বাউফল (পটুয়াখালী) | ২৮ মে ২০২৬
পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার দাস পরিবারে নেমে এসেছে এক অবর্ণনীয় অন্ধকার ও চরম মানবিক বিপর্যয়। উপজেলার চাঁদকাঠী গ্রামে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তিন ভাই—রিপন দাস, নিদু দাস এবং সাধন দাস। তাঁরা তিনজনই জন্মগতভাবে গুরুতর মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। জগতের কোনো আনন্দ-বেদনা কিংবা উৎসব-আয়োজন যাদের কখনোই স্পর্শ করতে পারেনি, আজ মায়ের মৃত্যুর পরও তারা নির্বাক, অনুভূতিহীন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অনেক আগেই এই তিন ভাইয়ের বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও প্রতিবন্ধী তিন সন্তানের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ও চালিকাশক্তি ছিলেন তাদের গর্ভধারিণী মা। কিন্তু গত কয়েকদিন আগে সেই মায়েরও আকস্মিক মৃত্যু হয়।
ভাগ্যের চরম নির্মম পরিহাস, মায়ের মরদেহ যখন ঘরে পড়ে ছিল, তখনও এই তিন ভাইয়ের মধ্যে কোনো অনুভূতি বা শোকের লেশমাত্র দেখা যায়নি। তারা বুঝতেও পারছে না যে, তাদের পরম আশ্রয় ও বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা—মা আর এই পৃথিবীতে নেই। মায়ের মৃত্যুর পর থেকে এই অভিভাবকহীন তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের দেখভাল বা মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার মতো কোনো অবলম্বন আর অবশিষ্ট নেই।
🌟 পাশে দাঁড়িয়েছে এক মানবিক যুবক
সমাজ যখন একপ্রকার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তখন এই অসহায় পরিবারটির পাশে দেবদূতের মতো এসে দাঁড়িয়েছেন ‘সম্রাট তালুকদার’ নামে স্থানীয় এক মানবিক যুবক। নিজের ব্যক্তিগত সময়, শ্রম ও আবেগ বিলিয়ে দিয়ে তিনি এই তিন ভাইয়ের পাশে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মুঠোফোনে (০১৭২৫-৫৭৯৯৯৪) যোগাযোগ করা হলে সম্রাট তালুকদার এই প্রতিনিধিকে জানান, তিনি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সহৃদয় কিছু মানুষের কাছ থেকে প্রাপ্ত কিছু আর্থিক অনুদান সংগ্রহ করেছেন। বৃষ্টির কারণে কিছুটা বিলম্ব হলেও আজ বিকেলেই তিনি এই অসহায় তিন ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে টাকাগুলো হস্তান্তর করবেন এবং পুরো বিষয়টি ভিডিওর মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমেও তুলে ধরবেন, যাতে দেশের মানুষ এই পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারে।
💬 “আমরা কোনো রাজনীতির ট্রাম্প কার্ড হতে চাই না” — ক্ষোভ সাধারণ নাগরিকদের
এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের সচেতন নাগরিক ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একাংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। দেশের সাধারণ সনাতনী নাগরিকদের পক্ষে সনজীত কুমার দে বলেন,
“বাংলাদেশে সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো মানুষ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বা নৃশংসতার শিকার হলে দেশে ‘হিন্দু প্রেমী’ মানুষের অভাব হয় না। অনেকেই কেঁদেকেটে সোশ্যাল মিডিয়া ভাসিয়ে দেন। অথচ আজ বাউফলের এই চরম অসহায়, অভিভাবকহীন প্রতিবন্ধী হিন্দু পরিবারটির পাশে কোনো বড় হিন্দু নেতা বা সংগঠনের দৃশ্যমান কোনো উপস্থিতি বা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা বাংলাদেশের সাধারণ সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। আমরা কোনো রাজনীতির ‘ট্রাম্প কার্ড’ হতে চাই না। বাংলাদেশ মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজার বছরের মিলেমিশে বসবাসের এক অনন্য সম্প্রীতির দেশ। ধর্ম যার যার, কিন্তু এই চরম মানবিক বিপর্যয়ে পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব আমাদের সবার।”
🏛️ স্থায়ী পুনর্বাসনে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ
মায়ের মৃত্যুর পর এই তিন ভাইয়ের আজীবনের ভরণপোষণ, নিয়মিত চিকিৎসা এবং নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রতিবেশীরা এই তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং বাউফল উপজেলা প্রশাসনের (ইউএনও) জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, মানবিক দিক বিবেচনা করে বাউফল উপজেলা প্রশাসন অবিলম্বে এই তিন ভাইয়ের জন্য স্থায়ী সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, নিয়মিত সুচিকিৎসা এবং রাষ্ট্রীয় স্থায়ী পুনর্বাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।



