Homeটুডে নেশন‘জঙ্গি’ তকমার আড়ালে কী লুকিয়েছিল?

‘জঙ্গি’ তকমার আড়ালে কী লুকিয়েছিল?

মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামের মৃত্যু, এক পরিবারের দীর্ঘ কারাবাস, আর রাষ্ট্রের বয়ানকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন

দশকেরও বেশি সময় পরও শেষ হয়নি বিতর্ক—২০১৬ সালের একটি অভিযানের সত্য কী, আর সেই সত্যের মূল্য কে দিচ্ছে?

টুডে টিভি বিডি | ইনভেস্টিগেশন ডেস্ক

কোনো রাষ্ট্র যখন কাউকে “জঙ্গি” ঘোষণা করে, তখন সমাজের বড় একটি অংশ সাধারণত আর প্রশ্ন করে না। সংবাদমাধ্যমে আসে অভিযান, উদ্ধার হওয়া অস্ত্র, সন্ত্রাসবিরোধী সাফল্যের গল্প। কিন্তু ইতিহাস বলছে, প্রতিটি অভিযানের পেছনে আরেকটি গল্পও থাকে—যে গল্পে থাকে পরিবার, সন্তান, আদালত, অভিযোগ এবং কখনো কখনো এমন প্রশ্ন, যার উত্তর বহু বছর পরও পাওয়া যায় না।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম, যিনি পরবর্তীতে মরণোত্তর ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি পান, তাঁকে ঘিরে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমনই একটি বিতর্কিত অধ্যায় রচিত হয়েছে।

২০১৬ সালে তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জঙ্গি সংগঠনের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক দশক পর তাঁর পরিবার বলছে, পুরো ঘটনাই ছিল পরিকল্পিত; তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, এরপর তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের ওপর নেমে এসেছে বছরের পর বছর নিপীড়ন। এই দুই বিপরীত বয়ানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে আদালত, তদন্ত এবং একটি পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা।


একটি অভিযানের পর বদলে যায় সবকিছু

২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকার রূপনগরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হন মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম। সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তিনি নব্য জেএমবির (Neo JMB) গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক এবং গুলশান হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি নেটওয়ার্কের সদস্য। পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনেও একই ধরনের বক্তব্য দেওয়া হয়।

সেই সময় দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। গুলশান হামলার পর জঙ্গিবিরোধী অভিযান জোরদার হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্রের বক্তব্যই জনমনে প্রধান সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

কিন্তু জাহিদের পরিবারের দাবি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তাদের অভিযোগ—এটি কোনো স্বাভাবিক বন্দুকযুদ্ধ ছিল না; বরং পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে ঘটনাটিকে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের আকার দেওয়া হয়েছে।


মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি পরিবারের দুর্ভোগ

জাহিদের মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে আসে তাঁর স্ত্রী জেবুন্নাহার ইসলাম শিলার ওপর।

২০১৬ সালের শেষ দিকে তাঁকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে বিভিন্ন মামলায় রিমান্ডে নেওয়া হয়। আশকোনা অভিযানের পর দুই শিশুসন্তানসহ তাঁর আত্মসমর্পণের ঘটনাও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় তিনি কারাগারে ছিলেন।

তাঁর বড় মেয়ের বয়স তখন মাত্র সাত বছর।

ছোট মেয়ের বয়স ছিল এক বছরেরও কম।

পরিবারের দাবি, ছোট সন্তানটি মায়ের সঙ্গেই কারাগারে বড় হয়েছে।

অন্যদিকে বড় মেয়েকে আত্মীয়দের কাছে রেখে বড় করতে হয়েছে।

একজন মায়ের জন্য এটি ছিল শুধু আইনি লড়াই নয়; ছিল মাতৃত্ব হারানোরও এক নির্মম অধ্যায়।


অভিযোগ: জামিনের পরও থামেনি চাপ

পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েক বছর পর জামিনে মুক্তি পেলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।

তাদের দাবি, তাঁকে বিভিন্ন সময়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। ব্যক্তিগত জীবন, ধর্মীয় অনুশীলন, এমনকি হিজাব পরা নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

টুডে টিভি বিডি স্বাধীনভাবে এসব অভিযোগ যাচাই করতে পারেনি। তবে পরিবার বলছে, এসব ঘটনার কিছুদিন পর তাঁর জামিন বাতিল হয় এবং তাঁকে আবার কারাগারে যেতে হয়।

এই অভিযোগগুলো তদন্ত বা বিচারিকভাবে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।


হারিয়ে যাওয়া বছরগুলো

পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, এই সময়েই ঘটে আরও কিছু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি।

জাহিদের বাবা মারা যান।

পরে তাঁর মা-ও মারা যান।

পরিবারের দাবি, কারাগারে থাকায় জেবুন্নাহার ইসলাম শেষবারের মতো মা-বাবাকে দেখতেও যেতে পারেননি।

এই ঘটনাগুলো বিচারিক নথির অংশ না হলেও পরিবারের বেদনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।


২০২৫: নতুন মোড়

বহু বছর পর মামলাটি আবার আলোচনায় আসে।

জেবুন্নাহার ইসলাম ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে একটি অভিযোগ দাখিল করেন।

সেখানে তিনি অভিযোগ করেন—

  • তাঁর স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
  • এরপর তাঁকে ও সন্তানদের অবৈধভাবে আটক রাখা হয়েছিল।
  • পুরো ঘটনাটি একটি সাজানো রাষ্ট্রীয় অপারেশন ছিল।

অভিযোগে কয়েকজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার নামও উল্লেখ করা হয়।

তবে এ অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন; আদালত বা কোনো তদন্তকারী সংস্থা এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।


রাষ্ট্রের বয়ান বনাম পরিবারের দাবি

এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এখানে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত বয়ান রয়েছে।

রাষ্ট্রের বয়ান

  • জাহিদ ছিলেন জঙ্গি নেটওয়ার্কের সদস্য।
  • নিরাপত্তা অভিযানে তিনি নিহত হন।
  • তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ ছিল।

পরিবারের দাবি

  • তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার।
  • পুরো ঘটনাটি সাজানো হয়েছিল।
  • এরপর পরিবারের ওপর ধারাবাহিক নিপীড়ন চালানো হয়।

এই দুই অবস্থানের মধ্যে কোনটি সত্য—তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আদালত ও তদন্তকারী সংস্থার।


সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

এই মামলার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন কেবল একজন সেনা কর্মকর্তার মৃত্যু নয়।

বরং প্রশ্ন হলো—

রাষ্ট্র যখন কাউকে “সন্ত্রাসী” ঘোষণা করে, তখন সেই সিদ্ধান্তের প্রমাণ, জবাবদিহি এবং বিচারিক পর্যালোচনার মানদণ্ড কী হওয়া উচিত?

একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি নিহত হওয়ার পর তাঁর পরিবারের অধিকার কী?

জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার নামে পরিচালিত অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে তার তদন্ত কতটা স্বাধীনভাবে হয়?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু এই মামলার জন্য নয়; ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।


সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও আলোচনায়

পরিবারের সমর্থকদের অভিযোগ, সে সময়ের কিছু গণমাধ্যম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যকে প্রায় হুবহু প্রকাশ করেছিল এবং বিকল্প বয়ান বা পরিবারের বক্তব্য যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ বলছে, তারা সে সময় সরকারি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যই প্রকাশ করেছে।

এই বিতর্কও এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।


দীর্ঘ ছায়া

জাহিদের মৃত্যুর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেছে।

কিন্তু তাঁর পরিবার বলছে, তাদের জন্য ঘটনাটি এখনো শেষ হয়নি।

একটি মৃত্যু তাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে।

সন্তানদের শৈশব বদলে দিয়েছে।

একজন স্ত্রীকে বছরের পর বছর আদালত, কারাগার ও সামাজিক বিচারের মুখোমুখি করেছে।

আর রাষ্ট্রের জন্যও এই মামলা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছে—সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে পরিচালিত প্রতিটি ঘটনার কি স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছিল?


শেষ কথা

মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্ক এখন আর কেবল অতীতের একটি নিরাপত্তা অভিযানের ইতিহাস নয়।

এটি বিচার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের একটি পরীক্ষাও বটে।

আজও এই মামলায় বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।

রাষ্ট্রের দাবি আছে।

পরিবারের অভিযোগ আছে।

কিন্তু চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণের দায়িত্ব আদালত ও তদন্ত প্রক্রিয়ার।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেই সত্য যত দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, ততই শক্তিশালী হবে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments