শিশু মৃত্যুর মিছিল, ভেঙে পড়া হাসপাতাল ব্যবস্থা এবং প্রশ্নবিদ্ধ রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | মে ২০২৬
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের হামের প্রাদুর্ভাব এখন একটি গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা শহর, গ্রামাঞ্চল, বস্তি ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প — দেশের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে অত্যন্ত সংক্রামক এই ভাইরাস। হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন বাড়ছে শিশু রোগীর চাপ, মৃত্যুর সংখ্যাও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
তবুও এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে হামকে “জাতীয় মহামারী” ঘোষণা করা হয়নি। করোনাকালের মতো জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, ফ্রি চিকিৎসা, বিশেষ হাসপাতাল ব্যবস্থা বা জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত জরুরি স্বাস্থ্য পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছে না
বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন — যদি হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হয়, শত শত শিশু মারা যায়, হাসপাতাল ভরে যায় এবং ভাইরাস দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে আর কোন পর্যায়ে গেলে একটি রোগকে মহামারী হিসেবে বিবেচনা করা হবে?
📌 WHO-এর সতর্কবার্তা: ৫৮ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে হাম
World Health Organization-এর ২৩ এপ্রিল ২০২৬ প্রকাশিত Disease Outbreak Notice অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলাতেই হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
WHO জানিয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে, প্রায় ৩ হাজার ল্যাব-কনফার্মড রোগী পাওয়া গেছে এবং শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু।
সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা। ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি ও নিম্নআয়ের এলাকাগুলোতে সংক্রমণ ভয়াবহ আকার নিয়েছে।
🏥 হাসপাতালগুলোতে চাপ: বেড নেই, ওষুধ নেই, চিকিৎসক সংকট
রাজধানীর শিশু হাসপাতাল, সংক্রামক রোগ হাসপাতাল এবং জেলা হাসপাতালগুলোতে হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। এক প্রতিবেদনে দেখা যায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭০ শিশু ভর্তি হয়েছে।
অনেক হাসপাতালে একটি বেডে দুই থেকে তিনজন শিশু, অক্সিজেন সংকট, আইসোলেশন ওয়ার্ডের অভাব এবং পর্যাপ্ত নার্স ও শিশু বিশেষজ্ঞের সংকট দেখা যাচ্ছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, পরীক্ষা করাতে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে এবং দরিদ্র পরিবারগুলো চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে পারছে না। অনেক পরিবার শিশুর চিকিৎসা করাতে গিয়ে ঋণ নিচ্ছে, গবাদিপশু বিক্রি করছে বা জমি বন্ধক রাখছে।
⚠️ করোনার মতো জরুরি ব্যবস্থা কেন নেই?
করোনাকালে সরকার বিশেষ হাসপাতাল তৈরি করেছিল, ফ্রি টেস্ট ও চিকিৎসা দিয়েছিল, গণমাধ্যমে প্রতিদিন ব্রিফিং করেছিল এবং টিকাদান কর্মসূচিকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়েছিল।
কিন্তু বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবে জাতীয় জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা হয়নি, বিনামূল্যে সর্বজনীন চিকিৎসা চালু হয়নি, গণসচেতনতা প্রচার সীমিত, হাসপাতালভিত্তিক কেন্দ্রীয় ডাটা সিস্টেম দুর্বল এবং জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত টিকাদান কাভারেজ নেই।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এর একটি বড় কারণ হলো — হামকে এখনও অনেকেই “শিশুদের সাধারণ রোগ” হিসেবে দেখে, যদিও বাস্তবে এটি নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস, অন্ধত্ব এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
💉 কেন বাড়ছে হাম? ভ্যাকসিন ঘাটতি ও টিকাদানে ভাঙন
WHO, UNICEF এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান হামের বিস্তার মূলত “ইমিউনিটি গ্যাপ” বা টিকাদান ঘাটতির ফল।
কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে করোনাকালে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভ্যাকসিন সরবরাহ ঘাটতি, গ্রামাঞ্চলে সচেতনতার অভাব, শহুরে বস্তিতে স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা এবং অপুষ্টি ও ভিটামিন-এ ঘাটতি।
এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ MR টিকার কাভারেজ নেমে আসে প্রায় ৮০ শতাংশে এবং প্রায় ২ কোটি শিশু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
👶 সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা?
বিশেষজ্ঞদের মতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে পাঁচ বছরের নিচের শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, ভিটামিন-এ ঘাটতিতে থাকা শিশু, যেসব শিশু টিকা পায়নি এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় থাকা পরিবার। WHO জানিয়েছে, আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই “জিরো ডোজ” অর্থাৎ কোনো টিকাই পায়নি।
📊 হাম বনাম করোনা: পার্থক্য কোথায়?
| বিষয় | করোনা | হাম |
|---|---|---|
| সংক্রমণ ক্ষমতা | উচ্চ | অত্যন্ত উচ্চ |
| শিশু মৃত্যু | তুলনামূলক কম | অনেক বেশি |
| টিকা ছাড়া ঝুঁকি | মাঝারি-উচ্চ | অত্যন্ত উচ্চ |
| অপুষ্টিতে ঝুঁকি | মাঝারি | মারাত্মক |
| জটিলতা | ফুসফুস, রক্ত জমাট | নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণ, অন্ধত্ব |
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাসগুলোর একটি। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২–১৮ জন পর্যন্ত মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে।
🔎 সরকার এখন কী করতে পারে? বিশেষজ্ঞদের ১০ দফা সুপারিশ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে হবে।
১. জাতীয় স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা: হামকে সীমিত আকারের রোগ না ভেবে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
২. ফ্রি চিকিৎসা ও ওষুধ: করোনার মতো ফ্রি চিকিৎসা, ফ্রি ভর্তি, ফ্রি অক্সিজেন ও ফ্রি শিশু ওয়ার্ড চালু করতে হবে।
৩. জরুরি গণটিকাদান কর্মসূচি: দেশব্যাপী স্কুল, মসজিদ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন পর্যায়ে MR টিকা ক্যাম্প চালাতে হবে।
৪. মোবাইল মেডিকেল ইউনিট: গ্রামাঞ্চল ও বস্তিতে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম পাঠাতে হবে।
৫. ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্টেশন: WHO-এর গাইডলাইন অনুযায়ী আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন-এ নিশ্চিত করতে হবে।
৬. আলাদা হাম ওয়ার্ড: জেলা হাসপাতালে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করতে হবে।
৭. কেন্দ্রীয় ডাটা মনিটরিং: প্রতিদিন আক্রান্ত, মৃত্যু, বেড সংখ্যা ও টিকার মজুত নিয়ে জাতীয় ড্যাশবোর্ড প্রকাশ করতে হবে।
৮. গণসচেতনতা ক্যাম্পেইন: টেলিভিশন, মসজিদ, স্কুল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জরুরি স্বাস্থ্য বার্তা চালাতে হবে।
৯. বেসরকারি হাসপাতালকে সম্পৃক্ত করা: বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে নির্ধারিত ফিতে বা সরকারি ভর্তুকিতে চিকিৎসা দিতে বাধ্য করা যেতে পারে।
১০. খাদ্য ও পুষ্টি সহায়তা: অপুষ্ট শিশুদের জন্য জরুরি পুষ্টি সহায়তা চালু করতে হবে।
🌍 আন্তর্জাতিক সহায়তা ও জরুরি টিকাদান অভিযান
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে UNICEF, WHO এবং Gavi, the Vaccine Alliance-এর সহায়তায় জরুরি MR টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় ১৮টি উচ্চ ঝুঁকির জেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি যথেষ্ট নয়; আরও বড় পরিসরে দ্রুত কর্মসূচি চালানো প্রয়োজন।
📌 উপসংহার
বাংলাদেশে হামের বর্তমান বিস্তার শুধু একটি মৌসুমি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়; এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা, টিকাদান কাঠামোর ভাঙন এবং স্বাস্থ্য খাতের অসম প্রস্তুতির একটি বড় সতর্ক সংকেত।
যদি এখনই জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা, ব্যাপক গণটিকাদান, ফ্রি চিকিৎসা, হাসপাতাল সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কেন্দ্রীয় সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
করোনার সময় যেমন রাষ্ট্রীয় সমন্বয় ও জরুরি উদ্যোগের মাধ্যমে বড় সংকট মোকাবিলা করা হয়েছিল, তেমনি হাম মোকাবিলাতেও এখন প্রয়োজন দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ।
কারণ প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া শিশুর জীবন কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয় — এটি পুরো রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।



