জোবায়ের আহমেদ, সমকাল থেকে
বর্তমান সময়ে অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে চীনের অবস্থান অনেক দৃঢ় ও সুসংহত। ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন চত্বরে পিপলস রিপাবলিক অব চায়না প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চীনে কমিউনিস্ট শাসনের সূচনা হয়। চীনে নতুন এ রাজনৈতিক ধারার মূল কারিগর হিসেবে ছিলেন দেশটির অবিসংবাদিত নেতা মাও সে–তুং। পরবর্তী সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির দূরদর্শী ও দক্ষ নেতৃত্ব দেশটিকে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় সামনের দিকে এগিয়ে নিতে নিয়ামক ভূমিকা রাখে।

চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া
কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়নার গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হলো পলিট ব্যুরো। এটি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সবচেয়ে সিনিয়র সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয়; যেখানে কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেলও (বর্তমানে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং) থাকেন। তিনিই মূলত দলের ও দেশের শীর্ষ নেতা। পলিট ব্যুরোর বর্তমান সদস্যদের দ্বারা তারা নির্বাচিত হয়ে থাকেন। পলিট ব্যুরোর সদস্যরা কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে চীনা পার্লামেন্ট বা ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস সাধারণত এ সিদ্ধান্তগুলোকে আইনে পরিণত করে। ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে কোনো আইন পাস হলে এগুলো প্রদেশ, শহর, আদালত ও সামরিক বাহিনীতে বলবৎ হয়।
চীনের শাসন ও নীতিনির্ধারণীর ক্ষেত্রে স্টেট কাউন্সিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এর প্রধান হলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। তার অবস্থান প্রেসিডেন্টের নিচে। স্টেট কাউন্সিলের কাজ হলো দলের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলো দেশব্যাপী বাস্তবায়ন করা। দেশটির শাসন ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় মিলিটারি কমিশন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি চীনের সামরিক বাহিনীকে নেতৃত্ব দেয়। কেন্দ্রীয় মিলিটারি কমিশন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। দেশটির সব সৈন্যবাহিনী কেন্দ্রীয় মিলিটারি কমিশনের অধীনে থাকে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশল ও অর্থনৈতিক সংস্কার
আধুনিক চীনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় হয়ে থাকবে দেং শিয়াও পিংয়ের শাসন আমল। তার নীতি ছিল ‘রিফরম অ্যান্ড ওপেনিং আপ’”অর্থাৎ ‘সংস্কার ও উদারীকরণ’। এ নীতি চীনের অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়ন কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তার শাসন আমলে এ নীতি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ সময় মুক্ত বাণিজ্যের জন্য বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে দেশটি প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে সক্ষম হয়; যা চীনের মানুষের জীবনযাত্রার রূপান্তরে সহায়ক ভূমিকা রাখে। চীনে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ৫০-এর দশকের শুরুর দিকে। এখন পর্যন্ত চীন ১৫টি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো একটি আধুনিক সাম্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। সুদীর্ঘ এ অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়ন কৌশল পরিকল্পনার পথচলায় বিশ্বের অন্যতম দেশ হিসেবে চীন একটি পরিপূর্ণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিস্টেম তৈরি ও দারিদ্র্য দূরীকরণে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে চীনের অর্থনীতির আকার ১৪০ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ২০.২ ট্রিলিয়ন ডলার) এবং বর্তমানে চীন বিশ্বের ১৫০টি দেশ ও অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। এ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সরকার ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের কার্যকর সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সুবিধা প্রদান করে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থাকে, গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলোকে চিহ্নিত করা হয়, যা জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করে। মূলত এ পরিকল্পনার মাধ্যমে বাণিজ্যিক অংশীদাররা ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বাণিজ্যিক অংশীদাররা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও অন্যান্য সুবিধা পেয়ে থাকে। মূলত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চীনের অর্থনৈতিক সংস্কার ও উন্নয়ন কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
অবকাঠামো উন্নয়ন
বর্তমান সময়ে অবকাঠামো উন্নয়ন ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় চীন অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধন করেছে। ২০২৪ সালের শেষদিকে চায়না ন্যাশনাল রেলওয়ে বেইজিংয়ে নতুন হাই স্পিড ইলেকট্রিক ট্রেন (সিআর ৪৫০ মডেল) চালু করেছে; ট্রায়াল রানের সময় এর সর্বোচ্চ স্পিড ছিল প্রতি ঘণ্টায় ৪৫০ কিলোমিটার। ফলে ট্রেনটি বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির ট্রেনের তকমা লাভ করে। গতিসীমার পাশাপাশি অন্যান্য কারিগরি ফিচার ট্রেনটিকে বর্তমান সময়ে রেলওয়ে খাতে অনন্য এক উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ইলেকট্রিক ট্রেন জ্বালানি সাশ্রয়, অভ্যন্তরীণ নয়েজ লেভেল ও ব্রেকিং ডিস্ট্যান্সের বিবেচনায় বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে। এর মধ্যে ট্রেনটির ব্রেকিং সিস্টেম বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। কারণ সর্বোচ্চ গতিসীমায়ও এটি নিরাপদ ও স্মুদ ব্রেকিংয়ের নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে। রেলওয়ে খাতের এ অর্জন শুধু চীনের প্রাযুক্তিক দক্ষতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়নি, বরং এটি আন্তর্জাতিক পর্যটন ও ব্যবসার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। মানুষ এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে এক শহর থেকে অন্য শহরে চলাচল করতে পারছে। চীনের সিআর ৪৫০ মডেলের ট্রেনটি প্রচলিত ইন্ডাস্ট্রির রূপান্তরের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক, একই সঙ্গে যা অর্থনীতির উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের এক অনন্য উদাহরণ। শুধু চীনের অভ্যন্তরে নয়, এর বাইরেও চীনা রেলওয়ে প্রযুক্তি মুনশিয়ানা দেখিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হাঙ্গেরি-সার্বিয়া রেলপথ, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা-বান্দুং হাই স্পিড রেল প্রকল্প ও বাংলাদেশের পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের কথা। এর পাশাপাশি মেট্রো ব্যবস্থাপনায়ও চীন ইতিবাচক অগ্রগতি সাধন করেছে, যা দেশটির অভ্যন্তরের বিভিন্ন শহরের যাতায়াত ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। বেইজিং, সাংহাই, গুয়াংজু ও চেংদুর মতো শহরগুলোতে নতুন মেট্রো স্টেশন চালু হয়েছে, যা এ শহরের মানুষগুলোর যাতায়াতে স্বাচ্ছন্দ্য এনেছে, কমিয়েছে ঝামেলা। এছাড়া মানুষ এখন খুব সহজেই দর্শনীয় স্থান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কেন্দ্রে যেতে পারছে।
দারিদ্র্য হ্রাস
মনকে মুক্ত করুন, তথ্য থেকে সত্য খুঁজুন এবং ভবিষ্যতের মুখোমুখি হতে ঐক্যবদ্ধ হোন। ১৯৭৮ সালে চীনের সংস্কার ও উদারীকরণ নীতির শুরুর দিকে দেং শিয়াও পিংয়ের দেয়া যুগান্তকারী বক্তৃতার অংশ এটি। এ মূলমন্ত্রের ওপর ভিত্তি করেই তিনি চীনের কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে নিয়ে এসেছিলেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় সময়ের বিবর্তনে চীন আজকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়ছে। পাশাপাশি দারিদ্র্য দূরীকরণে চীন বেশকিছু কৌশলও গ্রহণ করেছিল।
প্রথমত, শুরু থেকেই দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে দেশটি তার সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা পায়, যার সূচনা হয়েছিল দেং শিয়াও পিংয়ের সময়ে। পরবর্তী সময়ে শি জিনপিংও তার দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণের এ ধারাকে সামনে এগিয়ে নিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, দারিদ্র্য দূরীকরণে চীন একটি বিশেষায়িত সংস্থা গঠন করেছিল। দ্য লিডিং গ্রুপ অন পোভার্টি রিডাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ও স্থানীয় পুওর এরিয়া ডেভেলপমেন্ট অফিসগুলো দারিদ্র্য দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। তারা দারিদ্র্য দূরীকরণে নীতি পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং স্থানীয় পর্যায়ে সেগুলো বাস্তবায়ন করে।
তৃতীয়ত, দারিদ্র্য দূরীকরণে চীন সুচিন্তিতভাবে অত্যধিক গরিব মানুষের প্রতি মনোনিবেশ করে। চীনের দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচির সূচনা হয় ‘সান শি’ কর্মসূচির মাধ্যমে। তবে ৯০-এর দশকে”৮-৭”পরিকল্পনার আওতায় দারিদ্র্য দূরীকরণের বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আসে। বিশ শতকে হারমোনিয়াস সোসাইটি এর সূচনা ও ২০১২ সালে শুরু হওয়া লাস্ট মাইল কর্মসূচি অত্যধিক গরিবদের উৎপাদনমুখী কার্যক্রমে জড়িত করার মাধ্যমে তাদের আয় বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
চতুর্থত, মানুষের উন্নয়নে চীন সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেছে। ১৯৭৯ সালে ভাষার ক্ষেত্রে পিনইন (চাইনিজ সিলেবল) চালুর ফলে সাক্ষরতার হার ইতিবাচকভাবে বৃদ্ধি পায়। সংস্কারের সময় থেকে আবশ্যিক শিক্ষার ধারাবাহিক বিস্তৃতি কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে সমতা নিশ্চিত করে।
প্রযুক্তিগত অগ্রগতি
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রে চীন অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধন করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চীনের এআই প্রজেক্ট ডিপসিকের কথা। চীনের মানুষের প্রতিটি ক্ষেত্রে এআই সম্পৃক্ত। মোট কথা বর্তমান সময়ে চীনে গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বৃহৎ কলকারখানার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে। অন্যদিকে ব্লক চেইন প্রযুক্তি চীনের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন করেছে। এর মাধ্যমে চীনের মানুষ খুব সহজেই অনলাইন পেমেন্ট, তহবিল ট্রান্সফার ও সংরক্ষণ করতে পারছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আলীপে ও উইচ্যাটের কথা। চীনের মানুষের অনলাইন কেনাকাটাকে সহজ করেছে বিভিন্ন অনলাইন শপিং প্লাটফর্ম, যেখানে ন্যায্যমূল্যে বিস্তৃত পরিসরের পণ্য ক্রয় করা যায়। পাশাপাশি এসব অনলাইন প্লাটফর্মের রয়েছে শক্তিশালী ডেলিভারি সিস্টেম, যার মাধ্যমে খুব দ্রুতই পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অনলাইন প্লাটফর্ম তাওবাও ও ফিনতুওতুওয়ের কথা।
পরিশেষে বলা যায়, শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যবস্থা, দক্ষ নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সংস্কারে কৌশলী নীতি, অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে উৎকর্ষ, দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং সময়োপযোগী প্রাযুক্তিক উন্নয়ন সাধন বর্তমান বিশ্বে চীনকে অন্যতম শক্তিশালী, সুসংহত ও সুসংগঠিত রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
জোবায়ের আহমেদ: শিক্ষার্থী, চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ প্রোগ্রাম, কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়



