সাবেক সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলামের ফেসবুক পোস্টে রূপনগর অভিযানের নতুন ব্যাখ্যা, পরিবারের অভিযোগের মুখে পুরোনো মামলার পুনরায় আলোচনায় ফেরা
টুডে টিভি বিডি ইনভেস্টিগেশন ডেস্ক
বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও বিতর্কের বাইরে যেতে পারেনি। মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম তেমনই এক নাম। ২০১৬ সালের রূপনগর অভিযানে নিহত এই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে ঘিরে রাষ্ট্রের বয়ান, পরিবারের অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক মরণোত্তর পদোন্নতি—সব মিলিয়ে একটি পুরোনো ঘটনা নতুন করে জনআলোচনায় এসেছে।
এবার আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে পুলিশের সাবেক কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলামের একটি ফেসবুক পোস্ট। ওই পোস্টে তিনি রূপনগর অভিযানের রাষ্ট্রীয় বর্ণনার পক্ষে নিজের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন এবং সাম্প্রতিক পাল্টা বয়ানকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
মনিরুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রূপনগরের ঘটনায় মেজর জাহিদ সন্ত্রাসী তৎপরতায় জড়িত ছিলেন এবং পুলিশি অভিযানে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তবে জাহিদুল ইসলামের পরিবার বরাবরই দাবি করে আসছে, এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যা এবং পরবর্তী সময়ে ঘটনাটিকে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের বয়ানে উপস্থাপন করা হয়েছে।
রূপনগরের সেই দিনের রাষ্ট্রীয় বয়ান কী ছিল
মনিরুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, রূপনগর এলাকার একটি বাসায় জঙ্গি-সংশ্লিষ্ট একটি আস্তানার সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর দাবি, ওই তথ্যের ভিত্তিতে সিটিটিসির কর্মকর্তারা অনুসন্ধান শুরু করেন। সেখানে গিয়ে বাড়ির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। জানা যায়, ভাড়াটিয়ারা আগেই বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তবে তাদের মালামাল পরে নিতে আসার কথা ছিল।
মনিরুল ইসলামের পোস্টে আরও বলা হয়েছে, অভিযানের প্রস্তুতির সময় থানার কিছু কর্মকর্তা ও বাড়িওয়ালার মধ্যে যোগাযোগ হয়। পরে মালামাল নিতে আসার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তখন মেজর জাহিদ ছুরি নিয়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা করেন। এতে এক ইন্সপেক্টর গুরুতর আহত হন। এরপর পুলিশ গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই জাহিদ নিহত হন।
তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনাটি রাস্তায় ও আশপাশের ভবনের বারান্দা থেকে বহু মানুষ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। অর্থাৎ তাঁর বর্ণনায় এটি ছিল একটি প্রকাশ্য, সংঘর্ষপূর্ণ ও সহিংস অভিযান, যেখানে পুলিশ তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষামূলক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল।
মনিরুল ইসলামের ভাষ্য: কেন জাহিদ রাষ্ট্রের চোখে সন্দেহভাজন হন
মনিরুল ইসলামের পোস্টে জাহিদুল ইসলামকে ঘিরে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি উঠে আসে। তিনি লেখেন, কানাডায় প্রশিক্ষণের সময় জাহিদ উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। দেশে ফিরে তাঁর আচরণ, পোশাক ও জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসে। সেনাবাহিনীতে চাকরি করে ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়—এমন কথাও তিনি নিকটজনদের বলতেন বলে দাবি করেন মনিরুল।
তাঁর ভাষ্যে, জাহিদের সবচেয়ে বেশি আপত্তি ছিল ‘শিখা অনির্বাণ’-এ স্যালুট করা নিয়ে; সেটিকে তিনি ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করতেন না। পরে তিনি চাকরি ছেড়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং একপর্যায়ে পরিবারসহ একটি “মারকাজে” চলে যান—মনিরুল ইসলামের পোস্টে এমন দাবি করা হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, নারায়ণগঞ্জে তামিম চৌধুরী নিহত হওয়ার পরের দিনই জাহিদ পরিবার নিয়ে রূপনগরের বাসা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন এবং ওই বাসাটি জঙ্গি-সংশ্লিষ্টদের একটি ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
কেন তিনি পুরোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন সামনে আনলেন
মনিরুল ইসলামের পোস্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, রূপনগর অভিযানের পর তৎকালীন অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যমগুলো—বিশেষ করে প্রথম আলো—ঘটনাস্থলে গিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তিনি পাঠকদের সেই সময়কার প্রতিবেদনগুলো পড়ারও আহ্বান জানান।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, সে সময়কার পুলিশি তদন্ত, গোয়েন্দা তথ্য এবং বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মেজর জাহিদের জঙ্গি-সম্পৃক্ততার যে বর্ণনা উঠে এসেছিল, তা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। আর বর্তমানে যে নতুন বয়ান সামনে আনা হচ্ছে, সেটিকে তিনি “সৃজনশীল রচনা” বা বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিকল্প বর্ণনা হিসেবে দেখছেন।
মনিরুল ইসলামের মতে, সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যরা সাধারণত ছদ্মনাম ব্যবহার করে এবং সংগঠনের অভ্যন্তরে ভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত থাকে। তাঁর পোস্টে মেজর জাহিদকে এমনই একটি উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের প্রশিক্ষক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
পরিবারের পাল্টা দাবি এখনও বহাল
অন্যদিকে জাহিদুল ইসলামের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, তাঁকে জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করে হত্যা করা হয়েছিল। পরিবারের দাবি, রাষ্ট্রীয় বয়ান সঠিক নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছিল। পরে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের ওপরও দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের নিপীড়ন চালানো হয়েছে বলেও তারা অভিযোগ করে।
সম্প্রতি তাঁকে মরণোত্তর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত করার পর সেই পুরোনো বিতর্ক আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পরিবারপক্ষের দাবি, এই পদোন্নতি তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের নৈতিক স্বীকৃতি বহন করে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় অবস্থান বা মনিরুল ইসলামের মতো সাবেক দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য হলো, অতীতের তদন্তকে অস্বীকার করে নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মনিরুল ইসলামের পোস্টে যে বড় প্রশ্নটি উঠে এসেছে
মনিরুল ইসলামের বয়ান শুধু একটি অভিযানের বিবরণ নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে আনে—সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বয়ান এবং ভুক্তভোগী পরিবারের বয়ান যদি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হয়, তাহলে ইতিহাস কোন বয়ানকে ধারণ করবে?
তাঁর পোস্টে বারবার উঠে এসেছে, ২০১৬ সালের ঘটনায় পুলিশের ওপর হামলা হয়েছিল, পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায় এবং সেই অভিযানে জাহিদের মৃত্যু ঘটে। অন্যদিকে পরিবার বলছে, সেই পুরো ঘটনাই ছিল সাজানো এবং এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।
এই দুই অবস্থানের মধ্যে এখনো কোনো স্বাধীন, পূর্ণাঙ্গ এবং সর্বজনস্বীকৃত পুনর্মূল্যায়নের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি।
দাবি বনাম বাস্তবতা
মনিরুল ইসলামের দাবি:
রূপনগরের বাসাটি ছিল জঙ্গি-সংশ্লিষ্ট একটি আস্তানা এবং সেখানে অভিযানের সময় পুলিশের ওপর হামলা হয়েছিল।
পরিবারের দাবি:
জাহিদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল এবং ঘটনাটিকে পরবর্তীতে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের রূপ দেওয়া হয়।
মনিরুল ইসলামের দাবি:
কানাডায় প্রশিক্ষণের পর জাহিদের আচরণে বড় পরিবর্তন আসে এবং তিনি উগ্রপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
পরিবারের দাবি:
জাহিদকে ভুলভাবে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাঁর পরিবারকে দীর্ঘদিন হয়রানি ও নিপীড়নের মুখে রাখা হয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতা:
ঘটনাটি এখনো বিতর্কিত। রাষ্ট্রীয় বয়ান ও পারিবারিক বয়ান—উভয় পক্ষই গুরুতর দাবি উত্থাপন করেছে। এসব দাবির কিছু বিচারিক ও প্রশাসনিক নথিতে প্রতিফলিত হলেও, অনেক বিষয় নিয়ে জনপরিসরে বিতর্ক এখনো অব্যাহত রয়েছে।
শেষ কথা
মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামকে ঘিরে পুরোনো এই ঘটনা আবারও আলোচনায় এসেছে সাবেক সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলামের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো সাজানো মৃত্যু নয়; বরং পুলিশের ওপর হামলার পর সংঘটিত একটি বাস্তব সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, যেখানে জাহিদ একটি উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
অন্যদিকে পরিবারের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা বলছে, এটি ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং পরবর্তীতে পুরো ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় বয়ানে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত মনিরুল ইসলামের বক্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত ভাষ্য ও প্রকাশ্য ফেসবুক পোস্টের ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারপক্ষের দীর্ঘদিনের অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে পাঠক উভয় পক্ষের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পান। যেহেতু বিষয়টি এখনো জনপরিসরে বিতর্কিত এবং বিভিন্ন পক্ষের পরস্পরবিরোধী দাবি রয়েছে, তাই কোনো দাবিকেই এখানে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
রূপনগরের সেই দিনে আসলে কী ঘটেছিল—এই প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ উত্তরই হয়তো একদিন এই দীর্ঘ বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারে। ততদিন পর্যন্ত মেজর জাহিদকে ঘিরে ইতিহাস দুটি সমান্তরাল বয়ানেই থেকে যাবে—রাষ্ট্রের চোখে একটি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, আর পরিবারের চোখে একটি অসমাপ্ত ন্যায়বিচারের গল্প।




