দরিদ্র মানুষের শেষ আশ্রয় সরকারি হাসপাতাল; কিন্তু ‘বিনামূল্যের চিকিৎসা’ পেতে গিয়েও কেন গুনতে হচ্ছে হাজার হাজার টাকা? অনুসন্ধানে উঠে এলো দালালচক্র, বেড বাণিজ্য ও টেস্ট সিন্ডিকেটের চিত্র।
স্টাফ রিপোর্টার | টুডে টিভি বিডি
ঢাকা | ১৯ মে ২০২৬
“সরকারি হাসপাতালে সব ফ্রি”— বহু বছর ধরে সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে থাকা এই ধারণা বাস্তবে কতটা সত্য? রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে বিনামূল্যের চিকিৎসাসেবা থাকলেও বাস্তবে রোগী ও স্বজনদের বহন করতে হচ্ছে অসংখ্য ‘অদৃশ্য খরচ’। কোথাও বেড পেতে টাকা, কোথাও দ্রুত চিকিৎসার জন্য দালালের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। আবার হাসপাতালের ভেতরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ বা সীমিত দেখিয়ে রোগীদের পাঠানো হচ্ছে নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ মানুষই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির। অথচ চিকিৎসার নামে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির ভার সবচেয়ে বেশি বইতে হচ্ছে এই মানুষগুলোকেই।
🛏️ “বেড খালি নেই”— কিন্তু টাকার বিনিময়ে মিলছে সিট
রাজধানীর কয়েকটি বড় সরকারি হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, জরুরি বিভাগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও রোগীরা বেড পাচ্ছেন না। স্বজনদের অভিযোগ, “অফিসিয়ালি” বেড খালি না থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু লোকের মাধ্যমে টাকা দিলে দ্রুত বেডের ব্যবস্থা হয়ে যায়।
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে কথা হয় কুমিল্লা থেকে আসা এক রোগীর স্বজনের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন—
“তিন দিন ধরে মেঝেতে রোগী রেখে ছিলাম। পরে এক লোক এসে বলল ৪ হাজার টাকা দিলে বেড হবে। টাকা দেওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যেই বেড পাই।”
একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও। রোগীদের দাবি, হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মচারী ও দালাল মিলে গড়ে তুলেছে “বেড বাণিজ্য”।

🧪 টেস্ট সিন্ডিকেট: হাসপাতালের মেশিন ‘নষ্ট’, বাইরে টেস্ট বাধ্যতামূলক
সরকারি হাসপাতালগুলোতে কম খরচে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে টেস্ট করাতে বাধ্য করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রায়ই “মেশিন নষ্ট”, “কেমিক্যাল নেই” বা “আজ টেস্ট হবে না” — এমন অজুহাতে রোগীদের পাঠানো হচ্ছে নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।
ঢাকার এক সরকারি হাসপাতালের সামনে অবস্থানরত এক বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধি সরাসরি রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, কমিশনের ভিত্তিতে হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মচারী রোগী পাঠান এসব প্রতিষ্ঠানে।
ময়মনসিংহ থেকে আসা এক নারী রোগীর স্বামী বলেন—
“হাসপাতালে বলল সিটি স্ক্যান হবে না। বাইরে করাতে গিয়ে ৮ হাজার টাকা লাগছে। সরকারি হাসপাতালে এসেও যদি এত খরচ হয়, তাহলে গরিব মানুষ যাবে কোথায়?”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও জনবল সংকট, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং দুর্নীতির কারণে সেগুলোর পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না।
💊 “ফ্রি ওষুধ” তালিকায় আছে, কিন্তু রোগীকে কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে
সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণের কথা থাকলেও রোগীদের অভিযোগ— অধিকাংশ ওষুধই স্টকে থাকে না। চিকিৎসক প্রেসক্রিপশনে ওষুধ লিখে দিলেও হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে বলা হয় “শেষ হয়ে গেছে”।
ফলে বাধ্য হয়ে বাইরের ফার্মেসি থেকে চড়া দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
একজন বয়স্ক রোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—
“সরকার বলে ফ্রি চিকিৎসা। কিন্তু টেস্ট বাইরে, ওষুধ বাইরে, বেড পেতে টাকা— তাহলে ফ্রি কোথায়?”
👥 দালালচক্রের দৌরাত্ম্য: হাসপাতালের ভেতরেই সক্রিয় সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে হাসপাতালভিত্তিক দালালচক্রের ভয়াবহ সক্রিয়তা। অনেক দালাল রোগী আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ঘিরে ধরছে এবং “দ্রুত চিকিৎসা”, “ভালো ডাক্তার”, “সিটের ব্যবস্থা” ইত্যাদির প্রলোভন দেখাচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিশ্লেষকদের মতে, হাসপাতাল প্রশাসনের দুর্বল নজরদারি এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণেই এসব চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন—
“স্বাস্থ্যখাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে জবাবদিহিতার অভাব। সরকারি হাসপাতালগুলোতে দরিদ্র মানুষ সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হন। এই খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে।”
📊 এক নজরে অনুসন্ধানে যা উঠে এসেছে
- বেড পেতে অনানুষ্ঠানিকভাবে টাকা নেওয়ার অভিযোগ
- হাসপাতালের টেস্ট বাইরে করানোর সিন্ডিকেট
- দালালদের সক্রিয় উপস্থিতি
- ফ্রি ওষুধের সংকট
- দীর্ঘ অপেক্ষা ও চিকিৎসাসেবার অব্যবস্থাপনা
- নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
⚠️ প্রশ্নের মুখে ‘ফ্রি চিকিৎসা’ ব্যবস্থা
সরকারি হাসপাতাল দেশের কোটি মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল। কিন্তু সেখানে যদি রোগীকে প্রতিটি ধাপে হয়রানি, অনিয়ম ও অতিরিক্ত খরচের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে “স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য” — এই রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার কতটা বাস্তব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু নতুন ভবন বা যন্ত্রপাতি নয়— দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, দালালচক্র নির্মূল এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
টুডে টিভি বিডি-র অনুসন্ধানী টিম স্বাস্থ্যখাতের অনিয়ম নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। আপনার আশপাশের সরকারি হাসপাতালের অনিয়মের তথ্য, ছবি বা ভিডিও থাকলে আমাদের কাছে পাঠাতে পারেন।



