Homeনাগরিক দর্পণ'জিয়া ট্রি' না 'সুকর্ণ ট্রি'? আরাফাতের নিমগাছের ইতিহাসে কোন গল্পটি সত্য

‘জিয়া ট্রি’ না ‘সুকর্ণ ট্রি’? আরাফাতের নিমগাছের ইতিহাসে কোন গল্পটি সত্য

১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের সৌদি সফর বাস্তব; কিন্তু আরাফাতের নিমবনে তাঁর ভূমিকার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কোথায়? গবেষণা, পুরোনো সংবাদ, সৌদি-ইন্দোনেশীয় নথি ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্য মিলিয়ে যে ছবি পাওয়া যাচ্ছে

টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান

সৌদি আরবের আরাফাতের ময়দানে সারি সারি সবুজ গাছ। লাখো হাজির জন্য মরুর উত্তাপে ছায়া। বাংলাদেশি হজযাত্রীদের অনেকের কাছে এগুলো পরিচিত ‘জিয়া গাছ’ বা ‘জিয়া ট্রি’ নামে। বহু বছর ধরে বাংলাদেশের বিএনপিপন্থী সংবাদ, রাজনৈতিক বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলা হয়ে আসছে—এই নিমগাছের চারা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে সৌদি আরবে উপহার দিয়েছিলেন, পরে সৌদি সরকার সেগুলোকে ‘জিয়া ট্রি’ নামে পরিচিত করে।

অন্যদিকে আরেকটি বয়ানও প্রচলিত আছে—আরাফাতের নিমগাছের ইতিহাস জিয়াউর রহমানের নয়; বরং ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ হজ করতে গিয়ে আরাফাত সবুজ করার উদ্যোগ নেন, নিম বা মিম্বা গাছের চারা দেন, এবং পরে গাছগুলো ‘সুকর্ণ ট্রি’ বা ‘Syajarah Soekarno’ নামে পরিচিত হয়।

কোন গল্পটি সত্য? আমাদের অনুসন্ধানে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা কোনো এক পক্ষের সরল দাবিকে পুরোপুরি সমর্থন করে না।

প্রথম অসঙ্গতি: ১৯৭৭ সালে সৌদি বাদশাহ কে ছিলেন?

বাংলাদেশে প্রচারিত গল্পের সবচেয়ে পরিচিত সংস্করণে বলা হয়, ১৯৭৭ সালে বাদশাহ ফাহদের আমন্ত্রণে জিয়াউর রহমান সৌদি আরব যান। কিন্তু এখানে একটি সহজে যাচাইযোগ্য ভুল আছে—১৯৭৭ সালে সৌদি আরবের বাদশাহ ছিলেন খালিদ বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ, যিনি ১৯৭৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত সিংহাসনে ছিলেন। ফাহদ তখন ছিলেন যুবরাজ ও প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী; তিনি বাদশাহ হন ১৯৮২ সালে। সৌদি সরকারের Saudipedia ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ঐতিহাসিক নথি—দুটিই এই সময়রেখা নিশ্চিত করে।

তবে এর মানে এই নয় যে জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে সৌদি আরব যাননি। আরব নিউজের একটি পুরোনো প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ে প্রথম সরকারি যোগাযোগ ঘটে ১৯৭৭ সালের জুলাইয়ে, যখন জিয়াউর রহমান সৌদি আরব সফর করেন। সৌদি আরব বাংলাদেশকে ২৮ আগস্ট ১৯৭৫ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়।

সংক্ষেপে: জিয়ার ১৯৭৭ সালের সৌদি সফর ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য, কিন্তু সেই সময় বাদশাহ ফাহদ ছিলেন—এই দাবিটি ভুল।

জিয়া কি সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়েছিলেন?

এখানে জিয়ার ভূমিকা খাটো করার সুযোগ নেই। ১৯৭৫ সালে স্বীকৃতির পর দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত এগিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদারে পরিণত হয়। আরব নিউজের ২০০৪ সালের এক প্রতিবেদনেও ১৯৭৭ সালের জিয়ার সফরকে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ে প্রথম সরকারি যোগাযোগ বলা হয়েছে।

তবে সেখান থেকে আরাফাতের নিমগাছের পুরো কৃতিত্ব তাঁর—এমন সিদ্ধান্তে যেতে আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন।

শ্রমবাজারের গল্পও একটু জটিল

‘জিয়ার একটি উপহারের বিনিময়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রমবাজার খুলে গেল’—এই গল্পও জনপ্রিয়, কিন্তু তথ্য একটু ভিন্ন। বাংলাদেশি শ্রমিকরা ১৯৭৬ সাল থেকেই সৌদি আরবে যেতে শুরু করেন। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ-সৌদি শ্রমিক নিয়োগ চুক্তির সংবাদে BSS ও UNB জানিয়েছে, সৌদি আরব ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় বিদেশি শ্রমবাজার, যদিও তার আগে সাধারণ শ্রমিক নিয়োগ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ছিল না।

একটি গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭৬-১৯৮০ সময়েই প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি সৌদি আরবে কাজের জন্য যান, ১৯৮১-১৯৯০-এ সংখ্যা দ্রুত বাড়ে। অর্থাৎ জিয়ার সৌদি সম্পর্ক জোরদারের ভূমিকা সত্য, কিন্তু ‘একটি নিমগাছের উপহারের কারণেই’ শ্রমবাজার খুলে গেছে—এই দাবির প্রমাণিত ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

আরাফাতের নিমবনের বয়স আসলে কত?

২০১৪ সালে King Saud University-এর গবেষক M.A.U. Mridha ও N.A. Al-Suhaibani ‘Prospect of Neem Plantation at Arafat, Saudi Arabia’ শিরোনামে একটি একাডেমিক গবেষণা প্রকাশ করেন, যেখানে বলা হয়েছে আরাফাতের সমতলে প্রায় ৫০ হাজার নিমগাছের একটি বিশাল প্ল্যান্টেশন রয়েছে এবং সৌদি আরবে নিমগাছ ৪০ বছরেরও বেশি আগে থেকেই পরিচিত ও অভিযোজিত।

১৯৮৯ সালে Economic Botany জার্নালে প্রকাশিত Saleem Ahmed, Salem Bamofleh ও Ma’toug Munshi-এর ‘Cultivation of Neem in Saudi Arabia’ গবেষণাতেও একই তথ্য মেলে—সৌদি আরবে নিম “৪০ বছরেরও বেশি আগে introduced” হয়েছিল। ১৯৮৯ থেকে ৪০ বছর পেছালে সময়টি দাঁড়ায় আনুমানিক ১৯৪০-এর দশকের শেষ বা তারও আগে—যা জিয়ার ১৯৭৭ সালের সফরের অনেক আগের ঘটনা।

১৯৯২ সালে National Academies-এর Neem: A Tree for Solving Global Problems বইতেও একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি এবং একই প্ল্যান্টেশনের কথা বলা হয়েছে—প্রায় ২০ লাখ হাজির ছায়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত। উল্লেখযোগ্য, এই তিনটি বৈজ্ঞানিক-একাডেমিক সূত্রের কোনোটিতেই জিয়াউর রহমানের নাম পাওয়া যায় না।

তাহলে ‘জিয়া ট্রি’ নামটি এলো কোথা থেকে?

বাংলাদেশে ‘জিয়া ট্রি’ গল্পের প্রচলন মূলত রাজনৈতিক বক্তব্য, বিএনপি-সমর্থিত প্রকাশনা ও অনলাইন সংবাদে। ২০২২ সালে বিএনপির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দাবি করা হয়—১৯৭৭ সালে খালিদ বিন আবদুল আজিজের আমন্ত্রণে জিয়াউর রহমান সৌদি আরব যান, নিমগাছের চারা উপহার দেন, এবং সেখান থেকেই নাম হয় ‘জিয়া ট্রি’। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রতিদিন ও কালের কণ্ঠেও একই গল্পের পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে ১৯৮৩-৮৪ সালে সৌদি সরকার ব্যাপকভাবে নিমের চারা রোপণ করে।

কিন্তু অনুসন্ধানে এই দাবির সমসাময়িক প্রমাণ—১৯৭৭ সালের কোনো সৌদি সরকারি নথি, যৌথ ঘোষণাপত্র বা কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প নথি—পাওয়া যায়নি, যা জিয়ার উপহারকে আরাফাতের বৃহৎ প্ল্যান্টেশনের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৮৯ সালের মূল গবেষণাটিও ১৯৮৩-৮৪ সালকে প্রকল্পের সূচনা-তারিখ হিসেবে দেখায়নি; বরং বলেছে, নিম আগে থেকেই পরিচিত ছিল এবং আরাফাতে প্ল্যান্টেশন ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছিল। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের অনুপস্থিতি।

‘সুকর্ণ ট্রি’-র পেছনে কী আছে?

এখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি নথিপথ পাওয়া যায়। ইন্দোনেশিয়ার সরকারি হজবিষয়ক ওয়েবসাইট Penasihat Khusus Presiden Bidang Haji-তে লেখা হয়েছে, ১৯৫৫ সালে হজ করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ সৌদি বাদশাহ সৌদ বিন আবদুল আজিজকে আরাফাতের মরুভূমি এলাকায় গাছ লাগানোর প্রস্তাব দেন। গাছটিকে সেখানে ‘mimba’ বা ‘mindi’ বলা হয়েছে, যা পরবর্তীতে ‘Pohon Soekarno’ নামে পরিচিত হয়।

ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ANTARA ২০২২ সালে একই বয়ান প্রকাশ করেছে। The Jakarta Post ২০২০ সালে এবং Detik ২০২৬ সালের মার্চে একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি করেছে—সুকর্ণর নাম আরাফাতের গাছের সঙ্গে যুক্ত, যা তাঁর ১৯৫৫ সালের হজ সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনটি বয়ান, একটি বৈপরীত্য

বাংলাদেশে বলা হচ্ছে ‘জিয়া ট্রি’। ইন্দোনেশিয়ার সরকারি ও সংবাদ সূত্রে বলা হচ্ছে ‘Soekarno Tree’ বা ‘Syajarah Soekarno’। আর সৌদি/আরবি উদ্ভিদতাত্ত্বিক গবেষণায় গাছটি মূলত Neem বা Azadirachta indica হিসেবে চিহ্নিত। ‘জিয়া ট্রি’ নামটি সর্বজনস্বীকৃত বৈজ্ঞানিক বা সরকারি সৌদি নাম—এমন প্রমাণ নেই; এটি সম্ভবত বাংলাদেশি রাজনৈতিক-মিডিয়া বয়ানের একটি বিশেষ প্রচলন।

একটি অতিরিক্ত জটিলতাও আছে—রিয়াদ প্ল্যান্টসের সরকারি উদ্ভিদতালিকায় নিমের বৈজ্ঞানিক নাম Azadirachta indica, কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্সিয়াল হজ উপদেষ্টার ওয়েবসাইটে ‘Pohon Soekarno’-কে Melia azedarach বা mindi বলা হয়েছে—এই দুটি প্রজাতি আলাদা। তাই ‘জিয়া ট্রি’, ‘সুকর্ণ ট্রি’, ‘নিম’, ‘মিম্বা’, ‘মিন্দি’—সব শব্দকে একই উদ্ভিদ ধরে নেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ নয়।

জিয়া কি একেবারেই যুক্ত ছিলেন না?

এখানে সতর্ক হওয়া জরুরি। এই অনুসন্ধান বলছে না যে জিয়াউর রহমান কখনো নিমের চারা উপহার দেননি। তাঁর ১৯৭৭ সালের সফর নিশ্চিত, এবং বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বয়ানে তাঁর নিম-উপহারের কথা আছে।

কিন্তু উপহার দেওয়া এবং আরাফাতের ৫০ হাজার গাছের প্ল্যান্টেশনের মূল উদ্যোক্তা হওয়া—এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা দাবি। প্রথমটির পক্ষে সেকেন্ডারি সূত্র আছে; দ্বিতীয়টির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক বা একাডেমিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সুকর্ণের গল্পও কি শতভাগ প্রমাণিত?

এখানেও অতিরঞ্জন করা ঠিক হবে না। সুকর্ণের ১৯৫৫ সালের হজ সফর ও রাজা সৌদের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রমাণ আছে, এবং তাঁর বৃক্ষরোপণের গল্প বহু ইন্দোনেশীয় সরকারি ও সংবাদ সূত্রে পুনরাবৃত্ত হয়েছে। কিন্তু ৫০ হাজার গাছের প্ল্যান্টেশন ঠিক কোন বছরে, কোন সরকারি প্রকল্পে এবং তার কত শতাংশ সুকর্ণ-প্রদত্ত চারার বংশধারা থেকে এসেছে—এই নির্দিষ্ট প্রশ্নে কোনো একক সমসাময়িক সৌদি সরকারি নথি পাওয়া যায়নি। তাই সুকর্ণ-সংশ্লিষ্টতার পক্ষে দীর্ঘদিনের ইন্দোনেশীয় সূত্র-ধারা থাকলেও, প্ল্যান্টেশনের প্রতিটি ধাপ এখনো নথিভুক্তভাবে প্রমাণিত নয়।

রাজনীতির বাইরে একটি বৈজ্ঞানিক সত্য

আরাফাতের নিমবনের সবচেয়ে শক্তিশালী সত্য সম্ভবত এটাই—দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ুতে অভিযোজিত এই প্রজাতিকে সৌদি মরুভূমিতে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে এবং হজযাত্রীদের ছায়া দেওয়ার জন্য বিশাল প্ল্যান্টেশন গড়ে উঠেছে। ২০১৪ সালের King Saud University গবেষণা বলছে, নিম কঠিন ও শুষ্ক পরিবেশেও অভিযোজিত হতে পারে এবং আরাফাতে এর প্ল্যান্টেশন আরও বাড়ানো সম্ভব। রাজনৈতিক কৃতিত্বের দ্বন্দ্বের বাইরেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত প্রকল্প।

কেন তাহলে গাছের নিচে রাজনীতি? কারণ প্রতীক অত্যন্ত শক্তিশালী—একটি গাছ বাংলাদেশে বিএনপির জন্য জিয়ার কূটনৈতিক সাফল্যের প্রতীক, ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্ণর আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক কূটনীতির স্মারক, আর সৌদি আরবের জন্য হাজিদের ছায়ার একটি পরিবেশগত প্রকল্প। সমস্যা তখনই হয়, যখন একটি পক্ষের রাজনৈতিক স্মৃতি প্রতিষ্ঠা করতে অন্য পক্ষের ইতিহাস মুছে ফেলা হয়।

তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য

২৯ জুন ২০২৬ তারিখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরাফাতের গাছ সম্পর্কে বলেন, প্রায় ৫০ বছর আগে সেখানে গাছ ছিল না এবং সম্ভবত ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান সৌদি বাদশাহকে হাজিদের ছায়ার জন্য নিমগাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। লক্ষণীয়, তিনি নিজেই “সম্ভবত” শব্দটি ব্যবহার করে বিষয়টিকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে নয়, বরং একটি স্মৃতিচারণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন—পাশাপাশি ১৯৭৭ ও ১৯৭৮ সালের তারিখেও ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের যুক্তি—”১৯৮৩-৮৪ সালে প্রকল্প শুরু হয়েছে, তাই ১৯৭৭ সালের অবদান অসম্ভব”—এটিও অতিরিক্ত সরলীকরণ। কারণ ১৯৭৭ সালে কেউ চারা দিতে বা একটি উদ্যোগের পরামর্শ দিতে পারেন, আর বৃহৎ প্ল্যান্টেশন পরে গড়ে উঠতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে সত্য প্রমাণ করতেও নথিভিত্তিক প্রমাণ প্রয়োজন।

🔎 চূড়ান্ত অনুসন্ধানী রায়: দাবি বনাম প্রমাণ

দাবিঅনুসন্ধানের ফল
জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে সৌদি আরব সফর করেনপ্রমাণিত
১৯৭৭ সালে সৌদি বাদশাহ ছিলেন ফাহদভুল; বাদশাহ ছিলেন খালিদ
সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিক যাওয়া ১৯৭৬ থেকে শুরুপ্রমাণিত
জিয়া সৌদি-বাংলা সম্পর্ক জোরদারে ভূমিকা রাখেনপ্রমাণসামঞ্জস্যপূর্ণ
জিয়া নিমের চারা সৌদি আরবে উপহার দিয়েছিলেনবাংলাদেশি সেকেন্ডারি সূত্রে দাবি আছে; স্বাধীন প্রাথমিক নথি পাওয়া যায়নি
জিয়ার কারণেই আরাফাতের নিমগাছের নাম ‘জিয়া ট্রি’ হয়নির্ভরযোগ্য স্বাধীন প্রমাণ নেই
আরাফাতে প্রায় ৫০ হাজার নিমগাছের প্ল্যান্টেশন আছেএকাডেমিক গবেষণায় শক্তভাবে প্রমাণিত
সৌদি আরবে নিম ১৯৭৭-এর আগেই পরিচিত ছিল১৯৮৯ সালের গবেষণা অনুযায়ী হ্যাঁ, ৪০ বছরেরও বেশি আগে থেকে
সুকর্ণ ১৯৫৫ সালে আরাফাত সবুজ করার উদ্যোগ নেনইন্দোনেশীয় সরকারি ও সংবাদ সূত্রে শক্তভাবে নথিভুক্ত
‘Soekarno Tree’ নামটি প্রচলিতহ্যাঁ, ইন্দোনেশীয় ও আন্তর্জাতিক সূত্রে
পুরো ৫০ হাজার গাছই সুকর্ণের চারার বংশধরপ্রমাণিত নয়

শেষ কথা: ইতিহাসের কাছে কোন গল্পটি টিকে থাকে?

আরাফাতের নিমগাছের গল্পে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় গাছ নয়—স্মৃতির রাজনীতি। বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক ধারার দীর্ঘদিনের দাবি জিয়াউর রহমানকে ঘিরে, ইন্দোনেশিয়া ও আন্তর্জাতিক সূত্রে আরেকটি পুরোনো বয়ান সুকর্ণকে ঘিরে। আর তৃতীয় একটি স্তর—বিজ্ঞান, যা বলছে সৌদি আরবে নিমের উপস্থিতি জিয়ার ১৯৭৭ সফরের অনেক আগের, এবং আরাফাতের প্ল্যান্টেশন একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশগত প্রকল্প হিসেবে নথিভুক্ত।

তাই ‘জিয়া ট্রি’কে জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত আবিষ্কার ও আরাফাতের নিমবনের একক উৎস হিসেবে উপস্থাপন করার মতো প্রমাণ হাতে নেই। একই সঙ্গে জিয়ার ১৯৭৭ সালের সৌদি সফর, সম্পর্ক উন্নয়ন ও পরবর্তী শ্রম অভিবাসনের বিস্তার—এসব ঐতিহাসিক বাস্তবতা। আর সুকর্ণের ১৯৫৫ সালের উদ্যোগের গল্পের পেছনেও ইন্দোনেশীয় সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের ধারাবাহিক সূত্র রয়েছে।

সবচেয়ে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত তাই এটাই—আরাফাতের নিমগাছের প্রকল্প বাস্তব; জিয়াউর রহমানের সঙ্গে এর সম্পর্কের দাবি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন প্রচলিত হলেও তা প্রমাণ করার মতো সমসাময়িক, স্বাধীন সৌদি নথি পাওয়া যায়নি। বিপরীতে সুকর্ণ-সংক্রান্ত একটি পুরোনো ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত সূত্র-ধারা পাওয়া যায়—যদিও তারও প্রতিটি ধাপ সম্পূর্ণভাবে নথিভুক্ত নয়।

ইতিহাসের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় নীতিটি সম্ভবত এটাই—যেখানে প্রমাণ নেই, সেখানে রাজনৈতিক বিশ্বাস দিয়ে শূন্যস্থান পূরণ করা উচিত নয়। আরাফাতের গাছগুলো আজও আছে। কিন্তু সেই ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের মালিকানা দাবি করার আগে—কে প্রথম চারা দিয়েছিল, কোন সালে, কোন প্রকল্পে তা বড় হয়েছিল, আর কে নাম দিয়েছিল—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দলীয় বক্তব্য দিয়ে নয়, আর্কাইভ ও প্রাথমিক নথি দিয়েই দিতে হবে।

— টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments