উপকূলীয় জনপদ খুলনার দাকোপ উপজেলায় শিক্ষার প্রসার, তরুণদের অনুপ্রেরণা এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছে হিউম্যানিটি পাবলিক লাইব্রেরি। গত ৩০ মে ২০২৬ (শনিবার) সকাল ১১টায় সুতারখালী ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় “দাকোপ উপজেলার কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনামূলক সেমিনার ২০২৬”। দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা, নেতৃত্ব, নাগরিক দায়িত্ববোধ ও বৈশ্বিক সুযোগ-সুবিধা বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানের সূচনায় হিউম্যানিটি পাবলিক লাইব্রেরির অন্যতম উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. নাভিদ সালেহ-এর পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তা পাঠ করে শোনান আশিকুর রহমান। বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হিউম্যানিটি পাবলিক লাইব্রেরি বর্তমানে উপকূলীয় অঞ্চলের ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের জন্য জ্ঞান, তথ্য ও শিক্ষার নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “দক্ষিণ বাংলাদেশ বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফ্রন্টলাইনে অবস্থান করছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অনিয়মিত আবহাওয়া এই অঞ্চলের মানুষের জন্য নিত্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে জ্ঞান ও শিক্ষার বিস্তারই হতে পারে টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।”
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বোরহান উদ্দিন মিঠুর। জরুরি সরকারি দায়িত্ব পালনের কারণে তিনি মূল অনুষ্ঠানে অংশ নিতে না পারলেও পরবর্তীতে সংবর্ধনা স্মারক গ্রহণকালে লাইব্রেরির কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, “দাকোপ উপজেলায় কার্যকরভাবে পরিচালিত লাইব্রেরির সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। নলিয়ানে অবস্থিত হিউম্যানিটি পাবলিক লাইব্রেরি এবং কৈলাশগঞ্জের একটি লাইব্রেরি বর্তমানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। লাইব্রেরিকে কেবল বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এটি সমাজের সকল মানুষের মিলনকেন্দ্র ও জ্ঞানচর্চার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে হবে।”

অনুষ্ঠানের গেস্ট অব অনার ও মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এবং এমসিএন/ইউএন একাডেমিক ইমপ্যাক্টের সিভিক লার্নিং কাউন্সিলের ইনঅগুরাল চেয়ার ডেভিড ড্যাউল্যান্ড।
নিজ বক্তব্যে তিনি বলেন, “বিশ্বের অনেক স্থানে লাইব্রেরি কার্যক্রম সংকুচিত হচ্ছে, এমন সময়ে বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত উপকূলীয় গ্রামে তরুণদের জন্য লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক উদ্যোগ। আমি বিশেষভাবে আরাফাত হোসেন আকাশকে ধন্যবাদ জানাই, যিনি এই অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে নিরলসভাবে কাজ করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “জাতিসংঘের সঙ্গে যুক্ত বিশ্বব্যাপী চার হাজারেরও বেশি তরুণ নেতা ও উদ্যোক্তা পৃথিবীকে আরও সুন্দর ও টেকসই করার লক্ষ্যে কাজ করছেন। দাকোপের শিক্ষার্থীরাও নিজেদের মেধা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিবর্তনের অংশীদার হতে পারে।”
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ডিসিপ্লিনের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রধান ড. মো. হাসান হাওলাদার। তিনি বলেন, “এই ভৌগোলিক অঞ্চলে একটি সক্রিয় লাইব্রেরির উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে আরও সুসংগঠিত কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে হবে।”
ঢাকা থেকে আগত বিটিসিএলের টেকনিক্যাল অফিসার মঞ্জুরুল বারী কবির বলেন, “শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে এত দূর থেকে আসতে পেরে আমি আনন্দিত। এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে।”
বিশিষ্ট সাংবাদিক আজগর হোসেন সাব্বির লাইব্রেরির কার্যক্রমে ভবিষ্যতেও সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। বিশেষ অতিথি হিসাবে বাংলাদেশ পুলিশের এসআই মো. খায়রুল আলম বলেন, “এই লাইব্রেরির কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করে সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।” বিশেষ অতিথি হিসাবে শিশুদের জন্য আমরা সংগঠনের সম্মানিত সভাপতি বেলা হোসেন, লাইব্রেরিকে সমাজের দর্পণ হিসাবে কাজ লাগাতে আহ্বান করেছেন ম
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হিউম্যানিটি পাবলিক লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি আরাফাত হোসেন আকাশ। তিনি বলেন, “লাইব্রেরি শুধু বই ধার দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি কমিউনিটি হাব। আমরা চাই সমাজের সব বয়সী মানুষ এখানে এসে শিখুক, আলোচনা করুক, নেতৃত্ব গড়ে তুলুক এবং নিজেদের উন্নয়নের পথ খুঁজে নিক।”
অনুষ্ঠানে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য নির্বাচিত মোট ১৪ জন কৃতী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
সংবর্ধনা পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন প্রিতম বৈদ্য (খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়), আরিফ শেখ (খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়), রায় উৎস কুমার (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়), মো. আরিফ মোড়ল (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়), শুভ্র মোড়ল, ঐশী বিশ্বাস, পিউ মণ্ডল, অমিতাভ মণ্ডল, লিটন রায় ও আফসানা আক্তার (গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ)।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বৃষ্টি খাতুন (সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, দক্ষিণ কোরিয়া), হাসিব জামান নিলয় (ফ্রাঙ্কফুর্ট ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস, জার্মানি), হাদিউজ্জামান (মারডক ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া) এবং মেহেদী হাসান (উসুক ইউনিভার্সিটি, দক্ষিণ কোরিয়া)। অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের পক্ষে তাদের পরিবারের সদস্যরা সংবর্ধনা স্মারক গ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা হিউম্যানিটি পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেন এবং দর্শনার্থী খাতায় নিজেদের অনুভূতি ও শুভেচ্ছা লিপিবদ্ধ করেন। পরে তারা সামাজিক উদ্যোগ ‘শুলুবন’-এর নারী হস্তশিল্পীদের কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
স্থানীয়দের মতে, দাকোপের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ ও ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের উদ্যোগ শুধু শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করছে না, বরং একটি জ্ঞানভিত্তিক, সচেতন ও সহনশীল সমাজ গঠনের ভিত্তি তৈরি করছে। হিউম্যানিটি পাবলিক লাইব্রেরির এই আয়োজন প্রমাণ করেছে—পরিবর্তনের সূচনা কখনও কখনও একটি ছোট্ট গ্রামীণ পাঠাগার থেকেও হতে পারে।



