Homeনাগরিক দর্পণট্রাম্পের নীতি বনাম ইরানের প্রতিরোধ: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ভূরাজনীতির নতুন মোড়

ট্রাম্পের নীতি বনাম ইরানের প্রতিরোধ: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ভূরাজনীতির নতুন মোড়

ট্রাম্পের অসামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্য ও ইরানের প্রতিরোধের মুখে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য সংকটে; অর্থনৈতিক চাপে ওয়াশিংটন।

ঢাকা | ৩১ মে ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ইরান নীতি এবং তেহরানের পাল্টা সামরিক প্রতিরোধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়েছে। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য, কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির লড়াইকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে তীব্র কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন বর্তমানে ইরানে নতুন কোনো বড় হামলা চালানো বা নিজেদের শর্তে চুক্তি করার ক্ষেত্রে এক ধরনের কৌশলগত অচলাবস্থার মুখোমুখি হয়েছে, যা মার্কিন প্রশাসনের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।

ট্রাম্পের দাবি বনাম ইরানের অনমনীয় অবস্থান

সম্প্রতি এক বৈঠকের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “The uranium will be unearthed by the United States” (অ্যামেরিকা ইরানের ইউরেনিয়াম উত্তোলন করবে)। এই বিবৃতির মাধ্যমে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিতে চেয়েছিলেন যে ইরানের সাথে একটি পরমাণু চুক্তি আসন্ন এবং চুক্তির আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উত্তোলন করে তা ধ্বংস করে ফেলবে। তবে এই পোস্টের পরপরই ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানান, “No final agreement with the U.S. has been reached” (অ্যামেরিকার সাথে আমাদের কোনো ফাইনাল চুক্তি হয় নাই)। একই সাথে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করে নিজেদের অধিকার আদায়ের হুঁশিয়ারি দেন, যার ফলে ওয়াশিংটনের সাথে তেহরানের সরাসরি আলোচনার পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর প্রখ্যাত কলামিস্ট অ্যারন ব্ল্যাক আজ এক বিশ্লেষণে ট্রাম্পের এই নীতিকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর কলামের শিরোনাম ছিল—“Trump’s inconsistent rhetoric about getting Iran’s nuclear stockpile”। ব্ল্যাক প্রশ্ন তোলেন, গত জুনে (গত গ্রীষ্মে) যখন আমেরিকা ইরানে হামলা চালিয়েছিল, তখন ট্রাম্প দাবি করেছিলেন ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প সম্পূর্ণ ধ্বংস (obliterated) করা হয়েছে; তাহলে এখন আবার নতুন করে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধারের কথা কোথা থেকে আসছে? এই প্রসঙ্গে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের একাংশের মতে, নতুন চুক্তির কথা বলার আগে ট্রাম্পের উচিত গত গ্রীষ্মের যুদ্ধে মার্কিন ব্যর্থতা বা পরাজয় স্বীকার করা।

কুয়েত ঘাঁটিতে হামলা ও ড্রোন ধ্বংসের অর্থনৈতিক ধাক্কা

এদিকে সামরিক উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়ে মার্কিন টেলিভিশন ফক্স নিউজ এক ব্রেকিং নিউজে জানিয়েছে, দিনদুয়েক আগে ইরানের একটি শূন্য স্থানে মার্কিন হামলার জবাবে কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে মিসাইল হামলা চালিয়েছে তেহরান। মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেই মিসাইল ইন্টারসেপ্ট (প্রতিরোধ) করতে সক্ষম হলেও, ওপর থেকে পড়া ধ্বংসাবশেষ বা ডেব্রির (Debris) আঘাতে পাঁচজন মার্কিন সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন। এই ঘটনা নিয়ে মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞ কর্নেল ম্যাকগ্রেগর প্রশ্ন তুলেছেন যে, ইন্টারসেপ্ট করার পরও যদি সেনা আহত হয়, তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গল্প বলে লাভ নেই; এটি মূলত ইরানের উন্নত মিসাইল প্রযুক্তির কাছে মার্কিন প্রতিরক্ষার সীমাবদ্ধতাই ফুটিয়ে তোলে।

এরই মধ্যে প্রায় ৩২ থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলার (নূন্যতম ৭২০ কোটি টাকা) মূল্যমানের মার্কিন অহংকার হিসেবে পরিচিত MQ-9 Reaper ড্রোন অপারেশনের সময় ধ্বংস করেছে ইরান। শুরুতে মার্কিন প্রশাসন ক্ষয়ক্ষতি অস্বীকার করলেও আজ খোদ ফক্স নিউজ স্বীকার করেছে যে ড্রোনটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং এটি আর ব্যবহারযোগ্য নয়। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূরাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক মারান্ডি আজ স্পষ্ট করেছেন যে, ইরান তার আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিকে এতটাই উন্নত করেছে যে তারা যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন মোকাবিলায় এখন আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী।

সাম্রাজ্যবাদের সংকট ও শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধের কারণে মার্কিন সাধারণ নাগরিকেরা অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাপক অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন, যেখানে তেল-গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে ট্রাম্প অন্যতম অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। কর্নেল ম্যাকগ্রেগর পরামর্শ দিয়েছেন, ট্রাম্পের উচিত বিশ্ব অর্থনীতির দোহাই দিয়ে ‘মানবিক কারণে’ যুদ্ধ বন্ধ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরে আসা। তবে ইসরায়েল ও তাদের শক্তিশালী লবিস্টদের চাপের কারণে ট্রাম্পের পক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। শিকাগো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রবার্ট পেইপ মনে করেন, এই সংঘাতের মধ্য দিয়ে ইরান ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে একটি পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং আগামী এক বছরের মধ্যে চীনের পাশাপাশি ইরানও একটি বৈশ্বিক পরাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

এস্তোনিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডক্টর আমিনুল ইসলাম তাঁর এক ভূরাজনৈতিক কলামে উল্লেখ করেছেন, ইরানের এই অভাবনীয় সামরিক ও কৌশলগত সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো তাদের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি। এমনকি অনেক সামরিক বিশেষজ্ঞের মতে, ইরানের বর্তমান মিসাইল প্রযুক্তি রাশিয়ার চেয়েও উন্নত। ইউরোপীয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে ইরান এখন একটি গবেষণার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিপরীতে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা যখন অভ্যন্তরীণ কাদা-ছোড়াছুড়ি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের সস্তা তর্কে লিপ্ত, তখন ইরান দেখাল কীভাবে প্রকৃত শিক্ষা ও প্রযুক্তির উন্নয়ন একটি রাষ্ট্রকে বৈশ্বিক পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে টিকে থাকার শক্তি জোগায়।

🔎 এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে

  • চুক্তি নিয়ে ধোঁয়াশা: ট্রাম্প ইউরেনিয়াম উত্তোলনের মাধ্যমে চুক্তির দাবি করলেও ইরান তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
  • মার্কিন সেনা আহত: কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি মিসাইলের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে ৫ মার্কিন সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন।
  • ড্রোনের ক্ষয়ক্ষতি: অপারেশনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ব্যয়বহুল ও আধুনিক MQ-9 Reaper ড্রোন ধ্বংসের কথা মার্কিন গণমাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে।
  • অর্থনৈতিক প্রভাব: যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

❓ যা এখনো স্পষ্ট নয়

  • ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপ: মার্কিন ডিফেন্স সেক্রেটারি হেগসেথ ইরানে আবার হামলার পূর্ণ সক্ষমতা (“We have the full capability to strike Iran again”) দাবি করলেও ওয়াশিংটন নতুন করে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
  • লবিস্টদের চাপ: মার্কিন প্রশাসনকে যুদ্ধবিরতির দিকে যেতে ইসরায়েলি লবিস্টরা কতটা বাধা দেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

⏭ এরপর কী

  • কূটনৈতিক অচলাবস্থা: ইরান আমেরিকার সাথে সরাসরি আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানানোয় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়বে।
  • বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে উদয়: যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ হারিয়ে যাওয়ার এবং চীনের সমকক্ষ হিসেবে ইরানের উত্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।

📌 তথ্যসূত্র:

  • International Media: CNN (Aaron Black’s Column), Fox News Breaking Report, NBC News.
  • Official Statements: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, ইরানি পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি, মার্কিন ডিফেন্স সেক্রেটারি হেগসেথের প্রেস ব্রিফিং।
  • Expert & Academic Analysis: কর্নেল ম্যাকগ্রেগর (মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞ), অধ্যাপক রবার্ট পেইপ (শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়), অধ্যাপক মারান্ডি (তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়), ডক্টর আমিনুল ইসলাম (বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, এস্তোনিয়া)।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular