একা বেঁচে থাকা মানুষের গল্প, যা আসলে আমাদের সবার গল্প
ইউরোপের কোনো এক শহরে, একটি বৃদ্ধাশ্রমের জানালার পাশে বসে একজন ৮৯ বছরের বৃদ্ধা অপেক্ষা করছেন। হোয়াটসঅ্যাপে স্যাড রিঅ্যাক্ট পাঠাচ্ছেন। জিজ্ঞেস করছেন — ‘রাহু, তুমি ঠিক এক্সাক্টলি কবে আসবা?’
তাঁর নাম ইনগ্রিড।
বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চেয়ার ছিলেন তিনি। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে কাজ করেছেন। চীন থেকে ধর্মশালা, ইরিত্রিয়া থেকে আরও কত দেশ — পৃথিবীর গভীরে গভীরে পা রেখেছেন একা একা। দিনে পঞ্চাশটা সিগারেট খেতেন। ঠোঁটে সিগারেট না থাকলে পরিচিতরা নাকি তাঁকে চিনতেই পারত না। সিগারেট ছিল ইনগ্রিডের পরিচয়ের অংশ।
সেই মানুষটাই এখন অপেক্ষা করেন — তাঁর বাসার ভাড়াটে ছেলেটা দেখতে আসবে বলে।
জীবন এইভাবেই বাঁক নেয়। কাউকে জিজ্ঞেস করে নয়।
যে প্রেম মরে না
বাইশ বছর বয়সে, বিয়ের মাত্র দুই মাস আগে, একটি রোড অ্যাক্সিডেন্ট তাঁর জীবন থেকে সব নিয়ে গেল। প্রেমিক চলে গেলেন। ইনগ্রিড আর কখনো বিয়ে করলেন না।
কিন্তু দুজনে মিলে যে স্বপ্ন বুনেছিলেন — পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন — সেটা তিনি একা একাই পূরণ করলেন। চীনে গেলেন। দালাইলামার শহর ধর্মশালায় গেলেন। ইরিত্রিয়ায় গেলেন। আরও কত দেশ। প্রতিটি দেশে চার্চ খুঁজে বের করলেন। আর মোমবাতি জ্বালালেন — সেই মানুষটার স্মৃতিতে, যে আর নেই।
কে বলে প্রেম মরে যায়? প্রেম বরং রূপ বদলায়। কখনো মোমের আলো হয়, কখনো একা পথ চলার সাহস হয়।
বাহুর ব্যথা, আর একটি খুশির সংবাদ
বেশ কিছুদিন ধরে বাম হাতের বাহুর গোড়ায় তীব্র ব্যথা। একের পর এক ডাক্তার দেখালেন। প্রায় সবাই একই পরামর্শ দিলেন — বাহু রিপ্লেসমেন্টে যেতে হবে। কিন্তু ইনগ্রিডের মন সায় দিচ্ছিল না। শেষমেশ তুর্কি বংশোদ্ভূত এক ডাক্তার বললেন, রিপ্লেসমেন্ট নয়, অপারেশনেই সেরে যাবে।
সেদিন প্রায় নাচতে নাচতে রাহুর দরজায় টোকা দিলেন ইনগ্রিড। খুশিতে ডগমগ। জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কি মত রাহু?’
রাহু বললেন, ‘ব্যাপারটা খুবই ভালো হইছে। অল্পের ওপর দিয়ে গেল।’
হাসপাতালের সেই সন্ধ্যা
আড়াই মাস আগে একদিন সকালে ইনগ্রিড একা হাসপাতালে চলে গেলেন। রাহুর সেদিন সাতসকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার কথা। যেতে পারলেন না। সারাদিন মনের ভেতরে অপরাধবোধ নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন।
তিন দিন পর গেলেন। দুপুরে টেক্সট করে জানালেন, সন্ধ্যায় আসবেন, খাবার নিয়ে আসবেন, একটু দেরি করে ডিনার করতে। ইনগ্রিড সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই করলেন — ‘ওকে!’
রাহু রান্না করে গেলেন। তেমন কিছু না — ভাত, ডিম ভুনা, মুরগির মাংস। সাথে ফলমূল। আর ইনগ্রিডের প্রিয় আভোকাডো।
রাহুকে দেখে ইনগ্রিড ‘ওহ রাহু’ বলে গলা জড়িয়ে ধরলেন। বুড়ি যে কী আনন্দ করে খেলেন! খেতে খেতে তিন দিনে যা যা ঘটেছে — সব হইহই করে বলতে থাকলেন। রাহু মন দিয়ে শুনলেন। হু-হা করে সাড়া দিলেন।
ঘণ্টা দেড়েক পর ফেরার সময় ইনগ্রিড খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ফলের দাম কত হয়েছে? ব্যাংক ট্রান্সফার করে দেবেন, নাকি বাসা ভাড়া থেকে কাটবেন?
রাহু হোহা করে হাসলেন। বললেন, বাংলাদেশে হাসপাতালে কাউকে দেখতে যাওয়া মানে প্রচুর ফলমূল নিয়ে যাওয়া — এটা রেওয়াজ। শুধু তাই নয়, আশেপাশে কোনো আত্মীয়ের বাড়ি থাকলে রান্না করে বিশাল দলের জন্য খাবার নিয়ে যাওয়া সেই আত্মীয়ের জন্য প্রায় ফরজ। না গেলে সারাজীবন কথা শুনতে হয়। এমনকি রোগীকে বিছানা থেকে সরিয়ে সেই বিছানা দখল করে সবাই মিলে হইহই করে খাওয়াদাওয়া করে।
ইনগ্রিড হাসতে হাসতে বললেন, বাড়ির রান্না যদি হাসপাতালে এসে খেতে হয়, তাহলে হাসপাতালে গিয়ে কী লাভ?
সপ্তাহে দুবার, তিনটি স্টেশন দূরে
এরপর থেকে রাহু সপ্তাহে দুবার যাওয়ার চেষ্টা করতেন। বাসা থেকে ট্রামে তিনটি স্টেশন। বারো মিনিটের পথ। গেলে হাতে করে এটাসেটা নিয়ে যেতেন। ঘণ্টাখানেক থাকতেন, গল্প করতেন। আর ইনগ্রিড ফেরার সময় নিচ পর্যন্ত হেঁটে এগিয়ে দিতেন, সেখানে বসে আবার গল্প শুরু করতেন।
একবার রাহু একটু বেশি বইয়ের ফরমাইশ পেয়েছিলেন। ইনগ্রিড বইয়ের নাম পাঠিয়েছিলেন কিনে আনতে। রাহু সেগুলো কিনলেন, সাথে নিলেন ইনগ্রিডের বেডরুমের আলমারি থেকে জুতো, লেটার বক্সে জমে থাকা চিঠির স্তুপ, ম্যাগাজিন, পাঁচ-ছটা বই — পুরো একটা ব্যাগ। অথচ ইনগ্রিড নিজে হাসপাতালে যাওয়ার সময় প্রায় এক ব্যাগ বই নিয়ে গিয়েছিলেন, সেগুলো হাসপাতালেই ফেলে দিয়েছেন।
রাহুকে দেখে সেদিন ইনগ্রিড বলে উঠলেন — ‘মাই ডিয়ার ব্রাদার।’ গলা জড়িয়ে ধরলেন।
ট্রেন ছাড়ার আগে
একদিন ইনগ্রিড কোথাও যাবেন। ব্যাগটা বেশ বড়। রাহুকে জিজ্ঞেস করলেন স্টেশনে একটু এগিয়ে দিতে পারবেন কিনা।
‘কেন পারব না, এ আবার এমন কী?’
রাহু গেলেন। ট্রলি তুলে দিলেন। ইনগ্রিড ট্রেনে বসলেন। তারপর হঠাৎ বললেন — ‘ট্রেন ছাড়া পর্যন্ত একটু থাকবে? আমরা যখন ছোট ছিলাম, পড়াশোনার কাজে যখন কোনো দেশে যেতাম, আমার ভাই এভাবে ট্রেনে আগিয়ে দিতে আসত। মনে হলো, বহুদিন পর আমার ভাই এসেছে এগিয়ে দিতে।’
রাহু চুপচাপ উল্টো দিকে বসে থাকলেন। ট্রেন ছাড়া পর্যন্ত।
এই মুহূর্তটা ছবিতে তোলার ছিল না। শব্দে ধরার ছিল না। শুধু অনুভব করার।
সেই টেক্সট
একবার কাজের চাপে গোটা সপ্তাহ যাওয়া হলো না। ইনগ্রিড টেক্সট করলেন — ‘রাহু, তুমি ঠিক আছো?’ হাসপাতালে কী কী হচ্ছে সব লিখে পাঠালেন। লম্বা লম্বা টেক্সট।
রাহু বুঝলেন, ইনগ্রিড আসলে তাঁর খোঁজ নিচ্ছেন না — বরং নিজের খবর জানানোর কেউ নেই বলে তাঁকে জানাচ্ছেন।
এরপর এলো সেই বার্তাটা — ‘রাহু, তুমি কি অনেক ব্যস্ত? আমাকে একটু দেখতে আসবে?’
হাসপাতালের বিছানার সাথে প্রায় লেপ্টে থাকা ৮৯ বছরের এই মানুষটার কথা পড়ে রাহুর বুকের ভেতরে হাহাকার করে উঠল। বললেন, ‘আগামীকালই আসব।’
সেই প্রশ্নটি
হাসপাতালের একটি বিকেলে রাহু সাহস করে জিজ্ঞেস করলেন — ‘জীবনের এই পর্যায়ে এসে আপনি কি লোনলি ফিল করেন? মনে হয় না যে, জীবনটা অন্যরকম হলে খারাপ হতো না?’
ইনগ্রিড একটু ভাবলেন। বললেন — ‘হুম করি। মনে হয় কয়েকজন নাতি-নাতনি থাকলে বোধহয় খুব মন্দ হতো না।’
পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলেন। বললেন, ‘ইটস ওকে। আই হ্যাড আ গুড লাইফ।’
এই বাক্যটির ভেতরে কতটুকু একাকিত্ব লুকিয়ে আছে, তা হয়তো শুধু তিনিই জানেন।
বৃদ্ধাশ্রমে, তবুও এগিয়ে
এখন ইউরোপে সামার। রাহু গেছেন সোমালিয়া। তিনি না ফেরা পর্যন্ত ইনগ্রিড বাসায় ফিরতে চাইছেন না। একা থাকতে ভয় লাগছে। তাই উঠেছেন বৃদ্ধাশ্রমে।
সেখান থেকেও থামেননি। কান্ট্রিসাইডে কোনো এক গ্রুপের সাথে ইয়োগা ক্যাম্পে চলে গেছেন। রাহুকে রেগুলার ছবি পাঠান। টেক্সট করেন — ‘রাহু, মাই ব্রাদার, তুমি ঠিক এক্সাক্টলি কবে আসবা?’
রাহু বলেন, ‘আসব, এখনো দিন-তারিখ ঠিক হয়নি।’
ইনগ্রিড হোয়াটসঅ্যাপে স্যাড রিঅ্যাক্ট পাঠান।
যা আমাদের ভাবতে বলে
ইনগ্রিডের গল্প শুধু একজন বেলজিয়ান বৃদ্ধার গল্প নয়।
ভাবুন আমাদের নিজেদের কথা। আজ যে মা একা, নোংরা ফ্ল্যাটে মরে পড়ে আছেন — তাঁরও যৌবন ছিল, উল্লাসের দিন ছিল। সারাজীবন একা ছিলেন না তিনি। হাতের তালুর উল্টোপিঠের রেখায় যে আজব ত্রিকোণমিতি দেখা যায়, সেসব পেকেছে সন্তানদের গু-মুত মুছতে মুছতে। সারারাত জেগে জ্বর মাপতে মাপতে। ভাত রেঁধে, স্কুলে দিয়ে, স্বপ্ন বুনে।
বৃদ্ধ বয়সে খানিকটা যত্ন পাওয়ার অধিকার তাঁরও আছে।
আমাদের সমাজে বৃদ্ধদের জন্য সময় কমে আসছে। পরিবার ভাঙছে। শহর বড় হচ্ছে, মানুষ ব্যস্ত হচ্ছে। কিন্তু বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতার কোনো বিকল্প নেই — শুধু উপস্থিতি ছাড়া। শুধু একটু সময় ছাড়া।
আমাদের কাছের মানুষগুলো — মা, বাবা, দাদা, নানা, পাড়ার বৃদ্ধ — একদিন শুধু জিজ্ঞেস করবেন: ‘একটু আসবে?’
সেই ডাকটার জবাব দেওয়ার সময় কি আমাদের আছে?




