২০টি জনপ্রিয় গান নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশের পরিকল্পনা; গীতিকারদের আপত্তি ও শ্রোতাদের সমালোচনার পর প্রকল্প স্থগিত
শোবিজ টুডে ডেস্ক
কিংবদন্তি রকশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় ২০টি গান নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। ‘উত্তরাধিকার’ নামের এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে আইয়ুব বাচ্চুর বেশ কিছু গানের মূল গীতিকার এবং শ্রোতাদের একাংশ আপত্তি জানানোর পর সংশ্লিষ্টরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রকল্পটি আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিন ১৬ আগস্ট ঘিরে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল। পরিকল্পনায় ছিল আটটি ব্যান্ড ও ১২ জন শিল্পীর অংশগ্রহণে তাঁর ২০টি জনপ্রিয় গান নতুনভাবে প্রকাশ করা।
কেন থামল প্রকল্প?
প্রকল্প শুরুর পর প্রকাশিত গানগুলোর নতুন সংগীতায়োজন ও পরিবেশনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে বাচ্চুর দীর্ঘদিনের শ্রোতাদের একটি অংশ মূল গানগুলোর স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—গানগুলোর মূল গীতিকারদের আপত্তি।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাপ্পী খান, লতিফুল ইসলাম শিবলী ও নিয়াজ আহমেদ অংশুসহ কয়েকজন গীতিকার প্রকল্পটির বিষয়ে সমালোচনা করেন। পরে আরও কয়েকজন গীতিকার যৌথ বিবৃতিতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
চারটি গান প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত
প্রকল্পটি স্থগিতের পাশাপাশি ইতোমধ্যে প্রকাশিত সাতটি গানের মধ্য থেকে তিনটি গান ছাড়া বাকি চারটি ইউটিউব, স্পটিফাইসহ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাকি ১৩টি গানও আপাতত প্রকাশ করা হবে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব গান আপাতত রাখা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাপ্পা মজুমদার, সোনার বাংলা সার্কাস ও পলাশের পরিবেশিত তিনটি গান।
শ্রদ্ধাঞ্জলি থেকে অধিকার—বিতর্কের কেন্দ্রে কোন প্রশ্ন?
আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর তাঁর গান নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো শিল্পীর সৃষ্টিকে নতুনভাবে পরিবেশনের ক্ষেত্রে মূল গীতিকার, সুরকার, কপিরাইটধারী এবং শিল্পীর উত্তরাধিকারীদের অধিকার ও সম্মতির প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রকল্পের ঘটনাটি সেই জায়গাটিই সামনে এনেছে। একজন কিংবদন্তি শিল্পীর গানকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে গিয়ে যদি মূল স্রষ্টাদের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে শ্রদ্ধার উদ্যোগও বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
এ কারণে ‘উত্তরাধিকার’ প্রকল্পের স্থগিত হওয়া বাংলাদেশের সংগীতশিল্পে কপিরাইট, গান পুনঃনির্মাণ এবং উত্তরাধিকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও পরিষ্কার নীতির প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।
আইয়ুব বাচ্চুর গান কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
আইয়ুব বাচ্চুর গান শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জনপ্রিয় সংগীত নয়। বাংলাদেশের রকসংগীতের ইতিহাসে তাঁর কাজের প্রভাব বহু দশক ধরে বিস্তৃত।
‘সেই তুমি’, ‘রুপালি গিটার’, ‘নীল বেদনা’, ‘মাধবী’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’সহ তাঁর অসংখ্য গান একাধিক প্রজন্মের শ্রোতার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে। তাই তাঁর গান নতুনভাবে পরিবেশন করার ক্ষেত্রে শ্রোতাদের আবেগও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
একজন কিংবদন্তি শিল্পীর সৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে নতুন সংগীতায়োজন হতে পারে একটি কার্যকর পথ। কিন্তু সেই পুনর্নির্মাণ যেন মূল সৃষ্টির মর্যাদা, স্রষ্টার অধিকার ও শ্রোতার আবেগ—তিনটিকেই সম্মান করে, সেটিই এখানে বড় শিক্ষা।
প্রকল্প কি আবার ফিরবে?
বর্তমানে ‘উত্তরাধিকার’ প্রকল্পটি স্থগিত। ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট গীতিকার, অধিকারধারী ও শিল্পীদের সঙ্গে সমন্বয় করে এটি নতুনভাবে চালু হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
তবে এই প্রকল্পকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আইয়ুব বাচ্চুর গানকে ঘিরে শুধু একটি সংগীতপ্রকল্পের সমস্যা নয়; বাংলাদেশের কপিরাইট ও সৃজনশীল উত্তরাধিকারের বাস্তবতাকে সামনে আনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, দেশ রূপান্তর, এনটিভি ও প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট বিবৃতি।




