Homeটুডে বাংলাকর্তব্যের ডাকে ঝাঁপ, তারপর চিরবিদায়: কাপ্তাই লেকে নৌসেনা কামরুজ্জামানের মর্মান্তিক মৃত্যু

কর্তব্যের ডাকে ঝাঁপ, তারপর চিরবিদায়: কাপ্তাই লেকে নৌসেনা কামরুজ্জামানের মর্মান্তিক মৃত্যু

অবসরের আর মাত্র ছয় মাস বাকি ছিল; নিয়ন্ত্রণ হারানো বোট উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ হারালেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অভিজ্ঞ সদস্য কামরুজ্জামান

রাঙ্গামাটি | TODAY TV BD | বিশেষ প্রতিবেদন

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অভিজ্ঞ সদস্য মাস্টার চিফ (সিডি) কামরুজ্জামান (৫৪) কাপ্তাই লেকে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। দীর্ঘ ৩৪ বছরের কর্মজীবন শেষে তাঁর অবসরে যাওয়ার কথা ছিল আর মাত্র ছয় মাস পর। কিন্তু কর্তব্য পালনের মধ্যেই ঘটে যায় জীবনের শেষ অধ্যায়। তাঁর মৃত্যুতে নৌবাহিনী, সহকর্মী, পরিবার এবং নিজ গ্রাম টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা

বাংলাদেশ নৌবাহিনী সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, গত ৩১ জুলাই শুক্রবার দুপুরে কাপ্তাই লেকে একটি সিঙ্গেল স্ক্রু বোটে আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। বাম দিকে ঘোরানোর সময় বোটটির স্টিয়ারিং হুইল পোর্টে লক হয়ে গেলে সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একই স্থানে দ্রুত ঘুরতে শুরু করে।

বোট পরিচালনাকারী লিডিং সিডি পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে পানিতে লাফ দিয়ে নিজের জীবন রক্ষা করেন এবং দ্রুত তীরে গিয়ে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, বোটের জ্বালানি শেষ হলে সেটি নিজে থেকেই থেমে যাবে এবং তখন নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হবে।

কর্তব্যবোধই হয়ে উঠল শেষ যাত্রার কারণ

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মাস্টার চিফ (সিডি) কামরুজ্জামান কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে আরেকটি বোটে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি নিয়ন্ত্রণহীন ঘূর্ণায়মান বোটে একাই ওঠার চেষ্টা করেন। তবে চেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি পানিতে পড়ে যান এবং বোটের এক পাশ ধরে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্রুত ঘুরতে থাকা বোটের সঙ্গে তিনিও বারবার ঘুরছিলেন। সহকর্মীরা উদ্ধার করতে চাইলেও বোটের অস্বাভাবিক ঘূর্ণনের কারণে নিরাপদে কাছে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

এক পর্যায়ে তিনি বোটের কিনারা ছেড়ে পানিতে তলিয়ে যান। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বোটের প্রোপেলার বা রাডারের আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পানির নিচে হারিয়ে যান।

রাতভর অনুসন্ধানের পর মিলল মরদেহ

পরবর্তীতে বোটটির জ্বালানি শেষ হলে সেটি থেমে যায় এবং নিরাপদে তীরে আনা হয়। এরপর বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ডুবুরি দল রাতভর অনুসন্ধান অভিযান পরিচালনা করে।

অবশেষে ১ আগস্ট শনিবার সকালে কাপ্তাই লেক থেকে কামরুজ্জামানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহ নৌবাহিনী হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার গয়হাটা ইউনিয়নের মোল্লাপাচুরিয়া গ্রামে পাঠানো হয়।

অবসরের স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কামরুজ্জামান ছিলেন প্রয়াত শাহজাহান মিয়ার বড় ছেলে এবং শাহ মাসুদের বড় ভাই। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দিয়ে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কর্মজীবনে দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা এবং সাহসিকতার জন্য সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন সম্মানিত।

পরিবারের সদস্যরা জানান, আর মাত্র ছয় মাস পর অবসর নিয়ে গ্রামের বাড়িতে পরিবারকে সময় দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হলো না।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্ন সামনে

এই দুর্ঘটনা নৌ-উদ্ধার অভিযানে নিরাপত্তা প্রটোকল এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে উদ্ধারকর্মীদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়ন্ত্রণহীন নৌযান উদ্ধারে আরও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, উন্নত উদ্ধার সরঞ্জাম, স্পষ্ট অপারেশনাল প্রটোকল এবং দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতে পারে।

তবে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং উদ্ধার অভিযানের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এক সৈনিকের শেষ প্রহর

সৈনিকের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর দায়িত্ববোধ। কামরুজ্জামানের শেষ মুহূর্তও ছিল সেই দায়িত্ব পালনের মধ্যেই। নিজের নিরাপত্তার আগে তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা। শেষ পর্যন্ত সেই কর্তব্যবোধই তাঁকে নিয়ে গেল জীবনের শেষ সীমান্তে।

তাঁর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্যও একজন অভিজ্ঞ সদস্যকে হারানোর বেদনা। সহকর্মী, স্বজন ও গ্রামের মানুষের কাছে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন একজন সাহসী, দায়িত্বনিষ্ঠ ও নিবেদিতপ্রাণ নৌসেনা হিসেবে।

তথ্যসূত্র: প্রেরিত লিখিত বিবরণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, বাংলাদেশ নৌবাহিনী সূত্র, উদ্ধারকার্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments