২০ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় অভিযুক্তের বদলে আদালতে হাজির হন ফুফাতো বোন; তদন্তে উঠে এসেছে সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্রের তথ্য
ঢাকা | ২১ মে ২০২৬ — রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানায় দায়ের হওয়া প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের এক আলোচিত মামলায় অভিযুক্ত শারমিন আক্তার একা সেজে আদালতে আত্মসমর্পণ করা নারী আসলে তার ফুফাতো বোন ভাবনা আক্তার— এমন তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত ভাবনাকে মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, একার ফুফু লাইলী আক্তার মুন্নি পরিকল্পিতভাবে ভাবনাকে আদালতে নিয়ে আসেন এবং তাকে একার পরিচয়ে আত্মসমর্পণ করতে বলেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার এসআই মাহবুবুল আলম বৃহস্পতিবার আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করেন।
ঘটনাটি সামনে আসে গত ১৪ মে, যখন বাদীপক্ষের আইনজীবী আদালতকে জানান, কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নারী প্রকৃত আসামি একা নন। এরপর আদালত তিন দিনের মধ্যে পরিচয় যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই নারীর রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ওই নারী নিজের পরিচয় ভাবনা আক্তার বলে স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, ভাবনা একজন ডিভোর্সি এবং ওয়ারীর করাতিটোলায় তার মা ও পাঁচ বছরের সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন। তিনি মামলার তিন নম্বর আসামি একার ফুফাতো বোন।
পুলিশ বলছে, মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সোহেল ফকিরের পরিকল্পনায় এবং ফুফু মুন্নির অনুরোধে ভাবনা আদালতে গিয়ে একার পরিচয়ে আত্মসমর্পণ করেন। তাকে বলা হয়েছিল, আদালতে হাজির হলে সহজেই জামিন হয়ে যাবে। তবে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিলে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম আদালতে বলেন, “ভাবনা মিথ্যা পরিচয় দিয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে কেন এসেছে— সে বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।” তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে যে, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ ও সম্পত্তি আত্মসাৎ করে আসছে।
পুলিশের তথ্যমতে, আসামিপক্ষের আইনজীবীও প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। বিষয়টি জানার পর তিনি মামলা থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের আবেদন করেন।
পরবর্তীতে ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন ভাবনাকে মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
প্রতারণার অভিযোগে ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা
মামলাটি দায়ের করেন ব্যবসায়ী আজিজুল আলম। তার অভিযোগ, “প্রাচীন পিলার” ব্যবসার নামে এবং তথাকথিত ‘কুফরি-কালাম’, ‘শয়তানের নিশ্বাস’ ও ‘জিনের মা’–এর ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে প্রায় ২০ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং উত্তরখান এলাকায় ২৭.১৫ কাঠা জমি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কয়েকজন ব্যক্তি বিদেশে প্রাচীন পিলার বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে নানা ধর্মীয় ও অলৌকিক কৌশলের মাধ্যমে তাকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করা হয় বলে অভিযোগ করেন বাদী।
পুলিশ ইতোমধ্যে এই মামলায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে শাখাওয়াত হোসেন শিমুল ও নাজমুল হাসান জামিনে রয়েছেন।
📌 মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- মামলার ধরন: প্রতারণা ও সম্পদ আত্মসাৎ
- অভিযোগের পরিমাণ: প্রায় ২০ কোটি ৫ লাখ টাকা
- অতিরিক্ত অভিযোগ: ২৭.১৫ কাঠা জমি লিখে নেওয়া
- মূল অভিযুক্ত: শারমিন আক্তার একাসহ ২৪ জন
- ঘটনার মোড়: অভিযুক্তের বদলে ফুফাতো বোন আদালতে আত্মসমর্পণ
- তদন্তকারী সংস্থা: উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশ
আইনজীবী ও তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, আদালতে অন্য কাউকে আসামি সাজিয়ে হাজির করার ঘটনা বিচার প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার গুরুতর চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মামলার তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে।
তথ্যসূত্র: উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশ



