কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি ও ইমামতি থেকে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন হয়ে ওঠার রোমহর্ষক উত্থান-পতন; দেড় শতাধিক হত্যাকাণ্ডের নায়ক আব্দুর রশিদ মালিথার আদ্যোপান্ত।
কুষ্টিয়া | ১৬ মে ২০২৬
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আন্ডারওয়ার্ল্ড ও নিষিদ্ধ চরমপন্থী রাজনীতির ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময়, রোমাঞ্চকর এবং নৃশংস অধ্যায়ের নাম আব্দুর রশিদ মালিথা ওরফে ‘দাদা তপন’। নব্বইয়ের दशक থেকে শুরু করে দুই হাজার সালের প্রথম দশক পর্যন্ত কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও খুলনা অঞ্চলে একচ্ছত্র মুকুটহীন সম্রাট ছিলেন তিনি। কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি ‘দাওরা হাদীস’ ও মসজিদের ইমামতির মতো সম্পূর্ণ বিপরীত ধর্মীয় ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে কীভাবে তিনি দেড় শতাধিক হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দেওয়া একটি ক্যাডার বাহিনীর প্রধান হয়ে উঠলেন, তা আজও অপরাধ বিজ্ঞানের গবেষকদের ভাবিয়ে তোলে। ২০০৮ সালের ১৮ জুন কুষ্টিয়ার বাড়াদি স্কুলপাড়া গ্রামে র্যাবের সাথে এক সম্মুখ সমরে নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে এই ত্রাসের।
১. প্রারম্ভিক জীবন: মাদ্রাসা ছাত্র থেকে চরমপন্থী নেতা
দাদা তপনের আসল নাম আব্দুর রশিদ মালিথা। তিনি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের পশ্চিম বিষয়খালী গ্রামের ইবাদত হোসেন মালিথার ছেলে। তাঁর জীবনের শুরুটা আন্ডারওয়ার্ল্ডের আর দশটা অপরাধীর মতো ছিল না, বরং তা ছিল চমকে ভরা:
- ধার্মিক ব্যাকগ্রাউন্ড: তিনি কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি ‘দাওরা হাদীস’ (যা বর্তমানে মাস্টার্সের সমমান) পাস করেছিলেন।
- ইমামতি: শিক্ষা জীবন শেষে তিনি কুষ্টিয়ার একটি স্থানীয় মসজিদে খণ্ডকালীন ইমাম হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন।
- বাম রাজনীতিতে দীক্ষা: ইমামতি করার সময় বা তার কিছুদিনের মধ্যেই, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে, তিনি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী দল ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)’-এ যোগ দেন। অত্যন্ত চতুর, দূরদর্শী ও বলশালী হওয়ায় দ্রুতই তিনি দলের সামরিক শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদে চলে আসেন।
২. ‘জনযুদ্ধ’র প্রতিষ্ঠা ও রক্তক্ষয়ী বিভীষিকা
২০০২-২০০৩ সালের দিকে মূল ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল)’-এর শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে আদর্শিক ও কৌশলগত বিরোধ তৈরি হয় তপনের। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা বা প্রচারপত্র বিলি নয়, বরং তীব্র সশস্ত্র ক্যাডারভিত্তিক আক্রমণ, চাঁদাবাজি ও মনস্তাত্ত্বিক ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমেই একক আধিপত্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
এই জেরে ২০০৩ সালে তিনি মূল দল থেকে বের হয়ে গঠন করেন সম্পূর্ণ নতুন এবং আরও বেশি উগ্র ও নৃশংস একটি দল—‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ)’। এই দল গঠনের পর পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল কার্যত রক্তগঙ্গায় ভেসে যায়। তাঁর আগ্রাসী তৎপরতায় পূর্ববাংলার অপর গ্রুপ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, শ্রমজীবী মুক্তি আন্দোলন, গণমুক্তিফৌজ, কৃষক সংগ্রাম সমিতি, জাসদ গণবাহিনী ও সর্বহারা পার্টিসহ গোপন এবং প্রকাশ্য সংগঠনগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ে।
কিলিং স্কোয়াড ও একে-৪৭ এর ব্যবহার
দাদা তপন ছিলেন ওই অঞ্চলের প্রথম সারির চরমপন্থী নেতাদের একজন, যিনি ব্যক্তিগত সুরক্ষায় এবং অপারেশনে অত্যাধুনিক AK-47 রাইফেল ব্যবহার করতেন। তাঁর অধীনে ছিল একটি সুপ্রশিক্ষিত ও দুর্ধর্ষ ‘ডেথ স্কোয়াড’ বা হিট স্কোয়াড। কোনো এলাকায় আধিপত্য বিস্তার বা চাঁদা আদায়ের জন্য এই স্কোয়াডকে পাঠানো হতো। ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া বা খুলনার অনেক বড় বড় নেতা ও ঠিকাদারকে নিয়মিত তাঁর ফান্ডে চাঁদা দিতে হতো। তপনের কথার সামান্য হেরফের হলেই বোমার ঝাঁক গিয়ে পড়ত নেতাদের বাড়িতে অথবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে।
আইইডি (IED) ও রিমোট কন্ট্রোল বোমার ব্যবহার
কোনো কোনো এলাকায় প্রতিপক্ষ গ্রুপ যখন শক্তিশালী অবস্থানে থাকত, তখন তাদের দমনে দাদা তপন গেরিলা যুদ্ধকৌশল অবলম্বন করতেন। প্রতিপক্ষের যাতায়াতের কাঁচা রাস্তায় বা মেঠোপথে তাঁর স্কোয়াড মাটির নিচে শক্তিশালী দূরনিয়ন্ত্রিত ল্যান্ডমাইন বা আইইডি (IED) পুঁতে রাখত। প্রতিপক্ষ দলের লাইন-কমান্ডার বা ক্যাডাররা যখন দলবল নিয়ে হেঁটে বা মোটরসাইকেলে ওই পথ দিয়ে যেত, তখন দূর থেকে রিমোটের সাহায্যে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাদের উড়িয়ে দেওয়া হতো।
কুষ্টিয়া থানায় হামলা ও রূপসা ঘাটের গণহত্যা
অস্ত্রের সংকট দেখা দিলে একবার দাদা তপনের নির্দেশে তাঁর বাহিনী কুষ্টিয়ার একটি পুলিশ ফাঁড়ি/থানায় অতর্কিত গেরিলা হামলা চালায়। সেখানে কর্তব্যরত ৫ জন পুলিশ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে সরকারি সব রাইফেল ও গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে যায় তাঁর দল। এছাড়া খুলনার রূপসা ঘাটের টোল কালেকশন এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে তাঁর স্কোয়াড, যেখানে ঘটনাস্থলেই ৬ জন নিহত হন।
৩. মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: চিরকুট সংকেত ও ছোট ভাইয়ের ‘আইটি সেল’
দাদা তপনের হত্যাকাণ্ডের একটি সুনির্দিষ্ট এবং পরিচিত মনস্তাত্ত্বিক প্যাটার্ন ছিল। তাঁর ডেথ স্কোয়াড যাকে জবাই বা গুলি করে হত্যা করত (যার একটি বড় অংশই ছিল গলা কেটে হত্যা), লাশের বুকের ওপর বা ঘটনাস্থলে একটি চিঠি বা চিরকুট ফেলে রেখে আসত। তাতে লাল কালিতে লেখা থাকত:
“জনগণের শত্রুকে খতম করা হলো — দাদা”
প্রদর্শনীবাদ ও প্রশাসনকে ওপেন চ্যালেঞ্জ
তপন কেবল মাঠপর্যায়ে খুন করেই ক্ষান্ত হতেন না, তিনি আধুনিক প্রচারণাতেও বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর আপন ছোট ভাই গোলাম হোসেন আকাশ ছিলেন এই দলের প্রচার ও পারসনাল আইটি সেলের প্রধান। ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া বা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কোনো হাই-প্রোফাইল খুন বা বোমাবাজি করার পরপরই আকাশ তাঁর গোপন আস্তানা (যেখানে কম্পিউটার, ফ্যাক্স মেশিন ও প্রিন্টার ছিল) থেকে খবরের কাগজ ও পুলিশ ফাঁড়িতে ফ্যাক্স বার্তা বা ফোন করে বুক ফুলিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করতেন এবং প্রশাসনকে ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতেন। এই মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণার কারণে তাঁর নাম শুনলেই মানুষের হৃদস্পন্দন থেমে যেত।
৪. ১৫ বছরের অপরাজেয় ক্যারিয়ার ও যেভাবে জেল এড়ালেন
১৯৯২ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ বছরের আন্ডারওয়ার্ল্ড ক্যারিয়ারে দাদা তপন কখনো পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হননি, এক রাতও জেল খাটেননি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধুরন্ধর এবং ছদ্মবেশ ধারণে পারদর্শী। তৎকালীন ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ কিংবা পুলিশের বড় বড় চিরুনি অভিযান থমকে যেত তাঁর নিখুঁত নেটওয়ার্ক ও দূরদর্শিতার কাছে। ২০০৪ সালে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB) গঠিত হওয়ার পর যখন শীর্ষ চরমপন্থীরা একের পর এক ‘ক্রসফায়ারে’ মারা যাচ্ছিল, তখনও দাদা তপন প্রায় চার বছর র্যাবের চোখ ফাঁকি দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে নিজের রাজত্ব চালিয়ে যান।
৫. অবসান: বাড়াদি স্কুলপাড়ার সেই আসল ‘বন্দুকযুদ্ধ’
২০০৮ সালের জুনের মাঝামাঝি সময়ে র্যাব-১২ এবং র্যাব-৬ এর একটি যৌথ দল গোপন গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত সূত্রের ভিত্তিতে জানতে পারে যে, কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বাড়াদি স্কুলপাড়া গ্রামের একটি সুরক্ষিত দোতলা বাড়িতে দাদা তপন অবস্থান করছেন। মূলত সদর উপজেলার ১৮ মাইল নামক স্থান থেকে ঝিনাইদহ শহরের ব্যাপারীপাড়ার সুমন নামে এক যুবক ১৭টি মোবাইল সিমসহ র্যাবের জালে ধরা পড়ার পরেই দাদা তপনের এই গোপন ডেরার খোঁজ মেলে।
- ১৮ জুন, ২০০৮ (ভোররাত): দিনের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। র্যাবের একটি চৌকস দল পুরো বাড়িটি ঘেরাও করে প্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করে।
- সম্মুখ সমর ও মৃত্যু: অন্যান্য চরমপন্থীদের মতো তপন হাত তুলে আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি তাঁর প্রিয় একে-৪৭ নিয়ে র্যাবের সাথে সম্মুখ সমরে লিপ্ত হন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই প্রকৃত বন্দুকযুদ্ধে ৪৫ বছর বয়সী আব্দুর রশিদ মালিথা ওরফে দাদা তপন এবং তাঁর ঘরের ভেতরে থাকা জনযুদ্ধের নারী শাখার প্রধান নাছিমা আক্তার রিক্তা দুজনেই নিহত হন।
- লাশ ও অস্ত্র উদ্ধার: গোলাগুলি থামার পর র্যাব ঘর থেকে দাদা তপনের নিথর দেহ উদ্ধার করে, যার বুকে ও বাম বাহুতে মোট ৬টি গুলি লেগেছিল। পাশেই পড়ে ছিল তাঁর ব্যবহৃত একে-৪৭ রাইফেলটি।
র্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল গুলজার আহমেদ (পরবর্তীতে ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডিতে নিহত) সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, “তারা বন্দুকযুদ্ধের সময়েই নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।”
যদিও পরবর্তীতে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর একটি প্রতিবেদনে তপনের ভাই আকাশের বরাত দিয়ে এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করা হয়েছিল, তবে র্যাব ও স্থানীয় প্রশাসন সেই দাবি নাকচ করে দেয়। পরবর্তীতে কুষ্টিয়া আদালতের হেফাজত থেকে ২৬ জুন তপনের আইটি প্রধান ছোট ভাই গোলাম হোসেন আকাশ এবং বাহিনীর অন্যতম প্রধান দুই শুটার টিক্কা ও একদিলও পৃথক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে ‘জনযুদ্ধ’ অধ্যায়ের চিরতরে অবসান ঘটে।
📊 দাদা তপন ও জনযুদ্ধ: এক নজরে প্রোফাইল (Data Points)
| বৈশিষ্ট্য/ক্ষেত্র | বিবরণ |
|---|---|
| আসল নাম | আব্দুর রশিদ মালিথা (সাংগঠনিক নাম: দাদা তপন / তপন) |
| শিক্ষাগত যোগ্যতা | দাওরা হাদীস (কওমী মাদ্রাসা) |
| পূর্ব পেশা | খণ্ডকালীন মসজিদের ইমাম (কুষ্টিয়া) |
| দলীয় অবস্থান | প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ) [২০০৩] |
| সক্রিয় সময়কাল | ১৯৯২ — ২০০৮ (১৫ বছর) |
| প্রধান অস্ত্র | AK-47 রাইফেল এবং রিমোট কন্ট্রোল্ড আইইডি (IED) |
| হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা | ১৫০ জনেরও বেশি (যার একটি বড় অংশই ছিল গলা কেটে হত্যা) |
| চিহ্ন বা সিগনেচার | লাশের পাশে “জনগণের শত্রুকে খতম করা হলো—দাদা” লেখা চিরকুট |
| নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল | কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও খুলনা |
| মৃত্যু | ১৮ জুন, ২০০৮ (কুষ্টিয়ার বাড়াদিতে র্যাবের সাথে সম্মুখ বন্দুকযুদ্ধে) |
উপসংহার: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিচারহীনতা, চরম দারিদ্র্য এবং প্রকাশ্য রাজনৈতিক কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে দাদা তপন নিজের ক্ষমতার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। মার্কসবাদের নামে সশস্ত্র বুর্জোয়া স্টাইলের চাঁদাবাজি ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কারণে আজ দেড় যুগ পরেও কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ অঞ্চলের মানুষের কাছে তাঁর নাম আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় বিভীষিকা ও মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে খোদিত রয়েছে।
তথ্যসূত্র: সমীকরণ ক্রনিকলস এবং মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর বিশেষ অনুসন্ধান রিপোর্ট (২০০৮)।



