ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরাক ও ইরান যুদ্ধের তীব্র সমালোচনা মার্কিন প্রেসিডেন্টের; কোনো মিত্র ছাড়াই আমেরিকা এক ‘অসম্ভব যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েছে বলে স্বীকারোক্তি।
ঢাকা | ৩১ মে ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অতীত ও বর্তমান সামরিক হস্তক্ষেপগুলোর তীব্র সমালোচনা করে স্বীকার করেছেন যে, ইরাক ও ইরানের মতো দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রবেশ করা এক ‘চরম বোকামি’ ছিল। ৩১ মে ২০২৬ মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজকে (Fox News) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন, যা পরবর্তীতে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বিশ্বব্যাপী প্রকাশ করে। সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক পদক্ষেপগুলোর কারণে যুক্তরাষ্ট্র আজ কোনো আন্তর্জাতিক মিত্র বা সহযোগী দেশ ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী ও ‘অসম্ভব যুদ্ধে’ প্রবেশ করেছে, যা মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেও তীব্র প্রাতিষ্ঠানিক মতবিরোধের জন্ম দিয়েছে।
ইরাক ও ইরান নীতিকে ট্রাম্পের ‘চরম বোকামি’ আখ্যা
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সরাসরি মার্কিন সামরিক নীতি ও অতীত আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, “ইরাকে কী ঘটেছিল তা আপনারা দেখছেন। আমরা সেখানে অত্যন্ত খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করেছিলাম। আমরা যা করেছি তা ছিল চরম বোকামি। সত্যি বলতে, শুরুতেই আমাদের সেখানে যাওয়া উচিত হয়নি।”
এর পরপরই চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও ইরান প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প অকপটে স্বীকার করেন, “ইরানেও আমাদের থাকা উচিত ছিল না।” মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ার প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি। মার্কিন থ্রেডস (Threads) প্ল্যাটফর্ম ও পাঞ্চবোল নিউজ (Punchbowl News)-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প নিজেই হাতাশা ব্যক্ত করেছেন যে মার্কিন প্রশাসন কেবলই মৌখিক হুমকির ওপর ভিত্তি করে এমন এক যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা থেকে এখন আমেরিকার বের হয়ে আসা প্রায় অসম্ভব।
বি-২ বোমারু বিমান হামলা ও ইসরায়েলের অস্তিত্বের দাবি
নিজের বর্তমান অবস্থানের পক্ষে কিছুটা সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করে ট্রাম্প দাবি করেন, “ইরানের সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। আমরা যদি আজ থেকে প্রায় নয় মাস আগে (২০২৫ সালের গ্রীষ্মকালীন সংঘাতের সময়) তাদের ওপর বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান (B-2 Bomber) দিয়ে হামলা না চালাতাম, তবে এতক্ষণে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেলত এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো।” ট্রাম্পের দাবি, ওই সময়ে যদি বি-২ বোমারু বিমান দিয়ে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পকে লক্ষ্য করে প্রতিরোধমূলক হামলা না চালানো হতো, তবে আজ হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ত।
ইরানের সামরিক বাহিনীকে ‘অক্ষত’ রাখার অদ্ভুত যুক্তি
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের আরেকটি বক্তব্য আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের চমকে দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ চললেও যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছা করে ইরানের মূল সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তু করেনি। ট্রাম্পের ভাষায়, “তাদের সামরিক বাহিনীকে আমরা অনেকটা ছেড়ে দিয়েছি, কারণ আমরা মনে করি তাদের সামরিক বাহিনী কিছুটা মধ্যপন্থী (Moderate)। তবে অন্য কিছু মানুষ রয়েছে যারা মধ্যপন্থী নয়; আমরা মূলত তাদের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নিয়েছি এবং বিভিন্ন স্তরের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তাদের মূল বাহিনীকে আমরা কার্যত অক্ষত রেখেছি।”
এই কৌশলের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ট্রাম্প অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, যুদ্ধের সময় অতীতে এমন কিছু ভুল করা হয়েছে যেখানে পুরো দেশকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে একটি দেশ ৪০ বছরেও পুনর্গঠন করতে পারেনি। ইরানকে সেই বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতেই নাকি মার্কিন বাহিনী তাদের সামরিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করেনি!
📦 এক নজরে: ট্রাম্পের সাক্ষাৎকারের মূল বক্তব্য
- ইরাক ও ইরান যুদ্ধ: দুই দেশেই মার্কিন সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপকে “চরম বোকামি” এবং “অনাকাঙ্ক্ষিত” বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প।
- বি-২ বোমারু বিমান হামলা: ৯ মাস আগে ইরানে মার্কিন বি-২ বোমারু বিমানের হামলার সিদ্ধান্তকে ইসরায়েলকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় হিসেবে ডিফেন্ড করেছেন।
- সামরিক বাহিনীকে ছাড়: ইরানের নিয়মিত সামরিক বাহিনীকে ‘মধ্যপন্থী’ আখ্যা দিয়ে তাদের পুরোপুরি ধ্বংস না করার দাবি করেছেন ট্রাম্প।
🔍 ফ্যাক্ট চেক & ব্যাকস্টোরি
✅ যা নিশ্চিত:
- ৩১ মে ২০২৬ তারিখে ট্রাম্প ফক্স নিউজের সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে মার্কিন বাহিনীর ইরানে যাওয়া বা অবস্থান করা ভুল পদক্ষেপ ছিল।
- এই যুদ্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে, যার ফলে তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি ও মার্কিন অর্থনীতি চাপে পড়েছে।
⚠ যা দাবি করা হচ্ছে: - প্রকৃত হুমকির অভাব: পাঞ্চবোল নিউজের (Punchbowl News) প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজমের (NCTC) শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন যে সরাসরি ইরানে হামলার মতো কোনো আসন্ন বা চূড়ান্ত হুমকি (Imminent threat) তেহরানের কাছ থেকে ছিল না। ট্রাম্প জোর করে এই যুদ্ধ চাপিয়েছেন।
- প্রশাসনিক পদত্যাগ: এই মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের নীতিগত বিরোধিতা করে হোয়াইট হাউস ও মার্কিন কাউন্টার টেররিজম এজেন্সির বেশ কয়েকজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন।
- মিত্রহীনতা: ট্রাম্পের এই খামখেয়ালি যুদ্ধ নীতির কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটোর কোনো শক্তিশালী মিত্র এই যুদ্ধে ওয়াশিংটনের পাশে এসে দাঁড়ায়নি।
📌 সংক্ষেপে
- কী ঘটেছে: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকার করেছেন যে ইরান ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান চালানো উচিত হয়নি।
- কেন এই স্বীকারোক্তি: কোনো আন্তর্জাতিক মিত্র না থাকা, মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের গণপদত্যাগ এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি দিন দিন ‘অসম্ভব’ ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠার কারণে।
- কী জানা গেছে: ৯ মাস আগে বি-২ বোমারু বিমান দিয়ে হামলার কারণে ইরান পরমাণু বোমা বানাতে পারেনি বলে দাবি ট্রাম্পের। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এই যুদ্ধে আমেরিকার কোনো মিত্র রাষ্ট্র পাশে নেই।
⏭ এরপর কী
ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য নতিস্বীকার এবং মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ফাটল নিশ্চিত করে যে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও একক আধিপত্যের যুগ এক বড় ধাক্কার সম্মুখীন। ট্রাম্প এখন না পারছেন ইরানের সাথে নিজেদের শর্তে কোনো স্থায়ী পরমাণু সমঝোতায় পৌঁছাতে, না পারছেন নতুন করে পূর্ণশক্তির হামলা চালাতে। আগামী দিনগুলোতে হোয়াইট হাউস কীভাবে এই ‘মিত্রহীন অসম্ভব যুদ্ধ’ থেকে নিজেদের সম্মান বাঁচিয়ে সেনা প্রত্যাহার করে, সেটাই এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির মূল দেখার বিষয়।
📌 তথ্যসূত্র:
- International Media: Fox News (সরাসরি সাক্ষাৎকার), Al Jazeera (আন্তর্জাতিক সংবাদ), Punchbowl News (আমেরিকান ইন্টেলিজেন্স ও প্রশাসনিক ডেস্ক রিপোর্ট)।
- Historical Reference: Wikipedia (2026 Iran war / Iran–United States relations)।



