সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল হওয়ার পর চাঞ্চল্য; ব্যবসায়িক বিরোধ, চাঁদাবাজি নাকি প্রভাব খাটিয়ে দখল—উঠছে নানা প্রশ্ন
বরিশাল | বিশেষ প্রতিবেদন
বরিশাল নগরের ব্যস্ত সদর রোড। দিনের কর্মচাঞ্চল্য তখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। অফিসকক্ষে বসে চা পান করছিলেন একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল আজিজ হাওলাদার। হঠাৎ কয়েকজন যুবকের প্রবেশ, মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যায়। শুরু হয় ধস্তাধস্তি, চড়-থাপ্পড়, শারীরিক লাঞ্ছনা—এরপর অভিযোগ, ভয়ভীতি দেখিয়ে জোর করে চেক ও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৭ জুন বরিশাল নগরের সদর রোডে অবস্থিত অগ্রণী হাউজিং কোম্পানি লিমিটেডের কার্যালয়ে। তবে কয়েক দিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে পুরো ঘটনা নতুন মাত্রা পায়।
ভিডিওতে দেখা যায়, অফিসকক্ষে চারজন যুবক প্রবেশ করেন। তাঁদের মধ্যে কালো পোশাক পরা একজন, যাকে ভুক্তভোগী মোস্তাফিজুর রহমান (লিটু) হিসেবে শনাক্ত করেছেন, প্রথমে কক্ষে থাকা অন্যদের বের করে দেন। এরপর তিনি আবদুল আজিজকে জাপটে ধরেন। একপর্যায়ে শুরু হয় মারধর ও ধস্তাধস্তি।
ফুটেজে আরও দেখা যায়, আবদুল আজিজ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে আরেক ব্যক্তি তাঁর পা টেনে ধরেন। পরে তাঁকে কয়েক দফা চড় মারতে দেখা যায়। কিছু সময় পর সাদা চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার দৃশ্যও ফুটে ওঠে।
সবচেয়ে আলোচিত অংশটি এসেছে ভুক্তভোগীর অভিযোগ থেকে। আবদুল আজিজ দাবি করেন, তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের পাশাপাশি সংবেদনশীল স্থানে চাপ প্রয়োগ করে ভয় দেখানো হয়, যাতে তিনি চেক ও স্ট্যাম্পে সই করতে বাধ্য হন।
তিনি বলেন, “তিন বছর আগেই সব হিসাব চূড়ান্ত হয়েছিল। জমি দিয়ে অংশীদারির নিষ্পত্তি করেছি। তারপরও কয়েক মাস ধরে এক কোটি টাকা দাবি করা হচ্ছিল।”
তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, ওই রাতে জোর করে ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক এবং দুটি সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে ব্যাংকে অভিযোগ জানানো হলে চেকের টাকা উত্তোলন সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর গত বৃহস্পতিবার আদালতে মামলা করেন আবদুল আজিজ। আদালত মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণের জন্য কোতোয়ালি মডেল থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন।
ব্যবসায়িক বিরোধ, নাকি ‘চেক সন্ত্রাস’?
এ ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে ব্যবসায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করে কথিত ‘চেক সন্ত্রাস’ বা ভয়ভীতি দেখিয়ে আর্থিক দলিল আদায়ের প্রবণতা।
আইনজীবীদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে শারীরিক নির্যাতন বা ভয় দেখিয়ে চেক কিংবা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হলে সেটি শুধু চাঁদাবাজি নয়, বরং জবরদস্তি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।
বিশেষ করে সাদা চেকে স্বাক্ষর আদায়ের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। কারণ পরে সেই চেক যেকোনো অঙ্কে ব্যবহার করার ঝুঁকি থাকে।
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা
অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। যদিও তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক পদ নেই বলে জানা গেছে। তাঁর ভাই মাহবুবুর রহমান নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি।
তবে মাহবুবুর রহমান বলেছেন—
“শুনেছি তারা দীর্ঘদিন যৌথ ব্যবসা করতেন। এর বাইরে বিস্তারিত জানি না।”
অন্যদিকে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তদন্তে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর গুরুত্বপূর্ণ
- এটি কি শুধুই ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের বিরোধ?
- নাকি ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা?
- ভিডিওতে থাকা অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল?
- জোরপূর্বক সই নেওয়া চেক ও স্ট্যাম্পের ব্যবহার হয়েছে কি না?
- অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি?
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর বরিশালজুড়ে এ ঘটনা নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। এখন নজর আদালতের নির্দেশের পর পুলিশের তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাটিকে কীভাবে মূল্যায়ন করে তার দিকে।



