সিলেটে ৭৮ রানের জয়, সিরিজ ২-০; আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে প্রথমবার সপ্তম স্থানে বাংলাদেশ, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও ভারতকে পেছনে ফেলল শান্তর দল
সিলেট | ২০ মে ২০২৬ —
পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চতুর্থ টেস্ট জয়ের মধ্য দিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ৭৮ রানের জয় তুলে নিয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে ধবলধোলাই করেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। এর মধ্য দিয়ে শুধু সিরিজ জয়ই নয়, টেস্ট ক্রিকেটের একাধিক ঐতিহাসিক রেকর্ড নিজেদের করে নিয়েছে টাইগাররা।
বাংলাদেশের ছুড়ে দেওয়া ৪৩৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পঞ্চম দিনের প্রথম সেশনেই পাকিস্তান গুটিয়ে যায় ৩৫৮ রানে। বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম ১২০ রানে ৬ উইকেট নিয়ে জয়ের প্রধান নায়ক হন। মোহাম্মদ রিজওয়ানের ৯৪ ও সালমান আগার ৭১ রানও শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকে রক্ষা করতে পারেনি।
সিলেটে চাপ, উত্তেজনা আর শেষ হাসি বাংলাদেশের
পঞ্চম দিনের সকালে ম্যাচে নাটকীয়তা ছিল স্পষ্ট। প্রথমে মেহেদী হাসান মিরাজের ক্যাচ মিস, পরে তাইজুল ইসলাম ও লিটন দাসের ভুল–বোঝাবুঝিতে আরেকটি সুযোগ হাতছাড়া হয়। কিছু সময়ের জন্য ম্যাচে চাপ তৈরি হলেও বাংলাদেশ দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তাইজুল ইসলামের বলে সাজিদ খান স্লিপে নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে ক্যাচ দিলে ভাঙে গুরুত্বপূর্ণ জুটি। এরপর শরীফুল ইসলামের বলে রিজওয়ান আউট হতেই ম্যাচ কার্যত বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
আগের উইকেটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল ৭২ বল, কিন্তু পরের দুটি উইকেট আসে মাত্র ১২ বলের ব্যবধানে। শেষ পর্যন্ত খুররম শাহজাদকে ফিরিয়ে জয়ের উল্লাসে মেতে ওঠে বাংলাদেশ দল।
টানা চার টেস্টে পাকিস্তান বধ
এই সিরিজের আগে ২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজেও ২-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। এবার নিজেদের মাটিতেও একই ব্যবধানে ধবলধোলাই করল পাকিস্তানকে।
এর মাধ্যমে টেস্ট ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে পাকিস্তানকে পাকিস্তানের মাটিতে এবং নিজেদের দেশে—উভয় জায়গায় ধবলধোলাই করার কীর্তি গড়েছে বাংলাদেশ।
একসময় যে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ১৩ টেস্টে কোনো জয়ই ছিল না বাংলাদেশের, সেই দলটির বিপক্ষেই এখন টানা চার টেস্ট জয় টাইগারদের বদলে যাওয়া মানসিকতা ও সক্ষমতার বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
র্যাঙ্কিংয়ে ইতিহাস: প্রথমবার সপ্তম স্থানে বাংলাদেশ
সিলেট টেস্ট শেষ হওয়ার পরপরই আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিং হালনাগাদ করা হয়। সেখানে দুই ধাপ এগিয়ে নবম থেকে সপ্তম স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। দেশের টেস্ট ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিং।
বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ৭৮। অন্যদিকে পাকিস্তানের পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৭৫-এ এবং তারা নেমে গেছে অষ্টম স্থানে। শ্রীলঙ্কা উঠে গেছে ষষ্ঠ স্থানে।
📊 আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিং (শীর্ষ ৯)
- ১. অস্ট্রেলিয়া — ১৩১
- ২. দক্ষিণ আফ্রিকা — ১১৯
- ৩. ভারত — ১০৪
- ৪. ইংল্যান্ড — ১০২
- ৫. নিউজিল্যান্ড — ১০১
- ৬. শ্রীলঙ্কা — ৮৬
- ৭. বাংলাদেশ — ৭৮
- ৮. পাকিস্তান — ৭৫
- ৯. ওয়েস্ট ইন্ডিজ — ৬৮
২০১৮ সালে প্রথমবার অষ্টম স্থানে উঠেছিল বাংলাদেশ। এবার সেই রেকর্ড ভেঙে সপ্তম স্থানে উঠে নতুন ইতিহাস গড়ল টাইগাররা।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও বড় অগ্রগতি
পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের ফলে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (WTC) পয়েন্ট টেবিলেও বড় লাফ দিয়েছে বাংলাদেশ।
চার ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের পয়েন্ট শতাংশ এখন ৫৮.৩৩, যা তাদের নিয়ে গেছে টেবিলের পঞ্চম স্থানে। একই সময়ে ভারত নেমে গেছে ষষ্ঠ স্থানে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। তাদের পয়েন্ট শতাংশ নেমে এসেছে মাত্র ৮.৩৩-এ।
ম্যাচের সংক্ষিপ্ত চিত্র
📌 দ্বিতীয় টেস্ট, সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম
বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান
- বাংলাদেশ: ২৭৮ ও ৩৯০
- পাকিস্তান: ২৩২ ও ৩৫৮
- ফল: বাংলাদেশ ৭৮ রানে জয়ী
- সিরিজ ফল: বাংলাদেশ ২-০
📊 উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স
- মুশফিকুর রহিম — ১৩৭
- লিটন দাস — ১২৬ ও ৬৯
- তাইজুল ইসলাম — ৬/১২০
- নাহিদ রানা — গুরুত্বপূর্ণ ব্রেকথ্রু
- মোহাম্মদ রিজওয়ান — ৯৪
- সালমান আগা — ৭১
🏅 পুরস্কার
- প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: লিটন দাস
- প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ: মুশফিকুর রহিম
বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন যুগ?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের মাটির বাইরে নিউজিল্যান্ড ও পাকিস্তানের মতো দলকে হারিয়ে বাংলাদেশ নিজেদের সামর্থ্যের ইঙ্গিত দিয়েছিল। তবে পাকিস্তানকে টানা দুই সিরিজে ধবলধোলাই করে সেই অগ্রগতিকে এবার পরিসংখ্যান ও ধারাবাহিকতার ভিত্তি দিল শান্তর দল।
বিশেষ করে সিলেট ও মিরপুর—দুই টেস্টেই দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে। ব্যাটিং, পেস বোলিং ও স্পিন—তিন বিভাগেই ছিল পরিপক্বতার ছাপ। চাপের মুহূর্তে ম্যাচে ফেরার ক্ষমতাও এবার চোখে পড়েছে স্পষ্টভাবে।
বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে এটি শুধু একটি সিরিজ জয় নয়; বরং দীর্ঘদিনের আত্মবিশ্বাস সংকট কাটিয়ে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দলের রূপ নেওয়ার বড় ঘোষণা বলেই মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকেরা।
📌 গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে
- পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা ৪ টেস্ট জয়
- ঘরের মাঠে প্রথমবার পাকিস্তানকে ধবলধোলাই
- টেস্ট ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে পাকিস্তানকে দেশে ও বিদেশে ২-০ ব্যবধানে হারানো
- আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে প্রথমবার সপ্তম স্থানে বাংলাদেশ
- বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতকে পেছনে ফেলে পঞ্চম স্থানে টাইগাররা
তথ্যসূত্র: ESPNcricinfo, ICC Rankings, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন।



