আট বছরের রামিসাকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন বাবা; নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বিচারব্যবস্থা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন
ঢাকা | ২০ মে ২০২৬ — রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্কে স্তব্ধ পুরো দেশ। কিন্তু এই নৃশংসতার মধ্যেও সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছে নিহত শিশুটির বাবার কান্নাভেজা আর্তনাদ—যেখানে শুধু মেয়েকে হারানোর বেদনা নয়, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কারের প্রতিও গভীর আক্ষেপ ফুটে উঠেছে।
নিহত শিশুর বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা সাংবাদিকদের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর জীবনে কোনোদিন কারও সঙ্গে অন্যায় বা বিরোধ ছিল না। আট বছরের ছোট্ট মেয়েটিই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
তিনি বলেন,
“কোনোদিন একটা মানুষকে আমি ‘সরি’ ছাড়া তর্ক করি নাই ভাইজান। আমার এই আট বছরের মাসুম একটা বাচ্চা। কী অপরাধ ছিল তার? এই মেয়েটাকে ছাড়া আমি থাকবো কিভাবে?”
বাবার ভাষ্যমতে, রামিসা প্রতিদিন বাবার জন্য ফ্রিজে শরবত বানিয়ে রাখত। দিনে অসংখ্যবার ফোন করে জিজ্ঞেস করত—“বাবা, তুমি কখন আসবা?” কাবা শরীফের ছবি এনে বাবাকে একদিন বলেছিল, “তুমি আমাকে নিয়ে যাবা?”
সেই স্মৃতি মনে করে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি।
“আজ আমার মেয়েটাই আল্লাহর কাছে চলে গেল। আমি কী অন্যায় করেছিলাম? যদি আমার কোনো দোষ থাকে, প্রকাশ্যে আমাকে শাস্তি দেন।”
শুধু শোক নয়, বিচারহীনতা নিয়েও ক্ষোভ
শিশুটির বাবার বক্তব্যে ব্যক্তিগত বেদনার পাশাপাশি উঠে এসেছে দেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের হতাশা। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনায় দ্রুত বিচার ও কার্যকর শাস্তির অভাবই অপরাধীদের বেপরোয়া করে তুলছে।
পল্লবীর বাসিন্দাদের অভিযোগ, দেশে একের পর এক শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের ধীরগতি এবং বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতায় ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পায় না।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,
“প্রতিবারই আমরা বিচার চাই, কিন্তু কিছুদিন পর সব চুপ হয়ে যায়। এ কারণেই মানুষ এখন বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে।”
যেভাবে ঘটেছিল নৃশংস হত্যাকাণ্ড
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি বাসায় একা পেয়ে শিশুটিকে পাশের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় অভিযুক্ত সোহেল রানা। পরে তাকে হত্যা করে মরদেহ বিকৃত করা হয়। শিশুটির বিচ্ছিন্ন মাথা একটি বালতিতে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার পর মূল অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করা হয়েছে। সিআইডির ফরেনসিক ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে তদন্তকারীরা।
📊 ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- নিহত: রামিসা (৮)
- ঘটনাস্থল: পল্লবী, সেকশন-১১, ঢাকা
- ঘটনার সময়: ১৯ মে ২০২৬, সকাল ১০টা–১১টার মধ্যে
- আটক: সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না
- তদন্ত করছে: পল্লবী থানা পুলিশ ও সিআইডি
শিশু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ
এই হত্যাকাণ্ডের পর শিশু নিরাপত্তা, পারিবারিক পরিবেশ এবং নগর জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচিত মানুষ বা প্রতিবেশীর হাতেই অধিকাংশ শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, যা প্রতিরোধে সামাজিক নজরদারি ও দ্রুত বিচার দুটিই জরুরি।
মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, শুধু গ্রেপ্তার বা মামলা নয়—এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে সমাজে ভয়াবহ বার্তা যাবে।
রামিসার বাবার শেষ প্রশ্নটিই এখন সামাজিক মাধ্যমে ঘুরছে বারবার—
“আটটা বছর আমি বুকের মধ্যে ওকে ঘুম পাড়াইছি। আজ আমি কার সাথে ঘুমাবো?”



