ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধের অবস্থান থেকে ২০ বছরের স্থগিতাদেশে রাজি মার্কিন প্রেসিডেন্ট; আমেরিকার অস্ত্র ঘাটতি ও চীনের ওপর ‘রেয়ার আর্থ’ খনিজের নির্ভরতাকে প্রধান কারণ বলছেন বিশ্লেষকরা।
বেইজিং | ১৬ মে ২০২৬
চীন সফর শেষ করে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে ইরান নীতি ও দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিজেদের দীর্ঘদিনের কট্টর অবস্থান থেকে নাটকীয়ভাবে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতদিন ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ও স্থায়ীভাবে’ বন্ধের (জিরো এনরিচমেন্ট পজিশন) দাবিতে অনড় থাকলেও, বেইজিংয়ে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক শেষে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধের পরিবর্তে ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব মেনে নিতে প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের কাছ থেকে প্রত্যাশিত কৌশলগত সুবিধা না পাওয়া এবং আমেরিকার নিজস্ব সামরিক ও খনিজ সংকটের কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন এই নমনীয় অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও ট্রাম্পের অবস্থান বদল
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে বাধা দিতে সব ধরনের স্থাপনা ধ্বংস ও ইউরেনিয়াম মজুদ হস্তান্তরের চাপ দিয়ে আসছিল। তবে চীন সফর শেষে ট্রাম্পের নতুন বক্তব্য এই নীতিতে বড় ধরণের ফাটল ধরিয়েছে।
এক বিবৃতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “আমি ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবি না করে, ২০ বছরের জন্য তা স্থগিত রাখার প্রস্তাব মেনে নিতে পারি।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটন এখন ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি থেকে ধাপে ধাপে পিছু হটছে।
যুদ্ধের অনিচ্ছা ও সামরিক মজুদের সংকট
ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার এই সুর নরম করার নেপথ্যে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ সামরিক দুর্বলতা ও যুদ্ধের অনিচ্ছাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দোহার হামাদ বিন খালিফা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সুলতান বারাকাত বলেন, “ইরানের সাথে নতুন করে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এই মুহূর্তে ট্রাম্প প্রশাসনের স্বার্থের অনুকূলে নয়। ট্রাম্প মূলত তাঁর আগের অবস্থান থেকে ধাপে ধাপে নিচে নেমে আসার (Climb down) চেষ্টা করছেন, যাতে মার্কিন জনগণের কাছে একবারে পরাজয়ের বার্তা না যায়।”
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত ও ইরান ইস্যুতে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের ক্ষেপণাস্ত্র (Missile) ও অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রায় ৫০ শতাংশ মজুদ হারিয়ে ফেলেছে। এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে নতুন অস্ত্র তৈরি করা ওয়াশিংটনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
চীনের ‘রেয়ার আর্থ মিনারেল’ বা দুর্লভ খনিজের ওপর নির্ভরতা
আমেরিকার এই সামরিক সংকটের সরাসরি সুবিধা পাচ্ছে চীন। আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র, স্মার্টফোন, রাডার ব্যাটারি এবং কম্পিউটার তৈরিতে অপরিহার্য উপাদান হলো ‘রেয়ার আর্থ মিনারেল’ বা দুর্লভ খনিজ পদার্থ। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই খনিজ সম্পদের প্রায় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ মজুদ ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে চীন।
আমেরিকার সামরিক বিশেষজ্ঞ কর্নেল উইলকার্সন এক বিবৃতিতে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে বলেন:
“অর্থনীতি বা সামরিক—কোনো দিক থেকেই চীনের এখন আর আমেরিকার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমেরিকা চীনকে ছাড়া চলতে পারবে না। কারণ এই দুর্লভ খনিজগুলো না পেলে আমেরিকা নতুন কোনো অস্ত্র বা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে না।”
যদি বেইজিং এই খনিজ রপ্তানিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা কড়াকড়ি আরোপ করে, তবে মার্কিন সামরিক শিল্পখাত স্থবির হয়ে পড়বে। এই খনিজ নিরাপত্তার বিষয়টিই ট্রাম্পকে বেইজিংয়ে গিয়ে আপসকামিতার পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে।
বেইজিংয়ের ‘শীতল’ আতিথেয়তা ও ভূ-রাজনৈতিক বার্তা
ট্রাম্পের এই চীন সফরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক আচরণও ছিল বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ। পর্যবেক্ষকরা দেখিয়েছেন, সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কিংবা উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা যখন চীন সফরে যান, তখন বিমানবন্দরে তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তবে ট্রাম্পের সফরের ক্ষেত্রে সেই স্তরের প্রটোকল বা আতিথেয়তা দেখা যায়নি। এমনকি চীনের রাষ্ট্রীয় ইংরেজি দৈনিক ‘চায়না ডেইলি’ ট্রাম্পের আগমনের দিন তাঁকে নিয়ে কোনো প্রধান শিরোনাম না করে তাজিকিস্তানের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে প্রাধান্য দেয়।
সাবেক মার্কিন কর্নেল জনসন এই পরিস্থিতিকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে সংক্ষেপে বলেছেন, “চীন মূলত ট্রাম্পের দাবিগুলোকে সরাসরি ‘না’ (No) করে দিয়েছে।” আর এই প্রত্যাখ্যানের পরপরই ওয়াশিংটনের পথে রওনা দিয়ে ট্রাম্প ইরানের বিষয়ে নমনীয় প্রস্তাবের কথা জানান।
ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও আগামীর বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব
আমেরিকার এই নমনীয়তার সুযোগে ইরান পরমাণু অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বলে মনে করছেন মার্কিন বিশেষজ্ঞরা। আমেরিকান অধ্যাপক পেইপ এক পূর্বাভাসে জানিয়েছেন, আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে সক্ষম হবে। চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা ও যুদ্ধাবস্থা কাটিয়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও সামরিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।
ভূ-রাজনীতিবিদদের মতে, পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্র ফিলিপাইনের সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটে মার্কিন প্রশাসন পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হওয়ায় চীন নিজেদের মজুদ থেকে তেল-গ্যাস সরবরাহ করে তাদের উদ্ধার করেছে। এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে মার্কিন রাজনৈতিক প্রভাব বা ‘হেজেমনি’ (Hegemony) কমে যাওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ।
📊 এক নজরে ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তন ও নেপথ্য কারণ
- পূর্ববর্তী অবস্থান: ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ শূন্যে (Zero Enrichment) নামিয়ে আনা।
- বর্তমান অবস্থান: স্থায়ী সমাপ্তি নয়, ২০ বছরের স্থগিতাদেশেই সম্মতি।
- মার্কিন অস্ত্র সংকট: সাম্প্রতিক সংঘাতে প্রায় ৫০% ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ শেষ।
- চীনের শক্তি: বিশ্বের ৬০%-৮০% রেয়ার আর্থ খনিজের নিয়ন্ত্রণ বেইজিংয়ের হাতে, যা মার্কিন অস্ত্র তৈরিতে জরুরি।
- কূটনৈতিক বার্তা: শি জিনপিং কর্তৃক ট্রাম্পকে সরাসরি বিশেষ প্রটোকল না দেওয়া।
পরবর্তী পরিস্থিতি: মার্কিন শেয়ার বাজার বন্ধের পর বা চলতি সপ্তাহের শেষে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা নতুন কোনো প্রতীকী হামলা চালাবে কি না, তা নিয়ে এখনো আশঙ্কা রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে একক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার প্রভাব কমে গিয়ে একটি ‘মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ড’ বা বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া ট্রাম্পের এই বেইজিং সফরের মাধ্যমে আরও গতি পেল।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, চায়না ডেইলি, রয়টার্স এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ শাখা



