারি ব্রান্ড বা শিল্পপতিদের কাছ থেকে ক্রয় করতো, তবে সরকারি কোষাগারের ব্যয় অন্তত ২০% থেকে ৩৫% বেড়ে যেত। নিজস্ব উৎপাদনে সাশ্রয়ের প্রধান কারণগুলো হলো:
- মিডলম্যান ও টেন্ডারিং ওভারহেড হ্রাস: সাপ্লাই চেইনে মধ্যস্বত্বভোগী না থাকায় এবং নিজস্ব জনবলে উৎপাদন করায় বড় বড় টেন্ডার প্রক্রিয়াকরণের প্রশাসনিক খরচ (Administrative Cost) প্রায় শূন্যে নেমে আসে।
- সাপ্লাই চেইন নিরাপত্তা (Price Shock থেকে রক্ষা): যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বাড়লে বেসরকারি ভেন্ডররা সরবরাহ বন্ধ করতে পারে। নিজস্ব স-মিল (Sawmill) ও রিজার্ভ স্টক থাকায় আর্মি এই ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকে।
- মান নিয়ন্ত্রণ (Military Grade QC): সামরিক ব্যারাকে ব্যবহারের জন্য সাধারণ বাজারের চেয়ে অনেক বেশি টেকসই ও নির্দিষ্ট মানদণ্ডের আসবাবপত্র প্রয়োজন হয়। বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলো এই ‘মিলিটারি গ্রেড’ কোয়ালিটি দিতে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম চার্জ করে।
আর্থিক সাশ্রয়ের সমীকরণ: গাজীপুরের বিএমটিএফ (BMTF)-এর ফার্নিচার ফ্যাক্টরি নিজস্ব কাঁচামাল ও কারিগর ব্যবহার করায় প্রতি বছর প্রায় ১০০ থেকে ১২৫ কোটি টাকা সরকারি অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে। বিগত এক দশকে এই খাত থেকে রাষ্ট্রের অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
🌍 আন্তর্জাতিক তুলনা: গ্লোবাল আর্মি মডেল
বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশের সেনাবাহিনীই এই ‘সেলফ-সাসটেইনেবিলিটি’ মডেল অনুসরণ করে:
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য: ইউএস মিলিটারি এবং ব্রিটিশ আর্মি তাদের ব্যারাক ইক্যুইপমেন্ট, লজিস্টিকস এবং পোশাকের বড় অংশ নিজস্ব ডিফেন্স লজিস্টিকস এজেন্সি (DLA) বা অনুমোদিত ডেডিকেটেড কমিসারির মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে নিয়ন্ত্রণ করে।
- চীন ও ভারত: ভারতের ‘অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি বোর্ড’ (OFB) এবং চীনের পিএলএ (PLA) পরিচালিত বিভিন্ন উইং নিজস্ব জওয়ানদের জন্য বুট, ফার্নিচার, তাঁবু থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য নিজেরাই উৎপাদন করে, যা জাতীয় বাজেটের ওপর চাপ কমায়।
💬 বিশেষজ্ঞ মত ও সামরিক সক্ষমতার প্রশ্ন
প্রশ্ন উঠতে পারে, এই ফার্নিচার বা বুট জুতা বানানোর কারণে কি সেনাবাহিনীর মূল দায়িত্ব বা যুদ্ধ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে না?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে: > “বিএমটিএফ-এর ১৯টি ফ্যাক্টরি এবং মূল কার্যালয় মিলিয়ে মাত্র ৯৮ জন নিয়মিত সামরিক কর্মকর্তা ও সদস্য প্রেষণে (Deputation) কর্মরত আছেন। তারা মূলত লজিস্টিক ম্যানেজমেন্ট, কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং স্ট্র্যাটেজিক তদারকি করেন। প্রতিটি উৎপাদন ইউনিটে মাত্র ২ থেকে ৫ জন জেসিও (JCO) বা অফিসার থাকেন। বাকি শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয় বেসামরিক কারিগরদের দ্বারা। তদুপরি, এই দায়িত্বে যারা থাকেন তারা মূলত অর্ডন্যান্স কোর কিংবা ইএমই (EME)-এর সদস্য, যাদের মূল প্রাতিষ্ঠানিক কাজই হলো যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও স্টোরেজ ব্যবস্থাপনা। ফলে এটি সামরিক সক্ষমতায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না, বরং এটি তাদের বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ (Real-time Training)-এর অংশ।”
📌 কী জানা দরকার: অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান
সেনাবাহিনী পরিচালিত এই শিল্পগুলোর আরেকটি বড় সামাজিক প্রভাব হলো Veteran Rehabilitation বা অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের পুনর্বাসন।
- চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ: বিএমটিএফ এবং অন্যান্য সামরিক কারখানায় কয়েক হাজার বেসামরিক কর্মচারীর একটি বড় অংশই হলেন কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্য।
- কর্মসংস্থান সৃষ্টি: সামরিক কর্মকর্তা ছাড়াও এই প্রকল্পগুলোতে দেশের সাধারণ কারিগরি নাগরিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে (Employment Generation) ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
🔎 ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও শেষ কথা
সেনাবাহিনীর এই অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক মডেলটি মূলত কোনো বাণিজ্যিক মুনাফা বা বাজারের বেসরকারি খাতের সাথে প্রতিযোগিতার জন্য তৈরি হয়নি; এটি তৈরি হয়েছে Strategic Autonomy বা কৌশলগত স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্য। জরুরি অবস্থা বা যুদ্ধের সময় দেশের সেনাবাহিনী যেন লজিস্টিকস বা সাপ্লাই চেইনের জন্য বাজারের মুখাপেক্ষী হয়ে থমকে না দাঁড়ায়, সেটিই এর মূল লক্ষ্য। ফার্নিচার, বুট জুতা কিংবা টিনজাত খাদ্যের এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা দিনশেষে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজেটের ঘাটতি কমিয়ে জাতীয় অর্থনীতিকেই পরোক্ষভাবে সমৃদ্ধ করছে।
তথ্যসূত্র: প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (MoD) বার্ষিক বাজেট প্রতিবেদন ২০২৫-২৬, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (BMTF) প্রাতিষ্ঠানিক প্রোফাইল এবং গ্লোবাল ডিফেন্স লজিস্টিকস রিভিউ।



