মেধাবী এক তরুণের আকস্মিক অসুস্থতাকে ঘিরে পরিবারের উদ্বেগ; পরীক্ষার মানসিক চাপ ও শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান
ঢাকা | নাগরিক দর্পণ
একজন সন্তানের হাসিমুখ হঠাৎ যখন হাসপাতালের আইসিইউর কাচের ওপারে হারিয়ে যায়, তখন পৃথিবীর সব হিসাব যেন এক মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে পড়ে। পরীক্ষার ফল, ভালো ক্যারিয়ার, ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সবকিছুর আগে তখন একটাই প্রার্থনা থাকে: সন্তানটি যেন বেঁচে ফিরে আসে।
এমনই এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এক পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের ১৮ বছর বয়সী সন্তান মিনহাজুল ইসলাম রোজান বর্তমানে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, রোজান ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের নির্ঝর বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (BISC)-এর শিক্ষার্থী ছিলেন। অষ্টম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর তিনি ক্লাস ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সময় বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (BNCC)-এর ক্যাপ্টেন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে পরিবার জানিয়েছে।
পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, লেখাপড়ায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল। নিয়মিত জিম করতেন এবং নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলার প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল।
কিন্তু এখন সেই তরুণই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
একটি পরীক্ষার চাপ, নাকি তার চেয়েও গভীর কোনো শারীরিক সংকট?
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চমাধ্যমিকের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার শেষ পর্যায়ে রোজান প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের কয়েকটি পরীক্ষা প্রত্যাশামতো না হওয়ায় তাঁর মধ্যে ব্যর্থতার ভয় ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছিল।
পরিবার মনে করছে, এই মানসিক চাপ তাঁর শারীরিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি—মানসিক চাপের সঙ্গে গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু শুধু পরীক্ষার চাপ বা প্যানিক অ্যাটাক থেকেই রোজানের বর্তমান জটিল শারীরিক অবস্থা তৈরি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের যাচাই ছাড়া বলা যায় না। তাঁর অসুস্থতার প্রকৃত কারণ, জটিলতা ও চিকিৎসাগত মূল্যায়ন চিকিৎসকরাই নির্ধারণ করবেন।
পরিবার জানিয়েছে, চার দিন আগে ব্যবহারিক পরীক্ষা দেওয়ার সময় রোজান হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যান। এরপর তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে প্রথমে তাঁকে মিরপুর-১১-এর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় এবং চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
‘আগামী ৪৮ ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ’—পরিবারের উদ্বেগ
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকদের বোর্ডের মূল্যায়নে রোজানের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন এবং পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিবার আরও জানিয়েছে, তাঁর রক্তে শর্করার মাত্রা অত্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল, কিডনির কার্যকারিতায় গুরুতর সমস্যা দেখা দিয়েছে, রক্তচাপ খুব কমে গিয়েছিল, রক্তে সোডিয়াম ও হিমোগ্লোবিন কমে যায় এবং ফুসফুসেও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তবে এসব চিকিৎসাগত তথ্যের বিস্তারিত রিপোর্ট, পরিমাপ ও চিকিৎসকদের লিখিত ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনের কাছে নেই। তাই এগুলোকে পরিবারের দেওয়া তথ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রোজানকে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং চিকিৎসা চলছে।
আইসিইউর বাইরে যে ভালোবাসা থেমে থাকেনি
একজন তরুণের সংকট যে শুধু একটি পরিবারের সংকট হয়ে থাকে না, রোজানের ঘটনাই তার আরেকটি উদাহরণ।
পরিবার জানিয়েছে, তাঁর জন্য গত কয়েক দিন ধরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কোরআন খতম, মিলাদ, দোয়া মাহফিল ও সদকার আয়োজন করছেন অনেকে। হাসপাতালের বাইরে রাত জেগে অপেক্ষা করছেন স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতরা। এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য ছোটাছুটি করছেন অনেকে।
রোজান ছোটবেলা থেকেই অনেক নেতাকর্মীর পরিচিত ছিলেন বলে পরিবার জানিয়েছে। তাঁদের ভাষায়, সে শুধু একটি পরিবারের সন্তান নয়; অনেক মানুষের চোখের সামনে বড় হয়ে ওঠা একটি পরিচিত ও আদরের মুখ।
একজন পিতার কাছে এমন মুহূর্তে এই ভালোবাসার মূল্য হয়তো কোনো রাজনৈতিক পদ, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক মর্যাদার চেয়েও অনেক বেশি।
একজন বাবার সবচেয়ে কঠিন অপেক্ষা
সন্তান যখন আইসিইউতে, তখন একজন বাবা কী অনুভব করেন—তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁরা রোজানকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে একটি পরীক্ষা জীবনের সবকিছু নির্ধারণ করে না। কিন্তু ততক্ষণে শারীরিক পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে গেছে।
এই জায়গাটিই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
আমরা অনেক সময় সন্তানকে শেখাই—প্রথম হতে হবে, ভালো ফল করতে হবে, ব্যর্থ হওয়া যাবে না।
কিন্তু খুব কম সময় বলি—
“তুমি যত নম্বরই পাও, তুমি আমাদের কাছে মূল্যবান।”
একটি পরীক্ষার ফল খারাপ হতে পারে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া সম্ভব। একটি স্বপ্ন ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু জীবনের মূল্য কোনো মার্কশিট দিয়ে নির্ধারিত হয় না।
রোজানের গল্প কি শুধু একটি পরিবারের গল্প?
না।
দেশের হাজারো শিক্ষার্থী প্রতিদিন একই চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—ভালো ফলের চাপ, ক্যারিয়ারের চাপ, পরিবারকে খুশি রাখার চাপ, সহপাঠীদের সঙ্গে তুলনা, নিজের প্রতি অবাস্তব প্রত্যাশা এবং ব্যর্থতার ভয়।
বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী নিজেদের কাছ থেকে সবসময় নিখুঁত ফল আশা করে, তাদের মধ্যে অতিরিক্ত উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা, আতঙ্ক, মনোযোগের সমস্যা বা মানসিক ভেঙে পড়ার মতো বিষয় দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণকে অবহেলা না করে পরিবারের উচিত সন্তানের আচরণে পরিবর্তন হলে দ্রুত শিক্ষক, অভিভাবক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেশাজীবীর সাহায্য নেওয়া।
কোনো পরীক্ষার ফল সন্তানের জীবনের চেয়ে বড় নয়।
অভিভাবকদের জন্য কয়েকটি জরুরি কথা
সন্তান পরীক্ষার আগে অস্বাভাবিকভাবে চুপ হয়ে গেলে, অতিরিক্ত ভয় পেলে, ঘুম কমে গেলে, বারবার ব্যর্থতার কথা বললে বা নিজেকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করলে বিষয়টিকে “পড়াশোনার চাপ” বলে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
তাকে বকা না দিয়ে কথা বলতে হবে।
শুধু বলতে হবে না—“আরও ভালো করতে হবে।”
বরং বলতে হবে—
“তুমি চেষ্টা করেছ, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।”
“ফল যা-ই হোক, আমরা তোমার পাশে আছি।”
প্রয়োজনে দ্রুত পেশাদার সহায়তা নিতে হবে।
আর কেউ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলে, শ্বাসকষ্ট হলে, খিঁচুনি হলে, জ্ঞান ফিরে না এলে, অত্যন্ত কম রক্তচাপ বা গুরুতর অন্য কোনো শারীরিক লক্ষণ দেখা দিলে—এটি জরুরি চিকিৎসার বিষয়। এমন পরিস্থিতিতে ঘরে বসে কারণ অনুমান না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
একটি প্রার্থনা, একটি পরিবারের আকুতি
রোজানের পরিবার আজ কোনো রাজনৈতিক হিসাব করছে না। তারা অপেক্ষা করছে শুধু একটি খবরের জন্য—
“রোজানের অবস্থা এখন কিছুটা ভালো।”
একজন ১৮ বছরের তরুণ, যে পাঁচ বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়েছে, পড়াশোনায় এগিয়ে ছিল, BNCC-তে দায়িত্ব পালন করেছে, নিয়মিত শরীরচর্চা করেছে—সে আজ মেশিনের সহায়তায় জীবন ধরে রাখার লড়াই করছে।
এই দৃশ্য আমাদের থামিয়ে দেয়।
আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
জীবন বড় ভঙ্গুর।
সন্তানকে ভালো ফলের জন্য চাপ দেওয়া যায়, কিন্তু তার বিনিময়ে তার মানসিক শান্তি হারানো যায় না।
রোজানের জন্য এখন প্রয়োজন সর্বোত্তম চিকিৎসা, পরিবারের পাশে থাকা এবং চিকিৎসকদের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা।
আর প্রয়োজন প্রার্থনা।
রোজানের বাবা বলেছেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে তাঁর সন্তান দ্রুত সুস্থ হয়ে তাঁর বুকে ফিরে আসবে—এই আশাই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রার্থনা।
আমরাও সেই আশাতেই থাকি।
আল্লাহ মিনহাজুল ইসলাম রোজানকে দ্রুত সুস্থ করে তাঁর বাবা-মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিন। আমিন।
তথ্যসূত্র: ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্যসচিব সাজ্জাদুল মিরাজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য; পরিবারের দেওয়া তথ্য।
সম্পাদকীয় সতর্কীকরণ: রোজানের শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য পরিবারের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে। রোগ নির্ণয় বা অসুস্থতার কারণ সম্পর্কে কোনো চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত এই প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
নাগরিক দর্পণ | মানবিক ও জনসচেতনতামূলক প্রতিবেদন




