২০২১ সালে চিত্রনায়িকা পরীমণিকে গ্রেফতারের অভিযান নিয়ে প্রথমবারের মতো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলেন র্যাবের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খাইরুল ইসলাম।
তিনি দাবি করেছেন, অভিযানের আগে ও ঘটনাস্থলে গিয়েও তিনি বারবার প্রশ্ন তুলেছিলেন—পরীমণির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, আর কেনই–বা তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে।
শুক্রবার ৭ জুলাই প্রকাশিত এক অনলাইন টকশোতে উপস্থাপিকা শারমিন চৌধুরীর সঙ্গে আলাপকালে খাইরুল ইসলাম বলেন, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশেই অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল। তবে তার নিজের মতে, অভিযানটি “যৌক্তিক ছিল না”।
খাইরুল ইসলাম বলেন, “নায়িকা পরীমণি ব্যক্তিগত জীবনে কী করেন না করেন, তা নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি মদ খান কি না, কী করেন, বাসায় কী আছে না আছে—এসব জানারও আমার প্রয়োজন ছিল না।”
তিনি জানান, ঘটনার দিন বাসায় ফেরার পথে তৎকালীন র্যাব ডিজি তাকে ফোন করে পরীমণিকে গ্রেফতারের নির্দেশ কার্যকর করতে বলেন। তখন তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, “স্যার, পরীমণিকে কেন ধরতে হবে? তার অপরাধটা কী? কোনো নির্দিষ্ট মামলা আছে?”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে তখন জানানো হয় পরীমণির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আছে এবং তিনি নাকি বিভিন্ন ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইল করতেন। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোনো মামলার কথা তাকে জানানো হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
খাইরুল ইসলাম বলেন, পরে এডিজি অপারেশনসের নেতৃত্বে একটি টিম পরীমণির বাসার দিকে যায়। সেই সময় পরীমণির লাইভ ভিডিওতে তিনি দেখেন, অভিনেত্রী অভিযোগ করছেন যে তার বাসায় হামলা চলছে। এরপর পরিস্থিতি বিবেচনায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তিনিও ঘটনাস্থলে যান।
ঘটনাস্থলে গিয়ে বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক ও মানুষের উপস্থিতি দেখে পরিস্থিতিকে তিনি “একটা বাজার অবস্থা” বলে বর্ণনা করেন। পরে পরীমণিকে সেখান থেকে র্যাব সদর দপ্তরে নেওয়া হয়।
খাইরুল ইসলামের দাবি, পরীমণির বাসা থেকে কিছু খালি মদের বোতল পাওয়া গিয়েছিল। এরপরও তিনি আবারও প্রশ্ন তোলেন, “তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী?” তার ভাষ্য, পরে তাকে বলা হয়, পরীমণি বাসায় মদ রাখেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “মদ রাখার জন্য অনেকেরই বৈধ অনুমতি থাকে। কারও ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও থাকতে পারে।”
তিনি আরও জানান, পরীমণির মোবাইল ফোন, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়। তবে তার দাবি, সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য কিছুই পাওয়া যায়নি। ব্যক্তিগত তথ্য অন্য সংস্থার সঙ্গে ভাগাভাগির বিষয়ে সতর্ক থাকার কথাও তিনি বলেন।
খাইরুল ইসলামের ভাষায়, “এটি একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয়। যদি আদালতের প্রয়োজন হয়, আদালতে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অন্য সংস্থার সঙ্গে এটি ভাগ করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে আমার প্রশ্ন ছিল।”
তিনি আরও দাবি করেন, পরীমণি ঊর্ধ্বতন মহলের অনেককে বিরক্ত করছিলেন এবং ব্ল্যাকমেইল করছিলেন—এমন কথাও তাকে বলা হয়েছিল। তবে সবশেষে তিনি পুনরায় বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে এখনও বলব, এটি যৌক্তিক ছিল না।”
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর বনানীতে পরীমণির বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে র্যাব। পরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। কয়েক দফা রিমান্ড শেষে ২৮ দিন কারাগারে থাকার পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।
সম্প্রতি খাইরুল ইসলামের এই বক্তব্য প্রকাশের পর পরীমণীও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, তাকে অন্যায়ভাবে, বেআইনিভাবে এবং বিশেষ মহলের স্বার্থে গ্রেফতার করা হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন তোলেন, তার হারিয়ে যাওয়া সময়, সম্মান ও মানসিক শান্তির দায় কে নেবে।
তবে খাইরুল ইসলাম ও পরীমণীর এসব বক্তব্যের বিষয়ে তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই টক শোতে উঠে আসা মন্তব্যগুলো এখন পরীমণি গ্রেফতারকাণ্ডকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে—বিশেষ করে, অভিযানের আইনগত ভিত্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সীমারেখা নিয়ে।



