আশুলিয়া ও রাজধানীর আশপাশে কারখানায় উৎপাদন কমেছে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত; বিকল্প জ্বালানিতে বাড়ছে ব্যয়, রপ্তানি সময়সীমা নিয়ে উদ্বেগ
ঢাকা | ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস সংকট এখন শুধু উৎপাদনের সমস্যা নয়; এটি কর্মসংস্থান ও রপ্তানির ওপরও চাপ তৈরি করছে। রাজধানীর আশপাশের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় পোশাক, টেক্সটাইল, খাদ্য, সিরামিক, স্টিল ও ওষুধ কারখানাগুলো উৎপাদন কমিয়েছে। কোথাও উৎপাদন ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, আবার কোনো কোনো কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রাখার পরিস্থিতিতে পড়েছে।
আশুলিয়ায় কারখানা প্রায় অচল
The Business Standard-এর মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আশুলিয়ার কিছু গ্যাসনির্ভর কারখানায় উৎপাদন কার্যত থেমে গেছে।
AR Wet Processing Ltd-তে কয়েক সপ্তাহ ধরে উৎপাদন কমার পর একপর্যায়ে কারখানার কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্যাস সংকট শুরু হওয়ার পর উৎপাদন সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
বিকল্প জ্বালানিতে খরচ বাড়ছে
গ্যাস না থাকায় কারখানাগুলোকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
কেউ ডিজেল, কেউ কাঠ বা অন্য জ্বালানি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন খরচ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
সমস্যা হলো—রপ্তানিমুখী অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিদেশি ক্রেতাদের কাছে অতিরিক্ত খরচ পুরোপুরি চাপিয়ে দিতে পারে না।
ফলে কারখানার লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।
১০০টির বেশি কারখানা বন্ধ থাকার নজির
নরসিংদীর মতো শিল্প এলাকায় গ্যাসের তীব্র ঘাটতির সময় ১০০টির বেশি কারখানা কয়েকদিন বন্ধ থাকার তথ্যও এসেছে।
কিছু কারখানা উৎপাদন চালু রাখতে কাঠ ব্যবহার করছে। এতে প্রতিটি কারখানার দৈনিক অতিরিক্ত জ্বালানি খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
এভাবে দীর্ঘ সময় উৎপাদন চালানো হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ পড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় ভয়—কর্মসংস্থান
কারখানা দীর্ঘদিন কম উৎপাদন করলে প্রথমে কাজের সময় কমানো হতে পারে।
এরপর শিফট কমে, ওভারটাইম বন্ধ হয় এবং শেষ পর্যন্ত শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়।
শিল্প উদ্যোক্তারা এরই মধ্যে কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
যে খাতগুলো রপ্তানি ও বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, সেখানে উৎপাদন ঘাটতির প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতিতেও তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
বিদ্যুৎ সংকটও যুক্ত হচ্ছে
গ্যাস সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে শিল্পের সমস্যা আরও বাড়ে।
কারখানাগুলো তখন একদিকে গ্যাস না পাওয়ায় মেশিন চালাতে পারে না, অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকলেও উৎপাদন ব্যাহত হয়।
কিছু প্রতিষ্ঠান তাই দিনের কোন সময়ে বিদ্যুৎ থাকবে তার ওপর ভিত্তি করে কাজের সময়সূচি বদলাচ্ছে।
রপ্তানির সময়সীমা নিয়েও উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য চান।
একটি কারখানা যদি গ্যাসের কারণে নিয়মিত উৎপাদন করতে না পারে, তাহলে পোশাক বা অন্য পণ্যের চালান নির্ধারিত সময়ে পাঠানো কঠিন হতে পারে।
এর ফলে জরিমানা, ক্রেতার আস্থা কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যতে অর্ডার কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
সমস্যার পেছনে কী?
বাংলাদেশের গ্যাস উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে চাহিদার তুলনায় কম।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিকৃত LNG-এর ব্যয়, জ্বালানি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে শিল্প খাত চাপের মধ্যে রয়েছে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
📊 শিল্পখাতের বর্তমান চাপ
- আশুলিয়ার কিছু কারখানায় উৎপাদন কমেছে: ৭৫% পর্যন্ত
- নরসিংদীতে গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকা কারখানা: ১০০+
- বিকল্প জ্বালানি: ডিজেল, কাঠসহ অন্যান্য উৎস
- ঝুঁকিতে: উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান
শুধু শিল্প নয়, ভোক্তার ওপরও প্রভাব
কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব সবসময় কারখানার মধ্যেই আটকে থাকে না।
উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়তে পারে। আবার প্রতিষ্ঠান ক্ষতি সামলাতে না পারলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও কমতে পারে।
অর্থাৎ গ্যাস সংকট একটি utility সমস্যা হলেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক বড়।
🧭 সমাধানের মূল জায়গা
স্বল্পমেয়াদে শিল্পাঞ্চলে নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, LNG অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি বৈচিত্র্য এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
কারণ বর্তমান সংকট সাময়িকভাবে সামলানো গেলেও উৎপাদন পরিকল্পনার দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা ছাড়া বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্প টেকসইভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না।
তথ্যসূত্র: The Business Standard, The Daily Star, Petrobangla, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ




