Homeটুডে ওয়ার্ল্ডট্রাম্পের সফরের পরই পুতিন বেইজিংয়ে: নতুন ভূরাজনৈতিক অক্ষ গঠনের বার্তা দিল দুই...

ট্রাম্পের সফরের পরই পুতিন বেইজিংয়ে: নতুন ভূরাজনৈতিক অক্ষ গঠনের বার্তা দিল দুই নেতা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব, ইউক্রেন যুদ্ধ ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে রাশিয়া-চীন; ‘বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা’ গঠনের আহ্বান দুই নেতার

বেইজিং | ২১ মে ২০২৬ — চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শীর্ষ বৈঠক শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই নেতা বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, গবেষণা ও গণমাধ্যমসহ ২০টির বেশি সহযোগিতা চুক্তিতে সই করেছেন। একই সঙ্গে যৌথ ঘোষণায় তারা পশ্চিমা আধিপত্যবাদ, একতরফা বিশ্বব্যবস্থা এবং ‘জঙ্গলের আইন’ ফিরে আসার ঝুঁকি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

বুধবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই নেতা নিজেদের সম্পর্ককে “অভূতপূর্ব উচ্চতায়” বলে বর্ণনা করেন। বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে “একতরফা সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ” নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবে বিবৃতির ভাষা ওয়াশিংটনের নীতির সমালোচনা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় জোর

চুক্তিগুলোর বড় অংশই জ্বালানি, প্রযুক্তি ও যৌথ গবেষণাকে ঘিরে। বিশেষ করে বহু আলোচিত ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প আবারও আলোচনায় এসেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মঙ্গোলিয়া হয়ে বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার রুশ গ্যাস চীনে সরবরাহ করা হবে।

যদিও প্রকল্পটির সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবুও পুতিন বৈঠকে চীনকে “বিশ্বস্ত জ্বালানি অংশীদার” হিসেবে উল্লেখ করেন। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা ও ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে রাশিয়া এই প্রকল্পকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরছে।

একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং শিল্প উৎপাদনে যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে। পশ্চিমা প্রযুক্তি ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সরবরাহ ও গবেষণা কাঠামো গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা’ গঠনের বার্তা

যৌথ বিবৃতিতে রাশিয়া ও চীন দাবি করেছে, বিশ্ব রাজনীতি বর্তমানে “বিভাজন” ও “ক্ষমতার একক আধিপত্যের” ঝুঁকিতে রয়েছে। দুই দেশই “স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি” বজায় রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

শি জিনপিং বলেন, “চীন ও রাশিয়ার উচিত একটি ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করা।”

অন্যদিকে পুতিন বলেন, “বৈরী বহিরাগত পরিস্থিতি সত্ত্বেও দুই দেশের সম্পর্ক এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।”

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়া ক্রমেই চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। অন্যদিকে বেইজিংও ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা উত্তেজনার মধ্যে মস্কোকে কৌশলগত ভারসাম্যের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে।

ট্রাম্প সফরের পরপরই পুতিনের বেইজিং সফর

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরের এক সপ্তাহের মধ্যেই পুতিনের এই সফর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ট্রাম্পের সফরে তাৎক্ষণিক বড় কোনো চুক্তি না হলেও, পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে চীন দ্রুত একাধিক সমঝোতা ঘোষণা করেছে।

এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেও বেইজিং এখনো মস্কোর সঙ্গে তার কৌশলগত জোটকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

ইউক্রেন, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নেও আলোচনা

রুশ প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক সহকারী ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, দুই নেতা ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও আলাদা বৈঠকে আলোচনা করেছেন।

যদিও চীন নিজেকে ইউক্রেন যুদ্ধে “নিরপেক্ষ পক্ষ” হিসেবে তুলে ধরে, তবুও তারা এখন পর্যন্ত রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রকাশ্য নিন্দা করেনি। একই সঙ্গে ইরান ইস্যুতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের ভূমিকাকে যৌথ বিবৃতিতে প্রশংসা করেছে মস্কো।

🔎 বিশ্লেষণ:
এই বৈঠক থেকে সবচেয়ে স্পষ্ট যে বার্তাটি উঠে এসেছে তা হলো—রাশিয়া ও চীন এখন শুধু অর্থনৈতিক অংশীদার নয়, বরং পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প এক ভূরাজনৈতিক কাঠামো গঠনের দিকেও এগোচ্ছে। যদিও তাদের মধ্যে কৌশলগত স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়, তবুও যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে দুই দেশ ক্রমশ কাছাকাছি চলে আসছে।

📊 গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এক নজরে

  • স্থান: গ্রেট হল অব দ্য পিপল, বেইজিং
  • অংশগ্রহণকারী: শি জিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিন
  • চুক্তি: ২০টির বেশি
  • মূল খাত: জ্বালানি, প্রযুক্তি, AI, গবেষণা, গণমাধ্যম
  • গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প: পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২ গ্যাস পাইপলাইন
  • সম্ভাব্য গ্যাস সরবরাহ: বছরে ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার
  • মূল বার্তা: বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা, পশ্চিমা আধিপত্যের বিরোধিতা

বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে বেইজিং বৈঠক স্পষ্ট করেছে যে, রাশিয়া-চীন সম্পর্ক এখন কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতার সীমায় নেই; এটি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।

তথ্যসূত্র: Reuters, AFP, BBC, South China Morning Post, TASS

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular