ড. খলিলুর রহমানের এক বছরের দায়িত্ব শুরু; সংলাপ, সংস্কার ও বৈশ্বিক দক্ষিণের দাবিকে সামনে রাখার প্রতিশ্রুতি
নিউইয়র্ক | ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁর এক বছরের মেয়াদ শুরু হয়েছে নিউইয়র্কে। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বক্তব্যেই তিনি সংলাপ, জাতিসংঘ সংস্কার, উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয়কে আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বাংলাদেশের কূটনীতিতে নতুন দায়িত্ব
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব কোনো একটি দেশের জাতীয় স্বার্থ পরিচালনার পদ নয়।
সভাপতির প্রধান দায়িত্ব হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনা, আলোচনায় ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতার পথ তৈরি করা।
বাংলাদেশের জন্য এই দায়িত্ব তাই একই সঙ্গে মর্যাদার এবং বড় কূটনৈতিক পরীক্ষার।
রোহিঙ্গা সংকটকে কেন সামনে আনা হচ্ছে?
বাংলাদেশ বর্তমানে মিয়ানমার থেকে আসা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক মনোযোগ অনেক ক্ষেত্রে ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের দিকে চলে যাওয়ায় রোহিঙ্গা সংকটের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ কিছুটা কমেছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ এই সংকটকে আবারও বৈশ্বিক আলোচনায় শক্তভাবে তুলে ধরার সুযোগ পাবে।
তবে সভাপতি হিসেবে খলিলুর রহমানকে একই সঙ্গে মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে।
বিশ্বে এখন একাধিক সংকট
৮১তম অধিবেশন শুরু হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বে একসঙ্গে বহু সংকট চলছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, ইউক্রেনের সংঘাত, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, উন্নয়নশীল দেশের ঋণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা—এসব বিষয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে আলোচনাকে সচল রাখা সহজ হবে না।
‘সংলাপ’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্ব রাজনীতিতে বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়লেও আন্তর্জাতিক সংস্থার ভেতর আলোচনার দরজা খোলা রাখা জরুরি।
বাংলাদেশের নতুন সভাপতি এ কারণেই সংলাপ ও সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নিরাপত্তা পরিষদের তুলনায় অধিক বিস্তৃত প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ফলে অনেক বিষয়ে এটি রাজনৈতিক মতামত ও আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরির বড় মঞ্চ।
সংস্কারের প্রশ্নও আছে
জাতিসংঘের কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের দাবি রয়েছে।
বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিত্ব এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের অংশগ্রহণ নিয়ে Global South-এর দেশগুলো প্রশ্ন তুলেছে।
বাংলাদেশের সভাপতিত্বের সময়ে এ ধরনের সংস্কার আলোচনা নতুন গতি পাবে কি না, তা নজরে থাকবে।
জলবায়ু ও উন্নয়ন ইস্যুও গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন সহযোগিতা—এসব বিষয়ে সাধারণ পরিষদের আলোচনায় বাংলাদেশ নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও অবস্থান তুলে ধরতে পারবে।
তবে সভাপতির নিরপেক্ষতার কারণে বাংলাদেশের জাতীয় অবস্থান ও সভাপতির প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি হবে।
📊 দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- দায়িত্ব: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি
- ব্যক্তি: ড. খলিলুর রহমান
- দায়িত্বের মেয়াদ: ১ বছর
- কর্মস্থল: জাতিসংঘ সদর দপ্তর, নিউইয়র্ক
- আলোচনার বড় বিষয়: রোহিঙ্গা, যুদ্ধ, জলবায়ু, উন্নয়ন ও সংস্কার
বাংলাদেশের সামনে সুযোগ কোথায়?
এই দায়িত্বের সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো—বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতাকে বিশ্বমঞ্চে আরও দৃশ্যমান করা।
রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ঝুঁকি, অভিবাসন ও উন্নয়ন অর্থায়নের মতো বিষয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও জায়গা পেতে পারে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে, সভাপতির দায়িত্বকে কোনো পক্ষের হয়ে নয়, বরং নিরপেক্ষ মধ্যস্থতার ভূমিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
🧭 সামনে কী?
আগামী এক বছর জাতিসংঘে বাংলাদেশের সভাপতিত্ব কতটা কার্যকর হয়, তার মূল্যায়ন হবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর—সংলাপ এগিয়ে নেওয়া, বিভক্তির মধ্যে সমঝোতা তৈরি এবং ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থকে আলোচনায় দৃশ্যমান রাখা।
রোহিঙ্গা সংকটে যদি নতুন আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরি করা যায়, তাহলে এই দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি কূটনৈতিক মর্যাদা নয়, একটি বাস্তব অর্জনও হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র: United Nations, Bangladesh Ministry of Foreign Affairs, BSS, The Daily Star




