গভীর রাতে নারায়ণগঞ্জের ৫ নম্বর খেয়াঘাটে অসংলগ্ন আচরণের অভিযোগ; ঘাটে ভাঙচুর ও টাকা ছুড়ে ফেলার অভিযোগও উঠেছে, পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করে তদন্ত কমিটি
নারায়ণগঞ্জ | TODAY TV BD | ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নারায়ণগঞ্জের বন্দর ঘাট এলাকায় গভীর রাতে নৌ পুলিশের এক এএসআইয়ের নাচ, গান, অসংলগ্ন কথাবার্তা ও মাতলামির অভিযোগের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাল ভিডিওতে নারায়ণগঞ্জ সদর নৌ থানার এএসআই আব্দুল মান্নানকে কখনো গান গাইতে ও নাচতে, কখনো মাটিতে বসে থাকতে এবং কখনো উচ্চস্বরে বলতে শোনা যায়—‘আমার বউ আমাকে জুতা দিয়ে মারছে।’
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে নৌ পুলিশ কর্তৃপক্ষ তাঁকে কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করেছে। একই সঙ্গে তাঁর আচরণ ও ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে নৌ পুলিশ।
ভাইরাল ভিডিওতে যা দেখা গেল
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রায় এক মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এএসআই আব্দুল মান্নানকে জনসমক্ষে অস্বাভাবিক আচরণ করতে। কখনো তিনি গানের তালে নাচছেন, কখনো মাটিতে বসে পড়ছেন, আবার কখনো উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে কথা বলছেন।
ভিডিওর একটি পর্যায়ে তাঁকে স্ত্রী সম্পর্কে বলতে শোনা যায়—‘আমার বউ আমাকে জুতা দিয়ে মারছে।’ আশপাশের লোকজনের প্রশ্নের জবাবেও তিনি অসংলগ্নভাবে কথা বলতে থাকেন। তাঁকে ঘিরে উৎসুক জনতার ভিড়ও দেখা যায়।
ভিডিওতে তাঁকে মাদকজাতীয় কোনো কিছু গ্রহণ করেছেন কি না, সে বিষয়ে উপস্থিত কয়েকজনের মধ্যে কথোপকথনও শোনা যায়। তবে তিনি আসলেই মাদক সেবন করেছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ঘটনাটি কোথায় ও কখন
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার গভীর রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের বন্দর এলাকার ৫ নম্বর খেয়াঘাটে এ ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঘটনার সময় নিয়ে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও গভীর রাতেই এএসআই মান্নানকে সেখানে অস্বাভাবিক আচরণ করতে দেখা যায়।
এএসআই আব্দুল মান্নান এর আগে র্যাব-৩-এ কর্মরত ছিলেন এবং প্রায় ২০ দিন আগে নারায়ণগঞ্জ সদর নৌ থানায় যোগ দিয়েছিলেন বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
স্ত্রীর সঙ্গে বিরোধের কথাও উঠে এসেছে
ঘটনার প্রাথমিক অনুসন্ধানে পুলিশ জানিয়েছে, এএসআই মান্নানের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর কিছুদিন ধরে পারিবারিক বিরোধ চলছিল। শুক্রবার রাতে মোবাইল ফোনে তাঁদের মধ্যে ঝগড়া হয় বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, মান্নানের স্ত্রী সিলেটে গ্রামের বাড়িতে থাকেন এবং মান্নান নৌ পুলিশের থানার কোয়ার্টারে থাকেন। ওই রাতের পারিবারিক বিরোধের পরই তাঁকে এমন আচরণ করতে দেখা যায়।
তবে স্ত্রী তাঁকে জুতা দিয়ে মারধর করেছেন—এটি এখনো পুলিশের তদন্তে প্রমাণিত কোনো ঘটনা নয়। ভিডিওতে মান্নান নিজেই এমন কথা বলেছেন।
ঘাটে ভাঙচুর ও টাকা ছুড়ে ফেলার অভিযোগ
ঘটনাটিকে শুধু নাচ-গান বা অসংলগ্ন আচরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি স্থানীয় কিছু প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁদের অভিযোগ, এএসআই মান্নান ঘাট এলাকার কিছু জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন এবং টোল বা সংগ্রহ করা টাকা ছুড়ে ফেলে দেন।
একাধিক সংবাদ প্রতিবেদনে এই অভিযোগের উল্লেখ পাওয়া গেছে। তবে কত টাকা ছিল, কার টাকা ছিল এবং তিনি ঠিক কী ধরনের ক্ষতি করেছেন—এসব বিষয়ে পুলিশ এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি। অভিযোগগুলো তদন্তের অংশ হিসেবেই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কিছু প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয়রা তাঁর আচরণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন এবং এ সময় আশপাশে ভিড় জমে যায়।
‘মাতলামি’ নাকি অন্য কোনো কারণ?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই ঘটনাটিকে সরাসরি ‘মদ্যপ অবস্থায় মাতলামি’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। কিন্তু পুলিশ এখনো পরীক্ষার ভিত্তিতে তা নিশ্চিত করেনি।
নারায়ণগঞ্জ সদর নৌ থানার ওসি রকিবুজ্জামান জানিয়েছেন, এএসআই মান্নান কোনো মাদকজাতীয় পদার্থ সেবন করেছিলেন কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ ভিডিওতে তাঁর আচরণ স্পষ্ট হলেও মাতলামির কারণ কী ছিল, তা এখনো তদন্তসাপেক্ষ বিষয়।
তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নৌ পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নেয়।
নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের নৌ পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে এএসআই আব্দুল মান্নানকে সদর নৌ থানার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা ও ঘটনার প্রকৃত কারণ বেরিয়ে এলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় এবং প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সদস্যের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্য যখন জনসমক্ষে এমন আচরণের অভিযোগে আলোচনায় আসেন, তখন বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
বিশেষ করে নৌ পুলিশের একজন কর্মকর্তা কর্মরত এলাকায় বা তার কাছাকাছি জনসমক্ষে অস্বাভাবিক আচরণ করলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত আচরণের প্রশ্ন থাকে না; এর সঙ্গে বাহিনীর শৃঙ্খলা ও জনআস্থার বিষয়ও জড়িয়ে পড়ে।
তবে এ ঘটনায় এএসআই মান্নানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভিডিওতে দেখা আচরণের কারণ এবং ভাঙচুর বা অর্থ ছুড়ে ফেলার অভিযোগের সত্যতা—সবকিছুই তদন্তের ফলের ওপর নির্ভর করবে।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় নতুন করে আলোচনায় নৌ পুলিশের শৃঙ্খলা
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে একজন পুলিশ সদস্যের এমন আচরণের জন্য কঠোর ব্যবস্থা দাবি করছেন। আবার কেউ কেউ তদন্ত শেষ হওয়ার আগে চূড়ান্ত মন্তব্য না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে, ঘটনাটি পুলিশের আচরণবিধি, কর্মরত অবস্থায় ব্যক্তিগত আচরণ এবং পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সমস্যার প্রভাব দায়িত্ব পালনে কতটা পড়তে পারে—এসব প্রশ্নও নতুন করে সামনে এনেছে।
তদন্ত কমিটি এখন ঘটনার ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবানবন্দি এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য যাচাই করবে।
এরপরই পরিষ্কার হবে—এএসআই আব্দুল মান্নানের ওই রাতের আচরণের পেছনে কী ছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, এনটিভি, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, যুগান্তর, নাগরিক টিভি এবং অন্যান্য প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন; নৌ পুলিশ ও নারায়ণগঞ্জ পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য।




