১৯৯১-৯৬ মেয়াদের এক রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসার গল্প ফেঁসেছেন সাবেক সম্পাদক নঈম নিজাম; ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাঈদ-পুত্র শামস এবং ডেইলি স্টার সম্পাদক দুজনেই উড়িয়ে দিলেন সেই দাবি।
ঢাকা | ১৭ মে ২০২৬
প্রবীণ সাংবাদিক ও দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর সাবেক সম্পাদক নঈম নিজামের একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ঢাকার সাংবাদিক ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও আলোচনার ঝড় উঠেছে। গত ১৪ মে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে নঈম নিজাম দাবি করেন, ১৯৯১-৯৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে এক ভুলবোঝাবুঝি অবসানের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার গাড়িতে চড়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ভাই সাঈদ এস্কান্দারের বাসায় গিয়েছিলেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। শুধু তাই নয়, মাহফুজ আনামের পরামর্শে সেখানে সাঈদ এস্কান্দারের পরিবারের অজান্তে কথোপকথন রেকর্ড করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন নঈম। তবে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডিসেন্ট’ (The Dissent)-এর এক প্রতিবেদনে এই পুরো দাবিকে ‘কাল্পনিক ও অসত্য’ বলে প্রমাণিত করা হয়েছে। ঘটনার অন্যতম চরিত্র মাহফুজ আনাম এবং সাঈদ এস্কান্দারের ছেলে শামস এস্কান্দার দুজনেই নঈম নিজামের এই বিবরণকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে আখ্যা দিয়েছেন।
নঈম নিজামের বিতর্কিত দাবি ও সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা
নঈম নিজাম তাঁর পোস্টে লিখেছেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে সাঈদ এস্কান্দারের দুই সন্তানকে (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ভাগনে) আওয়ামী লীগের নিরাপত্তাকর্মীরা লাঞ্ছিত করার পর দুই দলের মধ্যে চরম অস্বস্তি তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেখ হাসিনা নিজেই সাঈদ এস্কান্দারের বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামকে ফোন করলে তিনিও শেখ হাসিনার গাড়িতে চড়ে সেই বাসায় যান। নঈমের দাবি অনুযায়ী, মাহফুজ আনামের পরামর্শেই শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী মৃণাল কান্তি দাস সাঈদ এস্কান্দারের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের কথোপকথন গোপনে রেকর্ড করার জন্য একটি ছোট টেপ রেকর্ডার চালু করে দিয়েছিলেন।
এই পোস্ট প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকদের নৈতিকতা নিয়ে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। একজন জ্যেষ্ঠ সম্পাদক কীভাবে রাজনৈতিক দলের হয়ে অন্য নাগরিকের ওপর ‘গোেন্দাগিরি’ করার বা গোপনে রেকর্ড করার পরামর্শ দিতে পারেন—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেক গণমাধ্যমকর্মী। সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ফেসবুকে লেখেন, “কোন পেশাদারি এখতিয়ারে উনি (মাহফুজ আনাম) হাসিনার ফোন কল পেয়ে তাঁর সাথে ঐ বাসায় গেলেন? এটি বেগম জিয়ার কল রেকর্ড করে ছড়ানোর অভ্যাসের সাথে মিলে যায়।” সাংবাদিক মুক্তাদির রশীদও একে একজন সম্পাদকের জন্য চরম ‘নৈতিক স্খলন’ ও গর্হিত কাজ বলে মন্তব্য করেন।
‘একেবারে কাল্পনিক’: মাহফুজ আনাম
এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেন। দ্য ডিসেন্ট-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে মাহফুজ আনাম সরাসরি বলেন:
“আমার এখানে যাওয়া শুধু অসত্য না, একেবারে কাল্পনিক।”
নঈমের লেখায় একাধিক অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নঈম নিজাম তাঁর গল্পে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তথ্যের ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল এবং অসত্য তথ্য পরিবেশন করেছেন:
- ভুয়া এমপি দাবি: নঈম নিজাম দাবি করেছেন, ১৯৯১-৯৬ সালের ওই ঘটনার সময় “সাঈদ ইস্কান্দার শুধু প্রধানমন্ত্রীর ভাই নন, তিনি এমপি ছিলেন।” অথচ একাধিক সংবাদমাধ্যমের রেকর্ড (যেমন ২০১২ সালে বিডিনিউজ২৪-এ প্রকাশিত সাঈদ এস্কান্দারের মৃত্যুসংবাদ) অনুযায়ী, সাঈদ এস্কান্দার জীবনে মাত্র একবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন, তা-ও ২০০২ সালে তাঁর বোন খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেওয়া ফেনী-১ আসনের উপনির্বাচনে। অর্থাৎ, ৯১-৯৬ মেয়াদে তিনি কোনোভাবেই এমপি ছিলেন না।
- ঘটনাকে লঘু করার চেষ্টা ও তথ্যের অমিল: ঘটনার মূল ভুক্তভোগী ও সাঈদ এস্কান্দারের ছেলে শামস এস্কান্দার নঈম নিজামের এই পোস্টকে পুরোপুরি ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। নঈম দাবি করেছিলেন, দুই ভাই গাড়ি থেকে নেমে সড়ক বন্ধের জন্য বকাঝকা করায় নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের লাঞ্ছিত করে। কিন্তু শামস জানান, “ঘটনাটি ১৯৯২ সালের, আমি তখন ক্লাস টুতে পড়ি (বয়স ১১ বছর)। আমি গাড়িতে একা ছিলাম, দুই ভাই নয়। একজন ক্লাস টুর বাচ্চার বকাঝকা করার বয়স কতটুকু, তা পাঠকরাই বুঝবেন।”
- ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন: শামস এস্কান্দার আরও জানান, খালেদা জিয়ার আন্দোলনের সময়ের পরিচিত ব্যক্তিগত গাড়িটি দেখে ৩২ নম্বরের রাজনৈতিক কর্মীরা গাড়িতে হামলা চালায়। নিরাপত্তারক্ষীদের সাথে সাধারণ বাকবিতণ্ডা নয়, বরং সেদিন ৩২ নম্বরের কর্মীরা শিশু শামসকে প্রায় ৬ ঘণ্টা সেই বাড়িতে আটকে রেখে গালিগালাজ করে এবং তাদের ড্রাইভারকে শারীরিকভাবে মারাত্মক প্রহার করে; যা নঈম নিজাম তাঁর লেখায় পুরোপুরি চেপে গেছেন এবং ঘটনাটিকে লঘু করার চেষ্টা করেছেন।
📊 ফ্যাক্ট-চেক: নঈম নিজামের পোস্ট বনাম বাস্তব তথ্য (Data Points)
| নঈম নিজামের দাবি | অনুসন্ধানে প্রাপ্ত প্রকৃত সত্য | তথ্যসূত্র |
|---|---|---|
| সাঈদ এস্কান্দার ৯১-৯৬ মেয়াদে এমপি ছিলেন। | অসত্য। তিনি প্রথম ও একমাত্র এমপি হন ২০০২ সালের উপনির্বাচনে। | বিডিনিউজ২৪ (সেপ্টেম্বর ২০১২) |
| সাঈদ এস্কান্দারের দুই ছেলে বকাঝকা করায় সামান্য লাঞ্ছিত হয়। | বিভ্রান্তিকর। গাড়িতে কেবল ১১ বছরের শিশু শামস একা ছিলেন। তাকে ৬ ঘণ্টা আটকে রেখে চালককে মারধর করা হয়। | শামস এস্কান্দার (সাক্ষাৎকার, ২০২৬) |
| মাহফুজ আনাম হাসিনার গাড়িতে চড়ে মীমাংসা করতে যান ও রেকর্ড করার বুদ্ধি দেন। | মিথ্যা ও কাল্পনিক। মাহফুজ আনাম স্পষ্ট জানিয়েছেন, এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। | মাহফুজ আনাম (ডেইলি স্টার সম্পাদক) |
উপসংহার: প্রবীণ সাংবাদিকদের এমন বিভ্রান্তিকর ও তথ্যপ্রমাণহীন রাজনৈতিক গল্প ফাঁদার প্রবণতা ঢাকার সাংবাদিক মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দায়িত্বশীল পদে থেকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই না করে সামাজিক মাধ্যমে এমন স্পর্শকাতর ও কাল্পনিক পোস্ট দেওয়া হলুদ সাংবাদিকতারই শামিল বলে মনে করছেন সংবাদ বিশ্লেষকেরা।
তথ্যসূত্র: দ্য ডিসেন্ট, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরাসরি বক্তব্য



