সামাজিক মাধ্যমে প্রচার হয়েছিল মিটার ভাড়া বাতিলের খবর, কিন্তু মাসের পর মাস আগের মতোই টাকা কাটা হচ্ছে; ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের প্রশ্ন—ঘোষণা যদি বাস্তবায়ন না হয়, তবে এমন বার্তা দেওয়া হলো কেন?
ঢাকা | বিশেষ প্রতিবেদন
বিদ্যুতের বাড়তি খরচে যখন সাধারণ মানুষ নিত্যদিনের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন প্রিপেইড মিটারের মাসিক ভাড়া প্রত্যাহারের খবর বহু গ্রাহকের জন্য স্বস্তির বার্তা হয়ে এসেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হয়েছিল—সরকার প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ তুলে দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। এখনো আগের মতোই মিটার ভাড়া কাটা হচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে মানুষের ক্ষোভ ও প্রশ্ন।
অনেক গ্রাহকের ভাষায়, বিষয়টি কেবল একটি ভুল তথ্য নয়; এটি জনমনে অপ্রয়োজনীয় প্রত্যাশা তৈরি করে পরে হতাশা সৃষ্টি করেছে।
দেশে বর্তমানে প্রায় ৫৫ লাখ প্রিপেইড বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। তাদের মধ্যে সিঙ্গেল-ফেজ গ্রাহকদের প্রতি মাসে ৪০ টাকা এবং থ্রি-ফেজ গ্রাহকদের ৪২ টাকা করে মিটার ভাড়া দিতে হয়। পাশাপাশি প্রতি কিলোওয়াটের জন্য আবাসিক গ্রাহকদের ডিমান্ড চার্জও দিতে হয়।
অর্থাৎ একজন গ্রাহক যদি ৫ কিলোওয়াট সংযোগ ব্যবহার করেন, তাহলে শুধু ডিমান্ড চার্জ হিসেবেই তাকে ২১০ টাকা দিতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মিটার ভাড়া, ভ্যাট এবং অন্যান্য খরচ।
কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন প্রচারণায় বলা হয়েছিল, প্রিপেইড মিটারের এই মাসিক চার্জ আর কাটা হবে না। কিন্তু বাস্তবে গ্রাহকদের রিচার্জ রসিদে আগের মতোই ভাড়া কাটা হচ্ছে।
রাজধানীর একজন প্রিপেইড গ্রাহক নাজিমুল ইসলাম বলেন,
“খবর দেখে ভেবেছিলাম অন্তত একটা চাপ কমবে। কিন্তু রিচার্জ করার পর দেখি আগের মতোই টাকা কাটা হয়েছে। তাহলে এমন খবর ছড়ানোর মানে কী?”
ধানমন্ডির বাসিন্দা আমেনা মুক্তার ভাষায়,
“ভাড়া তো একদিনও বন্ধ হয়নি। মানুষকে আগে আশা দেখানো হয়, পরে দেখা যায় বাস্তবে কিছুই হয়নি।”
কীভাবে তৈরি হলো বিভ্রান্তি?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মার্চে বিদ্যুৎ খাতসংক্রান্ত একটি বৈঠকের পর মিটার ভাড়া প্রত্যাহারের বিষয়ে আশাব্যঞ্জক বক্তব্য সামনে আসে। এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে সেটি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যেন সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত হয়ে গেছে।
কিন্তু বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাস্তবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। কারণ প্রিপেইড মিটার প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে ঋণের অর্থে, আর সেই ঋণ পরিশোধের একটি উৎস হচ্ছে মিটার ভাড়া।
বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর সূত্র বলছে, বিদ্যুতের মূল্য, মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ ও অন্যান্য ফি—সবকিছু একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নির্ধারিত হয়। এর একটি অংশ বাদ দিলে তার আর্থিক প্রভাব অন্য কোথাও গিয়ে পড়বে।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, যদি সরকার মিটার ভাড়া পুরোপুরি তুলে দিতে চায়, তাহলে হয় সরকারকে সেই অর্থ বহন করতে হবে, নয়তো অন্য কোনো উপায়ে তা সমন্বয় করতে হবে।
বছরে কত টাকা আসে মিটার ভাড়া থেকে?
হিসাব বলছে, দেশের ৫৫ লাখ গ্রাহকের সবাই যদি সিঙ্গেল-ফেজ গ্রাহকও হন, তাহলেও প্রতি মাসে মিটার ভাড়া বাবদ প্রায় ২২ কোটি টাকা আদায় হয়। বছরে যার পরিমাণ প্রায় ২৬৪ কোটি টাকা।
এত বড় অঙ্কের অর্থ হঠাৎ বন্ধ করলে তার বিকল্প অর্থায়নের প্রশ্নও সামনে আসে।
ক্ষোভের জায়গাটা কোথায়?
গ্রাহকদের বড় একটি অংশ বলছেন, বিষয়টি কেবল ৪০ বা ৪২ টাকার নয়; বিষয়টি আস্থার।
একজন গ্রাহক যখন শুনবেন কোনো চার্জ তুলে দেওয়া হয়েছে, তিনি স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেবেন পরের রিচার্জে সেই সুবিধা পাবেন। কিন্তু পরে যখন বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখবেন না, তখন বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন, “যে সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি, সেটিকে কার্যকর হয়েছে বলে প্রচার করা হলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়।”
প্রশ্ন এখন একটাই
মিটার ভাড়া বহাল থাকবে কি থাকবে না—এটি নীতিনির্ধারণের বিষয়। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগেই সেটিকে কার্যকর বার্তা হিসেবে ছড়িয়ে পড়া কি জনআস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে?
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ বিল মানুষের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই এই ধরনের বিষয়ে অস্পষ্টতা বা অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি হলে তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক প্রতিক্রিয়াও তৈরি করতে পারে।
এখন গ্রাহকদের প্রশ্ন—যে ভাড়া আজও কাটা হচ্ছে, সেটি তুলে দেওয়ার খবর এত জোরালোভাবে প্রচার হয়েছিল কেন? আর যদি সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে না পৌঁছে থাকে, তাহলে মানুষের কাছে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যাও কি দেওয়া উচিত ছিল না?



