২০তম গ্রেডে মূল বেতন ২০ হাজার, প্রথম গ্রেডে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা; প্রায় ৩৩ লাখ সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগী সুবিধা পাবেন
ঢাকা | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সরকার অনুমোদিত জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ একসঙ্গে কার্যকর না করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১৪২ শতাংশ বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন দ্বিগুণ হয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। বেতন কাঠামোটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও এর মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। ভাতাগুলো কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
মন্ত্রিসভার অনুমোদিত কাঠামোতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ বেতন কাঠামোর প্রয়োজন বিবেচনা করেই নতুন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় নিম্ন আয়ের কর্মীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের বেতন আগে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কেন একবারে পুরো বেতন দিচ্ছে না সরকার
নতুন বেতন স্কেল কার্যকর করতে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই বিশাল আর্থিক প্রভাবের কারণে সরকার পুরো বেতন কাঠামো একবারে বাস্তবায়নের বদলে কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে—এমন বিবেচনাও সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে।
নতুন স্কেলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো নিম্ন ও উচ্চ গ্রেডের বেতন ব্যবধান কিছুটা কমে আসা। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বর্তমানে ১:১.৯৪৫ থেকে কমে ১:১.৭৮ হবে। ফলে নিম্ন গ্রেডের কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকছে।
শুধু কর্মচারী নয়, পেনশনভোগীদের কাঠামোও বদলাচ্ছে
নতুন স্কেলে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীদের নেট পেনশনও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ৯ হাজার টাকা বা তার কম নেট পেনশনে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি, ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এর পাশাপাশি সব ২০টি গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের মোবাইল ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগে এ সুবিধা মূলত পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত সীমিত ছিল। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান থাকা সরকারি কর্মীদের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতি সন্তানের বিপরীতে মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতাও চালু হচ্ছে।
প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ সরাসরি সুবিধার আওতায়
সরকারের হিসাবে নতুন বেতন কাঠামোতে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং ৯ লাখের বেশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। সব মিলিয়ে উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ৩৩ লাখ।
তবে নতুন বেতন শুধু সরকারি কর্মীদের আয় বাড়ানোর বিষয় নয়। বিপুল সংখ্যক মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে পণ্য ও সেবায় চাহিদা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ মূল্যস্ফীতির ওপর কী প্রভাব ফেলে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বেসরকারি খাতেও পড়তে পারে চাপ
নতুন সরকারি বেতন কাঠামোর পর বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন ও সুবিধা নিয়েও প্রত্যাশা বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীরা সরকারি চাকরির নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের আয় তুলনা করতে শুরু করতে পারেন।
অর্থনীতিবিদেরা এর আগে সতর্ক করেছেন, বড় ধরনের সরকারি বেতন বৃদ্ধি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে মূল্যস্ফীতি ও শ্রমবাজারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন, রাজস্ব আয় এবং মূল্যস্ফীতির গতিপথের ওপর।
📊 নতুন বেতন স্কেলের মূল সংখ্যা
| সূচক | নতুন কাঠামো |
|---|---|
| সর্বনিম্ন মূল বেতন | ২০,০০০ টাকা |
| সর্বোচ্চ মূল বেতন | ১,৫৬,০০০ টাকা |
| সর্বনিম্ন গ্রেডে বৃদ্ধি | ১৪২% |
| সর্বোচ্চ গ্রেডে বৃদ্ধি | ১০০% |
| অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় | ১,০৫,৫৮০ কোটি টাকা |
| সম্ভাব্য উপকারভোগী | প্রায় ৩৩ লাখ |
| ভাতা কার্যকর | ১ জানুয়ারি ২০২৮ |
🧭 সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অর্থায়ন ও মূল্যস্ফীতি
সরকারের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—একদিকে প্রতিশ্রুত বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন, অন্যদিকে এর আর্থিক চাপ সামলানো। কর্মীদের আয় বাড়িয়ে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা গেলেও যদি বাজারে অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়, তাহলে বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল কমে যেতে পারে।
ফলে নতুন বেতন স্কেলের সাফল্য শুধু কত টাকা বাড়ল তা দিয়ে নয়, কর্মীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কতটা বাড়ল—তা দিয়ে বিচার করতে হবে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় বেতন কমিশন, The Business Standard, The Daily Star।




