Homeটুডে হেলথটিকা দিয়েও বাঁচানো গেল না ৫ জনকে: জলাতঙ্ক চিকিৎসায় মারাত্মক ত্রুটি ও...

টিকা দিয়েও বাঁচানো গেল না ৫ জনকে: জলাতঙ্ক চিকিৎসায় মারাত্মক ত্রুটি ও ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন

গাইবান্ধায় কুকুরের কামড়ে দুই সপ্তাহে পাঁচজনের মৃত্যুর পর ছড়াচ্ছে আতঙ্ক; চিকিৎসকেরা বলছেন অবহেলা, সঠিক প্রোটোকল না মানা এবং কোল্ড চেইন বজায় না রাখাই মূল কারণ।

গাইবান্ধা | ১৭ মে ২০২৬
বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানে জলাতঙ্কের টিকাকে যেখানে শতভাগ কার্যকর প্রতিষেধক বলা হয়, সেখানে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে টিকা নেওয়ার পরও দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পাঁচজন রোগীর মৃত্যু এক বড় প্রশ্ন ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। গত ২২ এপ্রিল সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ও ছাপড়হাটি ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে অন্তত ১৪ জন জখম হন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন হাসপাতালে গিয়ে জলাতঙ্কের নিয়মিত সরকারি টিকা (এআরভি) নেওয়ার পরও সম্প্রতি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের বিশ্লেষণ বলছে, শুধু সাধারণ টিকা দিলেই জলাতঙ্ক প্রতিরোধ সম্ভব নয়; ক্ষতস্থান পরিষ্কারে অবহেলা, ক্ষত অনুযায়ী সঠিক প্রোটোকলের ইমিউনোগ্লোবিউলিন (আরআইজি) ইনজেকশন না দেওয়া এবং বাজার থেকে কেনা ভ্যাকসিনের সঠিক তাপমাত্রা (কোল্ড চেইন) বজায় না থাকায় এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও যেভাবে ঘটল মৃত্যু

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২২ এপ্রিল আক্রান্ত হওয়ার পরপরই রোগীরা স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেন। মৃতদের একজন কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের ফুল মিয়া (৫২)। তাঁর নাকে কুকুর কামড় দেওয়ার পর তিনি বাড়িতে এসে শুধু গরম পানি দিয়ে ক্ষতস্থান ধুয়ে ফেলেন এবং দ্রুত গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে যান। সেখানে ক্ষতস্থানে সেলাই দিয়ে দুটি টিকা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে জ্বর ও বমি শুরু হলে গত ৬ মে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
ফুল মিয়াসহ মারা যাওয়া বাকি চারজনও হাসপাতালে বা বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনে আনা প্রতিষেধক ইনজেকশন নিয়েছিলেন। তবে চিকিৎসকদের মতে, তাঁদের চিকিৎসায় প্রধান তিনটি ত্রুটি ছিল, যা মৃত্যুর পথ সুগম করেছে:

  • মস্তিষ্কের কাছাকাছি ক্ষতস্থান: নিহত প্রত্যেকেরই নাক, মুখ বা মুখমণ্ডলে কামড়েছিল কুকুর। ভাইরাসের উৎস বা ক্ষতস্থান মস্তিষ্কের যত কাছে হবে, ভাইরাস তত দ্রুত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করে। সাধারণ টিকা কাজ শুরু করার আগেই ভাইরাস মস্তিষ্কে পৌঁছে গেলে রোগীকে আর বাঁচানো সম্ভব হয় না।
  • ইমিউনোগ্লোবিউলিন (আরআইজি) না দেওয়া: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন অনুযায়ী, কামড় গভীর হলে কিংবা রক্ত বের হলে শুধু সাধারণ এন্টি-র‍্যাবিস ভ্যাকসিন (এআরভি) যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি তাৎক্ষণিক সুরক্ষার জন্য ক্ষতের চারপাশে ‘র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন’ (আরআইজি) ইনজেকশন দেওয়া বাধ্যতামূলক। গাইবান্ধায় মারা যাওয়া ব্যক্তিরা এই জীবনরক্ষাকারী ইনজেকশনটি পাননি।
  • ক্ষতস্থান ধোয়ার প্রোটোকলে গাফিলতি: সিভিল সার্জন জানান, কুকুরে কামড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থান ক্ষারযুক্ত কাপড় কাচার সাবান এবং প্রবাহিত পানি দিয়ে অন্তত ১৫-২০ মিনিট ধুতে হয়। এতে ক্ষতের মুখে থাকা ভাইরাসের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। অথচ আক্রান্তদের বেশির ভাগই সাবান ব্যবহার না করে কেবল গরম পানি দিয়ে ক্ষণিকের জন্য ক্ষতস্থান ধুয়েছেন।

দেশজুড়ে বেওয়ারিশ কুকুরের বিস্তার ও টিকাদান বন্ধ

গাইবান্ধার এই ঘটনাটি দেশের সামগ্রিক জলাতঙ্ক পরিস্থিতি এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছরই কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ২০২৩ সালে সারা দেশে ৯৪ হাজার ৩৮০ জন আক্রান্ত হলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জনে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসেই কেবল একটি বিশেষায়িত হাসপাতালেই সেবা নিয়েছেন ৩৬ হাজারের বেশি মানুষ।
আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও সারা দেশে কুকুরকে জলাতঙ্কপ্রতিরোধী ভ্যাকসিন দেওয়ার জাতীয় কর্মসূচিটি ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ফান্ড বা অর্থ বরাদ্দের অভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো এলাকার অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুরকে টানা তিন বছর টিকা দিলে সেই এলাকা জলাতঙ্কমুক্ত হয়। কিন্তু দেশে বর্তমানে কুকুর বন্ধ্যাকরণ ও টিকাদান বন্ধ থাকায় ভাইরাসের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

🔎 কেন এই মৃত্যুর দায় শুধু ‘টিকার’ নয়?
মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের মতে, গাইবান্ধার ঘটনা প্রমাণ করে যে কেবল ‘টিকা দেওয়া হয়েছে’—এই আত্মতুষ্টির কারণে মাঠপর্যায়ে বড় বিপর্যয় ঘটছে। প্রথমত, সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ না থাকায় অনেক সময় রোগীরা বাইরের সাধারণ ফার্মেসি থেকে ভ্যাকসিন কেনেন। কিন্তু জীবনরক্ষাকারী এই ভ্যাকসিন ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় (কোল্ড চেইন) সংরক্ষণ করতে হয়। গ্রামাঞ্চলের ফার্মেসিগুলোতে লোডশেডিং বা সঠিক ফ্রিজ না থাকায় ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, মুখমণ্ডলে কামড়ানোর পরও ক্ষতস্থানে ‘সেলাই’ দেওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রোটোকলবিরোধী, যা গাইবান্ধার রোগীদের ক্ষেত্রে করা হয়েছে। সেলাই দেওয়ার ফলে ভাইরাস আরও সহজে রক্ত ও স্নায়ুতে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।

💬 সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
গাইবান্ধার সিভিল সার্জন মো. রফিকুজ্জামান বলেন, “টিকা নেওয়ার পরও মৃত্যুর পেছনে ক্ষতস্থান যথাযথভাবে পরিষ্কার না করা, সময়মতো আরআইজি ইনজেকশন না নেওয়া এবং কোল্ড চেইন নষ্ট হওয়া ভ্যাকসিন ব্যবহার করা বড় কারণ হতে পারে। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।”
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশিদ বলেন, “জলাতঙ্ক প্রতিরোধে নতুন করে একটি পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তবে এর আওতায় শুধু মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। কুকুরকে টিকা দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেই। এটি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের করা উচিত।” অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তাদের কাছেও বর্তমানে কুকুর নিয়ন্ত্রণের কোনো সক্রিয় প্রকল্প নেই।

📊 তথ্যচিত্র: জলাতঙ্ক ও গাইবান্ধা পরিস্থিতি

  • আক্রান্তের তারিখ: ২২ এপ্রিল ২০২৬
  • লোকেশন: সুন্দরগঞ্জ উপজেলা (কঞ্চিবাড়ি ও ছাপড়হাটি ইউনিয়ন), গাইবান্ধা
  • মোট আক্রান্ত: ১৪ জন (যার মধ্যে ৯ জন বর্তমানে সুস্থ আছেন)
  • মোট মৃত্যু: ০৫ জন (সবাই দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মারা যান)
  • পরিসংখ্যান: দেশে ২০২৩ সালে জলাতঙ্কে মৃত্যু হয়েছিল ৪২ জনের, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ জনে। ২০২৬ সালের প্রথম আড়াই মাসেই মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের।
  • সরকারি উদ্যোগ: ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন কুকুরকে টিকা দেওয়া (র‍্যাবিস কিল) শুরু করেছে। সুন্দরগঞ্জের নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে।

জলাতঙ্ক এমন এক রোগ যার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর মৃত্যু অবধারিত। গাইবান্ধার এই পাঁচজনের নির্মম মৃত্যু দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়হীনতা এবং মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকদের প্রোটোকল না জানার খামতিকে স্পষ্ট করেছে। মানুষের পাশাপাশি পশুপাখিকে টিকার আওতায় না আনলে এবং কোল্ড চেইন নিশ্চিত করতে না পারলে কেবল ‘টিকা’র কাগজের হিসাব দিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করা অসম্ভব।

তথ্যসূত্র: সিভিল সার্জন কার্যালয় গাইবান্ধা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল (মহাখালী)

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular