পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল’ নিষেধাজ্ঞা ফেরার খবরের পরপরই বেনাপোল সীমান্তে উসকানিমূলক তৎপরতা; ব্যাংককে বাংলাদেশি রাজনীতিকদের সাথে গোপন বৈঠকের গুঞ্জন; হিজবুল্লাহর লিক হওয়া নথিতে মেন্দির আসল রূপ ফাঁস
ঢাকা | ২৭ মে ২০২৬
বাংলাদেশের পাসপোর্টে ‘Passport is valid for all the countries of the world except Israel’ (ইসরায়েল ব্যতীত বিশ্বের সকল দেশের জন্য কার্যকর) বাক্যটি পুনরায় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তের ঠিক দুইদিন পর দেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার বেনাপোল সীমান্তের ওপারে (ভারতীয় অংশে) নজিরবিহীন এক উসকানিমূলক ঘটনা ঘটেছে। ইসরায়েলের কট্টর বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও লিকুদ পার্টির নেতা মেন্দি এন সাফাদি (Mendi N. Safadi) এবং তার দীর্ঘদিনের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিতর্কিত সহযোগী শিপন কুমার বসুকে (Shipan Kumer Basu) দুই দেশের আন্তর্জাতিক সীমানার নো-ম্যানস ল্যান্ড ও ফ্ল্যাগ পোলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে ইসরায়েলের জাতীয় পতাকা দোলাতে দেখা গেছে।
কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পাসপোর্ট নীতিতে ইসরায়েল-বিরোধী অবস্থান পুনর্স্থাপনের সিদ্ধান্তের পরপরই এই ছবি প্রকাশ কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং ঢাকাকে একটি স্পষ্ট ভূ-রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বাংলাদেশের অন্তত দুজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের সাথে মেন্দি সাফাদির একটি রুদ্ধদ্বার গোপন বৈঠক হয়েছে বলেও আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সূত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বারবার তোলপাড় সৃষ্টি করা এই ‘মেন্দি এন সাফাদি’ আসলে কে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় তার মূল মিশন কী, তা নিয়ে একটি বিশেষ অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
🕒 কে এই মেন্দি এন সাফাদি? (Identity & Background)
সাধারণভাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মেন্দি সাফাদিকে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ (Mossad)-এর একজন মাঠপর্যায়ের লিয়াজোঁ বা স্বাধীন এজেন্ট হিসেবে সন্দেহ করা হলেও, দাপ্তরিকভাবে তিনি নিজেকে ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক লবিস্ট এবং ‘সাফাদি ফাউন্ডেশন ফর ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোমেসি’-এর প্রধান হিসেবে পরিচয় দেন।
- জাতিগত পরিচয়: তিনি জন্মসূত্রে বা জাতিগতভাবে কট্টর ইহুদি নন, বরং ইসরায়েলের একটি বিশেষ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী ‘দ্রুজ’ (Druze) সম্প্রদায়ের মানুষ। ইসরায়েলি রাজনীতিতে তিনি দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
- মুসলিম-বিদ্বেষী অবস্থান: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাফাদির চরম মুসলিম ও ফিলিস্তিন-বিদ্বেষী মনোভাব ফুটে উঠেছে। তিনি ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজেদের ভূমিতেই ‘দখলদার’ হিসেবে আখ্যা দেন এবং দাবি করেন যে, ধর্মীয় কিতাব অনুযায়ী সমগ্র ভূখণ্ডটি কেবলই ইহুদিদের প্রাপ্য।
📂 হিজবুল্লাহর সাইবার হামলা ও মেন্দির ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ ফাঁস
লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ (Hezbollah)-এর সাইবার উইং মেন্দির ব্যক্তিগত কম্পিউটার হ্যাক করার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার ছদ্মবেশী গুপ্তচরবৃত্তির ভয়ঙ্কর রূপটি প্রথম জনসমক্ষে আসে। হিজবুল্লাহর মুখপত্র ‘আল আখবার’ (Al Akhbar) এবং পরবর্তীতে ‘টাইমস অব ইসরায়েল’ (The Times of Israel)-এ প্রকাশিত মেন্দির নিজস্ব সাক্ষাৎকার থেকে যে চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো বেরিয়ে আসে:
- আইএস ও সিরীয় সন্ত্রাসীদের সাথে চুক্তি: চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারকে উৎখাত করতে সক্রিয় ‘ইসলামিক স্টেট’ (IS) এবং অপর দুটি কট্টরপন্থী ইসলামপন্থী সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে সরাসরি চুক্তি করেছিলেন মেন্দি সাফাদি।
- অস্ত্র পাচারের অভিযোগ: অভিযোগ রয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই দুর্ধর্ষ জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর কাছে গোপনে ইসরায়েলি অস্ত্র ও অর্থ পৌঁছে দেওয়ার অন্তরালে মূল ভূমিকা ছিল মেন্দির।
- চরদের সুরক্ষায় ব্যর্থতা: হ্যাকিংয়ের ফলে সিরিয়া ও লেবাননে মেন্দির আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করা অন্তত ২৩ জন স্থানীয় চরের তালিকা ফাঁস হয়ে যায়। তবে তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে মেন্দি কেবল ‘কারো কোনো ক্ষতি হবে না’ বলে দায়সারা বক্তব্য দিয়ে পার পেয়ে যান।
📍 বাংলাদেশ কানেকশন: আসলাম চৌধুরী থেকে ভিপি নুর ও শিপন বসু
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ এবং অস্থিরতা তৈরির চেষ্টার অভিযোগে মেন্দি সাফাদির নাম বিগত এক দশকে অন্তত তিনবার শীর্ষ আলোচনায় এসেছে:
- ২০১৬ (আসলাম চৌধুরী বিতর্ক): ভারতে বসে বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর সাথে মেন্দি সাফাদির একটি গোপন বৈঠকের ছবি ফাঁস হয়। এর জেরে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হলে তৎকালীন সরকারের নির্দেশে রাষ্ট্রদ্রোহী ও সরকারের পতনের ষড়যন্ত্রের মামলায় আসলাম চৌধুরীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
- ২০২৩-২৪ (ভিপি নুর বিতর্ক): গণঅধিকার পরিষদের নেতা ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের সাথে দুবাইতে মেন্দি সাফাদির একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী কাদা-ছোড়াছুড়ি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু হয়।
- শিপন কুমার বসু ও বর্তমান মিশন: মেন্দির ডানহাত হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিপন কুমার বসু (প্রধান, হিন্দু স্ট্রাগল কমিটি) আন্তর্জাতিক লবিং ফোরামে দীর্ঘদিন ধরে লবিস্ট মেন্দির সহায়তা নিয়ে আসছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিবন্ধে শিপন বসু সরাসরি স্বীকার করেছেন যে, তিনি বাংলাদেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ও নীতি পরিবর্তনের জন্য ইসরায়েলি লবিস্ট মেন্দির মাধ্যমে ওয়াশিংটন ও দিল্লির নীতি-নির্ধারকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন।
📊 মেন্দির দক্ষিণ এশিয়া মিশন ও ভূ-রাজনৈতিক ছক
| মেন্দির মূল এজেন্ডা | 🎯 লক্ষ্য ও কৌশলগত উদ্দেশ্য (Strategic Obective) |
|---|---|
| বাংলাদেশ-ইসরায়েল কূটনৈতিক চাপ | ঢাকাকে যেকোনো উপায়ে ইসরায়েলের সাথে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করা বা লবিং করা। |
| পাসপোর্ট ইস্যুতে পাল্টা জবাব | পাসপোর্টে ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের খবরের ঠিক পরেই বেনাপোল সীমান্তে ভারতের পতাকা ও ইসরায়েলের পতাকা পাশাপাশি উঁচিয়ে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি। |
| ব্যাংককে গোপন লবিং | থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বাংলাদেশি দুই রাজনীতিবিদের সাথে মেন্দির সাম্প্রতিক বৈঠক ইঙ্গিত করে যে, বাংলাদেশের আসন্ন নীতি নির্ধারণী মহলে নিজেদের অনুকূলে লবিস্ট নিয়োগের চেষ্টা চলছে। |
⚠ বিশেষজ্ঞদের চোখ: এটি কি বাংলাদেশের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি?
নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, একজন আন্তর্জাতিক লবিস্ট ও মোসাদ-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত মেন্দি সাফাদির বারবার বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সাথে যোগাযোগকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সাথে ইসরায়েলের বর্তমান অত্যন্ত সুদৃঢ় কৌশলগত সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে মেন্দি সাফাদি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু কার্ড ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মহলে ঢাকার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছেন। ব্যাংককে ঠিক কোন দুই রাজনীতিবিদের সাথে মেন্দির বৈঠক হয়েছে, তা উদ্ঘাটন করা এখন দেশের কাউন্টার-টেররিজম ও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
📌 তথ্যসূত্র:
- টাইমস অব ইসরায়েল (The Times of Israel) বিশেষ সাক্ষাৎকার ও হ্যাকিং রিপোর্ট আর্কাইভস
- আল আখবার (Al Akhbar, Lebanon) লেবানন সাইবার ইন্টেলিজেন্স লিক ফাইলস
- ফরেন পলিসি অ্যাসোসিয়েশন (FPA) ইন্টারন্যাশনাল লবিং ডায়েরি (শিপন কুমার বসুর বক্তব্য)
- বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন ও বর্ডার সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স ফিল্ড রিপোর্ট (মে ২০২৬)
- থাইল্যান্ড কাউন্টার-টেররিজম ব্যুরো (ব্যাংকক) ডিপ্লোম্যাটিক মুভমেন্ট ট্র্যাকার ডাটা



