বিশেষ প্রতিবেদন | ১৬ মে ২০২৬
সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের কন্যা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসক ডা. সামিনা আজম সম্প্রতি তাঁর বাবার চিকিৎসাকালীন অভিজ্ঞতা ও আকস্মিক প্রয়াণ নিয়ে একটি অত্যন্ত আবেগঘন ও চিন্তাশোধান্বিত খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন। কোনো নির্দিষ্ট হাসপাতাল বা চিকিৎসাকর্মীকে দোষারোপ না করে, সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ফাঁকফোকর, হাসপাতাল-সৃষ্ট সংক্রমণ (Hospital-Acquired Infection), এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদানে বিলম্বের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো তিনি একজন চিকিৎসক ও ভুক্তভোগী কন্যার দ্বৈত দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছেন।
এই খোলা চিঠিটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের দীর্ঘদিনের কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা এবং আইসিইউ (ICU) ব্যবস্থাপনার ঘাটতিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
১. চিঠির মূল প্রেক্ষাপট ও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের শেষ দিনগুলো
ডা. সামিনা আজমের বিবরণ অনুযায়ী, ৮৩ বছর বয়সী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত থাকলেও অত্যন্ত স্বাস্থ্যসচেতন ও নিয়মানুবর্তী ছিলেন। তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর দীর্ঘ ১০ মাস কারাবাস এবং নিয়মিত চিকিৎসার অভাবে তাঁর ‘মাইল্ড ডিমেনশিয়া’ (স্মৃতিভ্রম রোগ) দ্রুত অবনতির দিকে যায়। পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়ে পারিবারিক তত্ত্বাবধান ও ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেও, গত মার্চ মাসে তাঁর পরিবারে প্রথম আঘাতটি আসে হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণের মাধ্যমে।
২. ট্র্যাজেডির শুরু: ‘অ্যাসিনেটোব্যাকটার’ ও হাসপাতাল-সংক্রমণ
ডা. সামিনা আজমের চাচা প্রথমে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর Acinetobacter (অ্যাসিনেটোব্যাকটার) নামক একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং বহু-ওষুধ প্রতিরোধী (Multi-drug resistant) ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে মারা যান। এর কিছুদিন পর ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
চিঠিতে ডা. সামিনা যে প্রধান ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করেছেন:
- তথ্য গোপনের সংস্কৃতি: প্রথমবার হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র (Discharge) দেওয়ার সময় তাঁর বাবার কফ পরীক্ষায় (Sputum Culture) চাচার শরীরে পাওয়া একই বিপজ্জনক ‘অ্যাসিনেটোব্যাকটার’ ও ‘স্ট্যাফ’ ব্যাকটেরিয়া ধরা পড়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিবারকে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি জানায়নি। ফলে বাসায় রোগীকে এমন অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছিল, যা ওই জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর ছিল না।
- ইনভেসিভ ডিভাইসের দীর্ঘ ব্যবহার: প্রস্রাবের রাস্তায় দীর্ঘ ১০ দিন ধরে ফোলিস ক্যাথেটার (Foley Catheter) রাখার কারণে রোগীকে কেবিন থেকে বাসায় নেওয়ার পরপরই তিনি তীব্র সেপসিস (Sepsis) বা রক্তে সংক্রমণে আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে তাঁর কালচারে CRE Klebsiella নামক আরেকটি মারাত্মক প্রতিরোধী সুপারবাগ ধরা পড়ে।
৩. আইসিইউ’র অন্তহীন চক্র ও জরুরি চিকিৎসায় বিলম্ব
একজন মার্কিন প্রবাসী চিকিৎসক হিসেবে ডা. সামিনা আজম দেশের শীর্ষস্থানীয় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও আইসিইউ’র কিছু মারাত্মক ত্রুটি স্বচক্ষে দেখেছেন:
- কনসালটেন্ট-নির্ভরতা ও বিলম্ব: তীব্র সেপসিস নিয়ে জরুরি বিভাগে যাওয়ার পরও রক্ত পরীক্ষা ও অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করতে কয়েক ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়, কারণ দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা ‘কনসালটেন্ট’ আসার অপেক্ষা করছিলেন।
- ফ্ল্যাশ পালমোনারি ইডিমা ও অর্গান ফেইলিওর: ফুসফুসে পানি জমার (Pulmonary Edema) লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পরও diuresis (শরীর থেকে পানি বের করার প্রক্রিয়া) শুরু করতে দেরি হওয়ায় রোগী তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগেন। পরবর্তীতে অনিয়ন্ত্রিত ডায়ালিসিস এবং পুনরায় আইসিইউ-সংক্রমণের কারণে তাঁর সিআরপি (CRP) স্তর ৭৪ থেকে লাফিয়ে ২৩৮-এ পৌঁছায় এবং শেষ পর্যন্ত মাল্টিপল অর্গান ফেইলিউরের কারণে তিনি মারা যান।
৪. সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নীতিমালার চরম অবহেলা
চিঠির সবচেয়ে শঙ্কার জায়গাটি হলো আইসিইউ-এর ভেতরে স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিই (PPE) ও আইসোলেশন (Isolation) প্রটোকল না মানার প্রবণতা। ডা. সামিনা আজম লেখেন:
“শুরুতে মাল্টিড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট ইনফেকশন থাকার কারণে বাবাকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছিল। কিন্তু আমি বারবার দেখেছি, স্বাস্থ্যকর্মীরা যথাযথ গাউন, গ্লাভস বা মাস্ক ছাড়াই এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে যাতায়াত করছেন। যেখানে স্বজনরা পূর্ণ পিপিই পরে ঢুকত, সেখানে চিকিৎসাকর্মীদের এই উদাসীনতাই প্রমাণ করে কেন হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ এত দ্রুত ছড়ায়।”
এমনকি হাসপাতালের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সিস্টেমের কিছু অংশও দূষিত ছিল বলে চিঠিতে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়।
💬 বিশ্লেষণ ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি প্রশ্ন
ডা. সামিনা আজমের এই চিঠি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি মৌলিক সংকটের দিকে আঙুল তুলেছে। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন—“আমি নিজে একজন চিকিৎসক হয়েও যদি বাবার জন্য সঠিক চিকিৎসার লড়াই করতে এতটা সংগ্রাম করি, তবে সাধারণ পরিবারগুলোর কী অবস্থা হয়?”
📊 চিঠিতে চিহ্নিত স্বাস্থ্য খাতের প্রধান ৫টি ঘাটতি:
- ICU Infection Control: নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রটোকল না মানায় এক রোগী থেকে অন্য রোগীতে ‘সুপারবাগ’ ছড়িয়ে পড়া।
- Communication Gap: ল্যাব টেস্ট বা কালচার রিপোর্টের বিপজ্জনক ফলাফল রোগীর পরিবারকে সময়মতো না জানানো।
- Delayed Triage: জরুরি বিভাগে সেপসিসের মতো জীবনঘাতী পরিস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করে তাৎক্ষণিক অ্যান্টিবায়োটিক শুরু না করা।
- Over-reliance on Consultants: জুনিয়র ডাক্তার বা অন-কল ডাক্তারদের জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতার অভাব।
- Systemic Overload: চিকিৎসকদের আন্তরিকতা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।
পরবর্তী করণীয় ও সংস্কারের ডাক
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মতো একজন ভিআইপি রোগীর ক্ষেত্রে যদি হাসপাতাল-সৃষ্ট সংক্রমণ ও সমন্বয়হীনতা মৃত্যুর কারণ হতে পারে, তবে তা দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে বড় ধরণের কাঠকাঠগড়ায় দাঁড় করায়। ডা. সামিনা আজমের এই খোলা চিঠি কোনো প্রতিহিংসামূলক আক্রমণ নয়, বরং এটি দেশের আইসিইউ ব্যবস্থাপনা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালাকে (Infection Control Protocol) জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত অর্থবহ সংস্কারের একটি শক্তিশালী এবং যৌক্তিক তাগিদ।
তথ্যসূত্র: ডা. সামিনা আজমের উন্মুক্ত পত্র ও জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন (মে ২০২৬)।



