ঢাকা | ২১ মে ২০২৬
রাজধানীর রামপুরার বনশ্রীতে অবস্থিত ‘আলোকিত কোরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজু মাদ্রাসা’র বাথরুম থেকে ১০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। শিশু আব্দুল্লাহর মৃত্যু নিয়ে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য ও পুলিশের প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা পাওয়া গেছে। সুরতহাল প্রতিবেদনে শিশুটির শরীরে বলাৎকারের সুস্পষ্ট আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ, যা বিষয়টিকে নিছক আত্মহত্যা থেকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের দিকে মোড় দিয়েছে।
ঘটনার নেপথ্য ও সুরতহালের পর্যবেক্ষণ
নিহত আব্দুল্লাহ (১০) চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার প্রবাসী আবুল কালাম আজাদের ছেলে। সে ওই মাদ্রাসার হিফজ বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত সাড়ে ১১টার দিকে মাদ্রাসার বাথরুমে গামছা দিয়ে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়।
রামপুরা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা মনে হলেও সুরতহাল করার সময় শিশুটির পায়ুপথে অস্বাভাবিক ফাঁপা ও জখমের চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, মৃত্যুর আগে শিশুটি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে বুধবার সকালে মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ও অসংগতি
ঘটনার পর থেকে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রামপুরা থানা পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, শিশুটির বাবা বিদেশে অবস্থান করছেন এবং মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ প্রবাসে থাকা বাবার সাথে ফোনে কথা বলেছে। তবে কেন এবং কীভাবে একটি মাদ্রাসার ভেতরে একজন শিক্ষার্থী এমন ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হলো, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। শিশুটির অভিভাবক বা নিকটাত্মীয়দের অভিযোগ, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তথ্য গোপন করার চেষ্টা করছে।
আইনি জটিলতা ও তদন্তের ভবিষ্যৎ
পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনটিই হবে এই মামলার মূল ভিত্তি। তিনি বলেন, “যদি রিপোর্টে বলাৎকার বা যৌন নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে এটি কেবল আত্মহত্যার মামলা থাকবে না, বরং এটি একটি হত্যাকাণ্ড বা পৈশাচিক নির্যাতনের মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হবে। আমরা মাদ্রাসাটির ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি) ফুটেজ এবং অন্যান্য শিক্ষার্থীদের জবানবন্দি নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছি।”
সংশ্লিষ্ট মহলের উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে শিশুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। মিরপুরের পল্লবীতে এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের পর শিরচ্ছেদের ঘটনার রেশ না কাটতেই বনশ্রীতে এ ধরনের ঘটনা মাদ্রাসাগুলোর নিরাপত্তা ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শিশু অধিকার কর্মীরা বলছেন, আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এ ধরনের ট্র্যাজেডি বারবার ঘটছে।
বিশ্লেষণ ও দায়বদ্ধতা
অভিজ্ঞ ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের মৃত্যুতে সাধারণত বলাৎকারের বিষয়টি আড়াল করার জন্য অপরাধীরা আত্মহত্যার সাজা তৈরি করে থাকে। সুতরাং, তদন্তকারী সংস্থাকে মাদ্রাসার সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা জরুরি। শিশু সুরক্ষা আইন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের দায়ভার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বর্তমান অবস্থা
নিহত আব্দুল্লাহর মরদেহ বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রয়েছে। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলে এবং প্রতিবেদন পাওয়ার পর পুলিশ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেবে। রামপুরা থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
তথ্যসূত্র: রামপুরা থানা, সুরতহাল রিপোর্ট (২০ মে ২০২৬), ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ।



