দেশীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে উৎপাদন পর্যায়ের ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব; সুবিধা পেতে পারেন ক্রেতারা
ঢাকা | ১০ জুন ২০২৬
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) উৎপাদনে আরোপিত মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। বর্তমানে উৎপাদন পর্যায়ে এসব পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট থাকলেও নতুন বাজেটে তা কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাজারে এসব পণ্যের দাম কিছুটা কমতে পারে এবং দেশীয় শিল্পও বাড়তি সুবিধা পাবে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় কর নীতির পরিবর্তন
এনবিআরের কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও এসির আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশীয় উৎপাদকরা প্রতিযোগিতার চাপের মুখে পড়েছে। উৎপাদন পর্যায়ে তুলনামূলক বেশি ভ্যাট স্থানীয় শিল্পের জন্য বাড়তি ব্যয় তৈরি করছিল।
একজন এনবিআর কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশীয় উৎপাদকদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতার তথ্য পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। ভ্যাট কমানোর মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদনকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভ্যাট কাঠামোয় গত তিন বছরের পরিবর্তন
ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও এসির ক্ষেত্রে উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাটের হার গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।
- ২০২৩-২৪ অর্থবছর: ৫ শতাংশ
- ২০২৪-২৫ অর্থবছর: সাড়ে ৭ শতাংশ
- ২০২৫-২৬ অর্থবছর: ১৫ শতাংশ
- প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছর: সাড়ে ৭ শতাংশ
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ভ্যাট হার আবার অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
দাম কতটা কমতে পারে
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভ্যাট কমার পুরো সুবিধা সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হলে বাজারে ফ্রিজ ও এসির দাম কমতে পারে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ ইলেকট্রনিকস উৎপাদক প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও এসির চাহিদা বর্তমানে বাড়ছে। ভ্যাট কমানো হলে তা স্থানীয় শিল্পের জন্য ইতিবাচক হবে এবং ভোক্তারাও সুবিধা পাবেন।
তবে তিনি নির্দিষ্ট করে কত শতাংশ দাম কমতে পারে, তা উল্লেখ করেননি। তার ভাষ্য, ভ্যাটে যতটা ছাড় দেওয়া হবে, তার প্রভাব গ্রাহক পর্যায়ে প্রতিফলিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে মূল্যহ্রাসের পরিমাণ নির্ভর করবে উৎপাদন ব্যয়, আমদানিকৃত কাঁচামালের দাম, ডলার বিনিময় হার এবং বিপণন ব্যয়ের ওপর। ফলে ভ্যাট ৭.৫ শতাংশ কমলেও খুচরা বাজারে একই হারে দাম কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তাপপ্রবাহের বাজারে বাড়তি স্বস্তির আশা
বর্তমান গ্রীষ্ম মৌসুমে দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় এসি, ফ্রিজ ও রেফ্রিজারেটরের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এমন সময়ে ভ্যাট কমানোর উদ্যোগ ভোক্তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
যমুনা ইলেকট্রনিকসের পরিচালক (বিপণন) সেলিম উল্যা সেলিম বলেন, গত দুই বছর ধরে শিল্পটি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাঁচামালের দাম বেড়েছে এবং পরিচালন ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভ্যাট কমানোর সিদ্ধান্ত শিল্পের জন্য ইতিবাচক বার্তা।
মোবাইল ও ল্যাপটপ শিল্পেও সুবিধা বহাল
প্রস্তাবিত বাজেটে মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ উৎপাদন খাতের বিদ্যমান ভ্যাট সুবিধাও ২০৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী—
- কমপক্ষে দুটি কম্পোনেন্ট স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করলে ভ্যাট ৭.৫ শতাংশ
- সব উপকরণ আমদানি করে শুধু সংযোজন করলে ভ্যাট ১০ শতাংশ
এই সুবিধা অব্যাহত থাকলে স্থানীয় প্রযুক্তি শিল্পে বিনিয়োগ ধরে রাখতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাহাজ ও এলপিজি খাতেও কর-সুবিধা
বাজেট প্রস্তাবে সমুদ্রগামী বড় জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি আরও এক বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৫ হাজার ডিডব্লিউটির বেশি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ আমদানিতে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ভ্যাট দিতে হবে না।
অন্যদিকে এলপিজি গ্যাস আমদানির ওপর বর্তমান সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাটও বহাল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় শিল্পের সামনে এখনও যেসব চ্যালেঞ্জ
যদিও ভ্যাট কমানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন উৎপাদনকারীরা, তবু তাদের দাবি আরও বড়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে—
- কাঁচামালের উচ্চ মূল্য
- ডলারের চাপ
- আমদানিনির্ভর উৎপাদন
- জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি
- অর্থায়নের উচ্চ খরচ
—এসব কারণে শিল্পখাত এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে।
এ কারণে অনেক উৎপাদক এনবিআরের কাছে ফ্রিজ, রেফ্রিজারেটর ও এসির ওপর ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলেন। তবে সরকার আপাতত ভ্যাট অর্ধেকে নামিয়ে আনার পথেই এগোচ্ছে।
সামনে কী
জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর ভ্যাট কমানোর প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে নতুন অর্থবছর থেকেই তা কার্যকর হবে। তখন বাজারে এর বাস্তব প্রভাব কতটা পড়ে এবং ভোক্তারা কতটা মূল্যসুবিধা পান, সেটিই হবে দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র
অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, যমুনা ইলেকট্রনিকস এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পখাত সূত্র।



