প্রেম, ঈর্ষা আর পলায়নের চক্রে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ—কীভাবে মাহফুজ হক নামের এক তরুণ অভিযুক্ত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ন্যায়বিচারকে ফাঁকি দিয়েছিল
TODAY TV BD | বিশেষ অনুসন্ধান
ইন্ডিয়ানার এক শান্ত শহরে এক তরুণকে ছুরিকাঘাতে হত্যা। তারপর এমন এক পলায়ন, যা তাকে নিয়ে যায় কানাডা হয়ে বাংলাদেশে। নাম বদলায়, পরিচয় বদলায়, জীবন বদলায়। কিন্তু নিহত টড কেলির পরিবারের কাছে সময় যেন থেমে যায় সেদিনই।
দুই দশকেরও বেশি সময় পর ভারতের দিল্লি বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার, যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ, আদালতে দোষ স্বীকার এবং কারাদণ্ড—মাহফুজ হকের গল্প শুধু একটি প্রেমঘটিত হত্যাকাণ্ডের নয়; এটি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা, প্রত্যর্পণ আইন এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষার এক বাস্তব ইতিহাস।
নীরব এক রাত, রক্তাক্ত এক সকাল
১৯৮৯ সালের ৯ আগস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের ছোট্ট লেকপাড়ের শহর হ্যামিল্টন তখন গভীর ঘুমে।
নিজের বাড়িতে, নিজের বিছানায় ঘুমিয়ে ছিলেন ১৯ বছর বয়সী টড কেলি। বন্ধুদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য রাতেও বাড়ির দরজা খোলা রাখতেন তিনি।
সেই খোলা দরজা দিয়েই সেদিন ভেতরে ঢোকে মৃত্যু।
তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, টড কেলিকে পেছন থেকে চারবার এবং সামনের দিকে আরও তিনবার ছুরিকাঘাত করা হয়। পরদিন সকালে তাঁর প্রেমিকা ক্রিস্টিন মুটজফেল্ড এসে ঘরের মেঝেতে তাঁর রক্তাক্ত নিথর দেহ দেখতে পান।
ঘটনাটি দ্রুতই স্থানীয় সংবাদ ছাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে ওঠে।

প্রেম, ঈর্ষা ও প্রতিশোধের ত্রিভুজ
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সামনে আসে বাংলাদেশি তরুণ মাহফুজ হকের নাম।
তৎকালীন ২২ বছর বয়সী মাহফুজ ছিলেন ক্রিস্টিন মুটজফেল্ডের সাবেক প্রেমিক। তদন্তে উঠে আসে, ক্রিস্টিন ও টড কেলির সম্পর্ক তিনি মেনে নিতে পারেননি।
আদালতের নথি অনুযায়ী, হত্যার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে এক পার্টিতে মাহফুজ প্রকাশ্যে বলেছিলেন—তাঁর সাবেক প্রেমিকার সঙ্গে যে কেউ সম্পর্ক গড়বে, তাকেই তিনি হত্যা করবেন।
পরে প্রসিকিউশন সেই বক্তব্যকেই মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করে।
হলিউডের সিনেমার মতো পলায়ন
হত্যার পর মাহফুজ হকের পদক্ষেপ যেন একটি ক্রাইম থ্রিলারের চিত্রনাট্য।
প্রথমে তিনি যান ইন্ডিয়ানার অ্যাঙ্গোলায় বাবা-মায়ের বাড়িতে। এরপর এলখার্টে নিজের কর্মস্থলে উপস্থিত হন, যেন কিছুই ঘটেনি।
তারপর শিকাগো গিয়ে পাসপোর্ট নবায়ন করেন।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে গাড়ি চালিয়ে কানাডায় পৌঁছে যান।
সেখান থেকে তাঁর গন্তব্য—বাংলাদেশ।
সেই সময় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকায় তিনি কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের নাগালের বাইরে চলে যান।
নতুন নাম, নতুন পরিচয়, নতুন জীবন
বাংলাদেশে ফিরে মাহফুজ হক নিজের পরিচয় বদলে নেন।
তিনি পরিচিত হন আসিফ হক নামে।
পরবর্তীতে ঢাকার আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে গণিত শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
টেনিস কোচিং করান।
এমনকি একজন ফস্টার প্যারেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বাইরের পৃথিবীতে তিনি হয়ে ওঠেন একজন শিক্ষিত, সম্মানিত শিক্ষক।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে তিনি তখনও ছিলেন একজন পলাতক হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্ত।
এক পরিবারের ২২ বছরের অপেক্ষা
এদিকে টড কেলির পরিবার ন্যায়বিচারের আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করে।
তারা ব্যক্তিগত গোয়েন্দা নিয়োগ দেয়।
পুরস্কার ঘোষণা করে।
ঘটনাটি তুলে ধরে জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান Unsolved Mysteries এবং America’s Most Wanted-এ।
তাদের একটাই লক্ষ্য ছিল—
কেউ যেন মাহফুজ হককে চিনতে পারে।
কেউ যেন তাঁকে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
দিল্লি বিমানবন্দরে ভেঙে যায় দুই দশকের গোপন জীবন
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি।
ঢাকা থেকে টেবিল টেনিস প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশ নিতে ভারতের দিল্লি যান মাহফুজ হক।
সেখানেই ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভারতের সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (CBI) তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও ভারতের সঙ্গে ছিল।
ঠিক সেই আইনি বাস্তবতাই দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পলাতক থাকা মাহফুজ হকের পালিয়ে থাকার পথ বন্ধ করে দেয়।
আদালতে ফিরে আসে ২২ বছর আগের হত্যাকাণ্ড
যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের পর মামলাটি আবার বিচারিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসে।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৩ সালের নভেম্বরে মাহফুজ হক Voluntary Manslaughter (স্বেচ্ছাপ্রণোদিত নরহত্যা) অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন।
এর আগে প্রসিকিউশনের সঙ্গে একটি Plea Agreement-এ পৌঁছান তিনি।
২০১৪ সালের মার্চে স্টিউবেন কাউন্টি সুপিরিয়র কোর্টের বিচারক উইলিয়াম ফি তাঁকে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেন।
অনুতাপ ছিল, কিন্তু পূর্ণ স্বীকারোক্তি ছিল না
রায় ঘোষণার দিন আদালতে মাহফুজ কেঁদেছিলেন।
অনুতাপ প্রকাশ করেছিলেন।
তবে বিচারক উইলিয়াম ফি পর্যবেক্ষণে বলেন—
বাংলাদেশে শিক্ষকতা, কোচিং বা সামাজিক কাজ অনুতাপের ইঙ্গিত দিতে পারে, কিন্তু তিনি কখনোই হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ দায় স্বীকার করেননি।
প্রবেশন বিভাগকে তিনি জানান, ছুরিকাঘাতের ঘটনাটি তাঁর মনে নেই।
ঘটনার বিস্তারিত সম্পর্কেও তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
কেলি পরিবারের জন্য দেরিতে আসা বিচার
আদালতে উপস্থিত ছিলেন নিহত টড কেলির বাবা ভার্ন কেলি এবং বোন শ্যানন কেলি।
শ্যানন আদালতকে জানান, রায় ঘোষণার দিনটি তাঁর মায়ের জন্মদিন।
তিনি চেয়েছিলেন, এই রায়ই হোক তাঁর মায়ের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার।
কিন্তু তাঁর মা পামেলা কেলি সেই দিনটি দেখে যেতে পারেননি।
ছেলের শোক বহন করতেই তিনি কয়েক বছর আগেই মৃত্যুবরণ করেন।
৪০ বছরের সাজা, কিন্তু বাস্তব হিসাব ভিন্ন
আদালতের রায়ে ৪০ বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা হলেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের কারা আইনে আগে আটক থাকার সময় এবং Good Time Credit বিবেচনায় কার্যকর কারাভোগের সময় কমে আসে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেই হিসাবে তাঁর সম্ভাব্য মুক্তির সময় ২০৩০–২০৩১ সালের মধ্যে হতে পারে।
তবে তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন বা এখনও ইন্ডিয়ানা ডিপার্টমেন্ট অব করেকশনের হেফাজতে রয়েছেন কি না—সে বিষয়ে সাম্প্রতিক নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
একটি হত্যা, একাধিক শিক্ষা
মাহফুজ হকের ঘটনা শুধু একটি প্রেমঘটিত হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস নয়।
এটি দেখায়—
- একটি অপরাধ কীভাবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে;
- প্রত্যর্পণ চুক্তির অনুপস্থিতি কীভাবে বিচার বিলম্বিত করতে পারে;
- নতুন পরিচয়ে একজন ব্যক্তি কত দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন;
- এবং শেষ পর্যন্ত, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ন্যায়বিচারের অনুসন্ধান থেমে থাকে না।
শেষ কথা
টড কেলির পরিবার প্রায় ২২ বছর অপেক্ষা করেছে।
একজন অভিযুক্ত নতুন দেশে নতুন পরিচয়ে জীবন গড়েছেন।
কিন্তু অতীত শেষ পর্যন্ত তাঁকে খুঁজে নিয়েছে।
মাহফুজ হকের এই গল্প কেবল একজন পলাতক অভিযুক্তের কাহিনি নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকা একটি পরিবারের বেদনা এবং দেরিতে হলেও বিচার প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
সময় কখনো কখনো বিচারকে বিলম্বিত করে, কিন্তু সব সময় থামিয়ে রাখতে পারে না।




