দক্ষিণ ইরানে মার্কিন বিমান হামলার জবাবে পাল্টা আঘাতের ঘোষণা তেহরানের; হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে
তেহরান/ওয়াশিংটন | ১০ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলার জবাবে বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, কুয়েতের একটি মার্কিন বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানে মার্কিন সেনা উপস্থিতিসম্পন্ন একটি স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
ইরানি সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, এই হামলাগুলো ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিমান অভিযানের সরাসরি জবাব। তবে হামলার ফলে ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
এর আগে হরমুজ প্রণালির কাছে একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ওয়াশিংটনের দাবি, হেলিকপ্টারটি ইরানি ড্রোনের আঘাতে ভূপাতিত হয়েছিল। যদিও ইরানের কর্মকর্তারা বলেছেন, ঘটনাটি ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়নি।
হরমুজ থেকে আঞ্চলিক সংঘাতে
সংঘাতের সাম্প্রতিক অধ্যায় শুরু হয় হরমুজ প্রণালির আকাশে মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর। ঘটনাটিকে নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দক্ষিণ ইরানের কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়।
মার্কিন বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, জাস্ক, সিরিক ও কেশম দ্বীপে অবস্থিত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার স্থাপনা এবং সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে এই অভিযান পরিচালিত হয়। ওয়াশিংটন একে ‘আত্মরক্ষামূলক ও সমানুপাতিক প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
অন্যদিকে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, হামলায় একটি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সিরিক এলাকায় দুটি পানির সংরক্ষণাগার ধ্বংস হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন নিরাপত্তা সংকট
বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক নৌ-অভিযানের কেন্দ্রবিন্দু। একইভাবে কুয়েত ও জর্ডানের ঘাঁটিগুলোও মার্কিন সামরিক উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলার দাবি আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আশঙ্কা করছে যে সংঘাতটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হামলার পর বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নাগরিকদের সতর্ক থাকার এবং প্রয়োজন হলে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
শক্তির প্রদর্শন নাকি পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের সূচনা?
আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মার্কিন আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে উচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের সংকল্পের পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ইরান কোনো হামলা বা হুমকিকে জবাবহীন রাখবে না।
তার ভাষায়, “নিরাপদ থাকতে চাইলে অঞ্চল ছেড়ে চলে যান।”
এই বক্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক সরাসরি মার্কিন সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব কেন এত বেশি
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রতিদিন এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ফলে এই অঞ্চলে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়লে—
- আন্তর্জাতিক তেলের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে;
- জাহাজ চলাচলের বীমা ব্যয় বেড়ে যেতে পারে;
- জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে;
- বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষ করে এশিয়ার জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর হিসাব
ওয়াশিংটনের জন্য এই সংকট শুধু সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব ও প্রতিরোধ ক্ষমতারও পরীক্ষা।
অন্যদিকে ইরান দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে আসছে। সাম্প্রতিক পাল্টা হামলার দাবি তেহরানের সেই অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। কারণ সংঘাতের বিস্তার হলে তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিও সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশ এই সংঘাতের সরাসরি অংশ নয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা বাড়লে এর অর্থনৈতিক অভিঘাত বাংলাদেশের ওপরও পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে—
- আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে;
- বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে;
- সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে;
- মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
সামনে কোন পথ
বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাবনা সামনে রয়েছে।
প্রথমত, সীমিত সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে উভয় পক্ষ সংঘাতকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, নতুন হামলা বা হতাহতের ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা শুরু হতে পারে।
তবে বর্তমানে উভয় পক্ষের বক্তব্য ও সামরিক পদক্ষেপ বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্য অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে অবস্থান করছে।
তথ্যসূত্র
- আল জাজিরা
- সেন্টকম (US Central Command)
- আইআরজিসি
- ফার্স নিউজ এজেন্সি
- ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
- সংশ্লিষ্ট সরকারি বিবৃতি



