টিকার ‘রোল মডেল’ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ আজ হামের মহামারিতে ধুঁকছে; উটের পিঠের ওপর দোষ চাপানোর সংস্কৃতি আর অযোগ্যদের চেয়ার দখলের খেসারত দিচ্ছে নিষ্পাপ শিশুরা।
বিশেষ কলাম | ১৮ মে, ২০২৬
“এখন আর ডাক্তারের পেছনে রোগীকে ছুটতে হবে না, ডাক্তারই রোগীর পেছনে ছুটবে”—দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন এক গগনচুম্বী ও চটকদার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। কিন্তু বাস্তবতা আজ কতটা নির্মম ও নিষ্ঠুর, তা দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টি জেলাতেই প্রমাণিত। গত দুই মাসে দেশে সাড়ে চারশরও বেশি শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা অর্ধ লাখ ছাড়িয়েছে। অথচ অসুস্থ শিশুদের বাবা-মায়েরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটেও আইসিইউ পাচ্ছেন না, ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। কোনো ডাক্তারকে আজ রোগীর পেছনে ছুটতে দেখা যাচ্ছে না, বরং সন্তানকে কোলে নিয়ে দিশেহারা বাবা-মায়ের আহাজারিতে ভারী হচ্ছে হাসপাতালের বাতাস।
ডেইলি স্টার ভবনে ‘বাংলাদেশ চাইল্ড প্রোটেকশন ইনিশিয়েটিভ’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে হামে শিশুমৃত্যুর জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচার নিয়ে আলোচনা শুনছিলাম। সেমিনারে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর, মাসুদ কামালসহ দেশের বিশিষ্ট আলোচকদের কণ্ঠে যে ক্ষোভ ও হতাশা ফুটে উঠেছে, তা মূলত এই ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতারই প্রতিফলন।
টিকা সংকট ও ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানোর রাজনীতি
সেমিনারে অনেক আলোচকই স্পষ্ট করে বলেছেন, এই বিপুল সংখ্যক শিশু মৃত্যুর জন্য মূলত দায়ী বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। কারণ, সময়মতো জীবনরক্ষাকারী হামের টিকা আমদানি ও তা সঠিক উপায়ে শিশুদের দেওয়ার ক্ষেত্রে এই প্রশাসন চরম অদক্ষতা ও অথর্বতার পরিচয় দিয়েছে। এটিকে অনেকে সাধারণ মৃত্যু বলতে নারাজ, বরং একে ‘প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে দোষীদের বিচারের দাবি তুলেছেন।
অবশ্য আমাদের দেশে যেকোনো অন্যায় বা ব্যর্থতা ঢাকতে ‘ব্লেম গেম’ বা অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর এক অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু আছে। দেশে এখন যত অন্যায়, অবিচার বা মহামারি ঘটছে, সব কিছুর জন্য অতীতের অবসান ঘটা পূর্ববর্তী সরকারকে দায়ী করার একটি সহজ প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এতে সুবিধা হলো, বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্তদের আর কোনো দায় নিতে হয় না। কিন্তু হিসাবের অংক তা বলে না।
চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, একটি শিশুকে প্রথমবার হামের টিকা দিতে হয় ৯ মাস বয়সে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যে শিশুটি জন্ম নিয়েছে, তাকে টিকা দেওয়ার সময় ছিল সে বছরের সেপ্টেম্বরে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই দেশের শাসনভার অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই শিশুদের সুরক্ষার সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক দায়িত্ব বর্তায় ইউনূস সরকারের ওপর। কিন্তু নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে এখনও যারা সেই ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপাচ্ছেন, তারা মূলত শিশুদের এই মৃত্যুকে উপহাস করছেন।
জনসচেতনতার অভাব এবং অপসংস্কৃতির আগ্রাসন
শুধু হাম নয়—যক্ষ্মা, ধনুষ্টংকার, পোলিওসহ প্রাণঘাতী বিভিন্ন রোগ থেকে শিশুদের বাঁচানোর জন্য আগে সরকারিভাবে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রচারণা বা ক্যাম্পেইন চালানো হতো। লাল বৃত্তের ভেতরে একটা সুস্থ শিশুর ছবি দিয়ে “আপনার শিশুকে সময়মতো টিকা দিন” লেখা স্টিকার একসময় হাটে-মাঠে, বাস-ট্রেন, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত এমনকি রিকশা বা বেবি ট্যাক্সির পেছনেও সাঁটানো দেখা যেত। আজ সেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ গায়েব। এখন বাসের পেছনে কিংবা দেওয়ালে লেখা দেখা যায়—‘আপনার শিশুকে মাদ্রাসায় পাঠান’।
ভীতিকর বিষয় হলো, আধুনিক যুগে এসেও বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে ‘ইহুদিদের বানানো টিকা মুসলমানদের জন্য হারাম’ বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। সেই সব ক্ষতিকারক ওয়াজের ক্লিপ ও ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হচ্ছে, কিন্তু তা প্রতিরোধে বা সঠিক তথ্য প্রচারে তথ্য ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো মাথাব্যথা নেই। টিকা নিয়ে শুরু হওয়া এই নোংরা অপরাজনীতি এবং অপসংস্কৃতি যদি বন্ধ করা না যায়, তবে এ দেশে পোলিও, হুপিংকাশি কিংবা যক্ষ্মা আবারও মহামারি আকারে ফেরত আসলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।
টিকার ‘রোল মডেল’ থেকে ব্যর্থতার অতল গহ্বরে
অথচ এই বাংলাদেশই ছিল টিকাদানে বিশ্বের বুকে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। শিশুদের সমন্বিত টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) বিশেষ সাফল্য অর্জনের জন্য ২০১০ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে পুরস্কৃত করেছিল। এরপর ২০১৯ সালে টিকাদানে ঈর্ষণীয় ও বৈপ্লবিক সাফল্যের জন্য গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (GAVI) বাংলাদেশকে বিশেষ ‘ভ্যাকসিন হিরো’ স্বীকৃতিতে ভূষিত করে। বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশ তখন পরিচিতি পেয়েছিল ‘টিকার রোল মডেল’ হিসেবে।
কেবল নিয়মিত টিকাদান নয়, করোনা বা ডেঙ্গুর মতো বৈশ্বিক অতিমারি ও মহামারি মোকাবিলা করেছিলেন এ দেশেরই দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। তাহলে সেই একই দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও আজ আমরা কেন সামান্য হাম মোকাবিলায় এভাবে ব্যর্থ হলাম?
ব্যর্থ হলাম কারণ, এ দেশে ক্ষমতার পালাবদল হলেই যোগ্য-অযোগ্য বিবেচনা না করে শুধু রাজনৈতিক কারণে অভিজ্ঞ ও দক্ষ পেশাদারদের পদ থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়। আর সেই শূন্য চেয়ারগুলোতে এসে বসেন অযোগ্য এবং অনভিজ্ঞ লোকজন। এই প্রতিহিংসা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক সময়ে—যখন মাইলস্টোন স্কুলের মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় দগ্ধ শত শত শিশু হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, তখন দেশের সেরা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জন ডা. সামন্ত লাল সেনকে তাদের চিকিৎসা করতে দেওয়া হয়নি! অপরাধ? তিনি বিগত প্রশাসনের অংশ ছিলেন। চিকিৎসার মতো একটি পবিত্র পেশাকেও আমরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নোংরা চাদরে ঢেকে দিয়েছি, যার মাশুল দিচ্ছে ফুটফুটে শিশুরা।
মন্ত্রীর কাঠিন্য ও হিতাহিত জ্ঞান
সবচেয়ে বড় কৌতুক ও হতাশার বিষয় হলো স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য। কয়েক দিন আগে সংবাদে দেখলাম তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি ‘আরও খারাপ’ হলে সরকার হামের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল চালু করবে! সাড়ে চারশ শিশুর লাশের ওপর দাঁড়িয়েও একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী কীভাবে ‘আরও খারাপ’ পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করতে পারেন, তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। এই মন্ত্রীই কিছুদিন আগে বলেছিলেন, ছোটবেলায় তাঁর নিজেরও হাম হয়েছিল এবং হাম নাকি তেমন কোনো গুরুতর অসুখই না!
ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের নীতিনির্ধারকেরা ঠিক কী ধাতু দিয়ে গড়া? ওইসব ক্ষমতাশালী চেয়ারে বসলে কি মানুষের ন্যূনতম হিতাহিত জ্ঞান এবং মানবিক বোধ লোপ পায়? সাড়ে চারশ মায়ের কোল খালি হওয়ার পরও যদি এই রোগকে ‘গুরুতর কিছু না’ মনে হয়, তবে কবির সেই বিখ্যাত গানের লাইনটিই মনে করিয়ে দিতে হয়—
“কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে, বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে!”
বাংলাদেশকে এই ব্যর্থতা এবং জবাবদিহিতাহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে না পারলে, আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে।
(কলামটি জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জ.ই মামুন কর্তৃক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও গোলটেবিল বৈঠকের আলোকে লিখিত।)



