হাজারো বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর দাবি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের; নাগরিকত্ব যাচাই ও মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে ঢাকা ও অধিকারকর্মীরা
কলকাতা/ঢাকা | ১০ জুন ২০২৬
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকারের পরিচালিত অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত ও বহিষ্কার অভিযান ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দাবি, ইতোমধ্যে কয়েক হাজার বাংলাদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় যাচাই-বাছাই পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে।
ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে প্রতিদিন শত শত মানুষের জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এদের অনেকেই বাংলাদেশি মুসলিম অভিবাসী, যারা দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিভিন্ন শহরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার ‘শনাক্ত, তালিকা থেকে বাদ ও বহিষ্কার’ নীতির আওতায় অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপ জাতীয় নিরাপত্তা ও অভিবাসন আইন প্রয়োগের অংশ।
সীমান্তে অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর অনিশ্চয়তা
হাকিমপুর সীমান্ত এলাকায় জড়ো হওয়া অনেক পরিবারের দাবি, তারা অর্থনৈতিক কারণে বাংলাদেশ থেকে ভারতে গিয়েছিলেন। কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ বা উন্নত আয়ের আশায় সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন।
খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলার বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী রাইসুল ইসলাম জানান, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে দুই বছর আগে ভারতে যান। সেখানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। সাম্প্রতিক অভিযানের পর স্থানীয় চাপ ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় স্বেচ্ছায় কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরও অনেক অভিবাসী, যারা কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।

নতুন সরকারের কঠোর অবস্থান
মাত্র এক মাস আগে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা বিজেপি সরকার অবৈধ অভিবাসন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, রাজ্যের প্রতিটি জেলায় আটক কেন্দ্র (হোল্ডিং সেন্টার) স্থাপন করা হয়েছে।
সরকারি হিসাবে, প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশিকে ইতোমধ্যে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আরও শত শত মানুষ বর্তমানে বিভিন্ন আটক কেন্দ্রে রয়েছেন।
তবে এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে নতুন চাপ
২০২৪ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক কিছুটা জটিল পর্যায়ে রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত অবস্থান এবং তাকে প্রত্যর্পণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বিদ্যমান।
এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের এই অভিযান নতুন কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে ঢাকা একাধিকবার ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশি হিসেবে শনাক্ত করার আগে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত।
বাংলাদেশ সরকার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, যথাযথ যাচাই ছাড়া কাউকে সীমান্তে ঠেলে পাঠানো হলে তা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করতে পারে।
সীমান্তে মুখোমুখি দুই বাহিনী
বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) জানিয়েছে, জুন মাসের শুরু থেকে একাধিকবার ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কিছু মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে।
অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, তারা বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশকে সন্দেহভাজন নাগরিকদের তথ্য পাঠাচ্ছে এবং নাগরিকত্ব যাচাই সম্পন্ন হওয়ার পরই বহিষ্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ভারতের দাবি অনুযায়ী, দুই হাজারের বেশি সন্দেহভাজন বাংলাদেশির তথ্য ইতোমধ্যে ঢাকার কাছে পাঠানো হয়েছে।
মানবাধিকার প্রশ্নে উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একটি অংশ এই অভিযান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন বলেছেন, বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও আটক ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার থাকা উচিত।
মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, ভুল শনাক্তকরণ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া বহিষ্কারের ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে অতীতে আসামে কিছু ভারতীয় মুসলিম নাগরিককে ভুলভাবে বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ সামনে এসেছিল।
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিতর্ক
এই অভিযানকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, অভিযানের লক্ষ্যবস্তু মূলত মুসলিম অভিবাসীরা। অন্যদিকে বিজেপি বলছে, এটি সম্পূর্ণভাবে অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের বিষয় এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসন প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতির তাৎপর্য কয়েকটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, বিপুলসংখ্যক মানুষের নাগরিকত্ব যাচাই ও পুনর্বাসনের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নতুন পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
তৃতীয়ত, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে এই ইস্যু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উভয় দেশ যদি প্রতিষ্ঠিত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং বিষয়টিকে রাজনৈতিক উত্তেজনার পরিবর্তে প্রশাসনিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিচালনা করে, তাহলে বড় ধরনের কূটনৈতিক সংকট এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
সামনে কী হতে পারে
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—
- বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার গতি;
- সীমান্তে নতুন করে ‘পুশ-ইন’ অভিযোগ বাড়ে কি না;
- আটক কেন্দ্রগুলোতে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে কি না।
দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীর চলমান বৈঠক এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ আগামী কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্যসূত্র
- আল জাজিরা
- বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
- ভারত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
- বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)
- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
- পশ্চিমবঙ্গ সরকার




