যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ট্যাংকার সংঘাতের পর নতুন ‘রেস্ট্রিক্টেড জোন’; ব্রেন্ট ৯৬ ডলারের ওপরে, সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় নজর বিশ্ববাজারে
তেহরান/দুবাই | ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবার হরমুজ প্রণালির নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণের নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরান জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরে একটি নতুন নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ঘোষণা করা হবে এবং একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে নতুন একটি নৌপথের মানচিত্র প্রকাশ করা হবে। এই ঘোষণা এসেছে এমন সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই তেলবাহী জাহাজে সামরিক হামলা চালিয়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
নতুন ‘রেস্ট্রিক্টেড জোন’ কেন?
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই জানিয়েছেন, নতুন নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। ইরান ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নতুন আন্তর্জাতিক নৌপথ চালুর পরিকল্পনাও জানিয়েছে।
তেহরানের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান বন্ধ করলে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা হবে। অর্থাৎ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখন সরাসরি যুদ্ধের কৌশলগত হিসাবের অংশ হয়ে উঠেছে।
ট্যাংকার হামলায় সংঘাতের নতুন মাত্রা
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি ইরানি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। এর আগে ইরানও মার্কিন জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
দুই দেশের সামরিক পদক্ষেপে এখন শুধু স্থল বা সামরিক ঘাঁটি নয়, সমুদ্রপথ ও বাণিজ্যিক জাহাজও সংঘাতের অংশ হয়ে উঠেছে।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ একটি বাণিজ্যিক নৌপথে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব যুদ্ধরত দুই দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে পড়ে।
হরমুজে জাহাজ চলাচল নেমেছে তলানিতে
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যুদ্ধের আগে যেখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক জাহাজ এই পথ ব্যবহার করত, এখন গড় চলাচল অনেক নিচে নেমে এসেছে।
জাহাজ মালিকদের সামনে এখন তিনটি ঝুঁকি—হামলার সম্ভাবনা, বাড়তি বিমা খরচ এবং দীর্ঘ বিকল্প নৌপথ।
এর ফলে একটি ট্যাংকারকে আগের তুলনায় বেশি সময় ও বেশি অর্থ ব্যয় করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হতে পারে।
তেলের দাম কোথায়?
বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম সোমবার প্রায় ৯৬.১৯ ডলার প্রতি ব্যারেলে ছিল। গত সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের WTI প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজে সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে তেলের দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে। গোল্ডম্যান স্যাকসসহ কিছু বিশ্লেষক সম্ভাব্য বড় সরবরাহ ধাক্কার ক্ষেত্রে তেলের দাম ১২০ ডলার পর্যন্ত ওঠার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন।
শুধু তেল নয়, গ্যাস ও পরিবহনও ঝুঁকিতে
হরমুজের গুরুত্ব শুধু অপরিশোধিত তেলের জন্য নয়। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ অন্যান্য জ্বালানি পরিবহনেও এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ।
নৌপথে অনিশ্চয়তা থাকলে শিপিং ও বিমা খরচ বেড়ে যায়। সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত আমদানি করা পণ্য ও জ্বালানির দামে যোগ হতে পারে।
OPEC+ এখন কী করছে?
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মধ্যে OPEC+ অক্টোবরের জন্য তাদের বর্তমান উৎপাদন নীতি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অর্থাৎ সরবরাহ ঝুঁকির মধ্যে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। হরমুজে সরবরাহ বাধা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে উৎপাদন নীতি নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হতে পারে।
বাংলাদেশের বাজারে এই সংকট কতটা পৌঁছাবে?
বাংলাদেশ তেল, LNG ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে।
এর প্রভাব পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও পণ্য পরিবহনের খরচে দেখা দিতে পারে। তবে বাংলাদেশের ওপর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে জ্বালানি দামের স্থায়িত্ব এবং হরমুজের নৌচলাচল কতদিন বিঘ্নিত থাকে তার ওপর।
📊 হরমুজ সংকটের গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
- ব্রেন্ট ক্রুড: $96.19/ব্যারেল
- গত সপ্তাহে ব্রেন্ট বৃদ্ধি: প্রায় ৮%
- গত সপ্তাহে WTI বৃদ্ধি: প্রায় ১০%
- মার্কিন হামলার লক্ষ্য: ৩ ইরানি তেলবাহী জাহাজ
- নতুন ইরানি প্রস্তাব: রেস্ট্রিক্টেড জোন ও নতুন নৌপথ
- সম্ভাব্য চরম বাজারঝুঁকি: $120/ব্যারেল পর্যন্ত তেল
🧭 সামনে কী?
হরমুজে ইরানের নতুন নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যদি নতুন নৌপথ আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের বিকল্প হিসেবে কাজ করে, তাহলে উত্তেজনা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সামরিক সংঘাত অব্যাহত থাকলে সমুদ্রপথ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
হরমুজ এখন তাই শুধু একটি জলপথ নয়—এটি বিশ্ব জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকির কেন্দ্র।
তথ্যসূত্র: Reuters, Associated Press, Al Jazeera, OPEC+




