Homeটুডে নেশনমিটফোর্ডের সোহাগ হত্যা: এক বছরে বিচার শুরু হয়নি, পরিবার এখনো হুমকির মুখে

মিটফোর্ডের সোহাগ হত্যা: এক বছরে বিচার শুরু হয়নি, পরিবার এখনো হুমকির মুখে

অভিযোগপত্র জমা, সম্পূরক তদন্ত, আদালতে শুনানি—তারপরও কেন আটকে আছে বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলা?

ঢাকা | বিশেষ প্রতিবেদন

পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী লালচাঁদ ওরফে সোহাগকে পিটিয়ে ও ইট-পাথর দিয়ে থেঁতলে হত্যার ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেছে। সেদিনের ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, তা এখনও মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। কিন্তু ক্ষোভের সেই ঢেউয়ের বিপরীতে বিচারপ্রক্রিয়ার গতি খুবই ধীর। অভিযোগপত্র জমা পড়েছে, সম্পূরক তদন্তও হয়েছে, তবু আদালতে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়নি। এর মধ্যে নিহতের পরিবার বলছে, মামলা তুলে নিতে তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

এই দীর্ঘসূত্রতা শুধু একটি মামলার প্রশাসনিক জটিলতা নয়; এটি ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা, তদন্তের মান, এবং ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা—সবকিছুকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

এক বছরেও বিচার শুরু হয়নি কেন

মামলার নথি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর সোহাগের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। শুরুতে ২০ জনকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়। তদন্ত শেষে ২১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু আদালতে সেই অভিযোগপত্রে কিছু বানান ও তথ্যগত অসংগতি ধরা পড়ে। এরপর আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়।

এই পর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। পরে চলতি বছরের জুনে সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দিলে আদালত তা গ্রহণ করে। ২১ জুন মামলাটি ঢাকার মহানগর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে বিচারের জন্য ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। ১২ জুলাই অভিযোগ গঠনের শুনানির কথা রয়েছে।

অর্থাৎ, অভিযোগপত্র, সম্পূরক তদন্ত, আদালতে গ্রহণযোগ্যতা—সব মিলিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর আগেই সময় চলে গেছে প্রায় এক বছর।

তদন্তের গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন

বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়াউল হক বলছেন, অভিযোগপত্রে নাম-পরিচয়, বানান ও কিছু তথ্যগত অসংগতির কারণে সময় নষ্ট হয়েছে। তাঁর মতে, তদন্তেই ভুল ছিল, আর সেই ভুলের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্সের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুকও একই ধরনের সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আসামিদের নাম-পরিচয় সংশোধনে সময় ক্ষেপণ, বাবার নাম ও বয়স পরিবর্তন করে একজন আসামিকে অব্যাহতি পাওয়া—এসবই তদন্ত প্রক্রিয়ায় গাফিলতির ইঙ্গিত দেয়।

এ ধরনের মামলায় তদন্তের মান দুর্বল হলে বিচার প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই বিলম্বিত হয়। আর বিচার বিলম্বিত হলে ভুক্তভোগীর পরিবার যেমন ন্যায়বিচার থেকে দূরে সরে যায়, তেমনি সমাজেও দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়।

হুমকির অভিযোগে আরও উদ্বেগ

এই মামলার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, নিহতের পরিবার এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে অভিযোগ করেছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, পলাতক কয়েকজন আসামি এলাকায় ফিরে এসে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছেন।

বিথি নামের এক স্বজনের অভিযোগ, প্রধান আসামিদের একজন ইমরান পরিবারকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, “তোর মামাকে যেভাবে মারছি, তোদেরও মেরে বস্তায় ভরবো।” একই সঙ্গে আরেক অভিযুক্ত টিটু অনলাইন ও ফোনে হুমকি দিচ্ছেন বলেও পরিবার দাবি করেছে।

এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু মামলার চাপ সৃষ্টির প্রশ্ন নয়; বরং এটি সাক্ষী ও বাদীপক্ষকে ভয় দেখিয়ে বিচার বাধাগ্রস্ত করার প্রচেষ্টার দিকেও ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতিতে পরিবারকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

মামলার গতি কি ন্যায়ের সঙ্গে যাচ্ছে?

দীর্ঘসূত্রতায় বড় প্রশ্নটি হলো—একটি ভিডিওভিত্তিক, জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করা হত্যাকাণ্ডের বিচার কেন এখনও অভিযোগ গঠনের পর্যায়েই আটকে আছে?

আইনজীবী জিয়াউল হকের মতে, সরকারের পক্ষ থেকে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হলে এমন মামলার নিষ্পত্তি তুলনামূলক দ্রুত হতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের ফাঁকে ফাঁকেই ভুক্তভোগীর পরিবার অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে।

এখানে প্রশ্ন কেবল আদালতের সময়সূচির নয়; প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি সত্যিই এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে দ্রুত, কার্যকর ও নিরাপদ বিচার দিতে পারছে?

সোহাগ হত্যার তাৎপর্য

মিটফোর্ডের সোহাগ হত্যাকাণ্ড ছিল এমন একটি ঘটনা, যা সাধারণ জনতার চোখে শুধু একটি অপরাধ ছিল না; এটি ছিল প্রকাশ্য নৃশংসতা, দলবদ্ধ সহিংসতা এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জনমনে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বোঝা যায়—মানুষ শুধু বিচার চায়নি, চেয়েছিল দৃশ্যমান জবাবদিহি।

কিন্তু এক বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে, বিচার শুরুই হয়নি, আর পরিবারকে আবারও ভয়ের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, হত্যার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর যে সামাজিক ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, সেটি কি প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল?

এখন কী জরুরি

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি তিনটি পদক্ষেপ।

প্রথমত, অভিযোগ গঠনের শুনানি দ্রুত শেষ করে বিচার কার্যক্রম শুরু করা।
দ্বিতীয়ত, বাদীপক্ষ ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তৃতীয়ত, তদন্তে যেসব গাফিলতি হয়েছে, সেগুলোর জবাবদিহি নির্ধারণ করা।

কারণ, একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার শুধু আসামিদের শাস্তির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতারও পরীক্ষা।

শেষ কথা

সোহাগের পরিবার এক বছর ধরে অপেক্ষা করছে। আদালতে বিচার শুরু হয়নি, অভিযোগপত্রের ভুল শোধরাতে গিয়ে সময় গেছে, আর এর মধ্যে হুমকির মুখে পড়েছে ভুক্তভোগীর স্বজনরা। এই বাস্তবতা শুধু একটি মামলার বিলম্ব নয়; এটি আমাদের বিচারব্যবস্থায় গতি, নিরাপত্তা ও জবাবদিহির ঘাটতিকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে।

মিটফোর্ডের সোহাগ হত্যার বিচার শুরু না হওয়া তাই কেবল আইনি বিলম্ব নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। বিচার যদি শেষ পর্যন্ত না পৌঁছায়, তবে ভিডিওতে ধরা নৃশংসতা শুধু স্মৃতিতে থেকে যাবে, আর ন্যায়বিচার রয়ে যাবে ফাইলের ভাঁজে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments