ইসলাম ধর্ম গ্রহণ ও বিয়ের পর প্রতারণা; আদালতের নির্দেশ অমান্য করে সন্তানসহ আত্মগোপনে বাংলাদেশি স্ত্রী
ঢাকা | ২০ মে ২০২৬
রোদ হোক বা বৃষ্টি—বিগত প্রায় তিন বছর ধরে ঢাকার নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালতের করিডোরে প্রতিদিন একাকী হেঁটে চলেন মার্কিন নাগরিক গ্যারিসন রবার্ট লুট্রেল। নিজের দুই সন্তানকে ফিরে পাওয়া, স্ত্রীর করা একটি একতরফা ও অবৈধ তালাকনামাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং নিজের পিতৃত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এক জনাকীর্ণ ভিন্ন দেশে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এই আমেরিকান ব্যবসায়ী। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার গোলকধাঁধায় আটকে থাকা এই বিদেশি নাগরিকের করুণ আকুতি এখন ঢাকার আদালত পাড়ার এক পরিচিত দৃশ্য।
প্রেম, ধর্ম পরিবর্তন ও দাম্পত্যে ফাটল
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৬ সালের ৩ জুন। যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের একটি বারে বাংলাদেশি তরুণী ফারহানা করিমের সঙ্গে পরিচয় হয় মার্কিন তরুণ গ্যারিসন লুট্রেলের। ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন ধর্ম থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ভালোবাসার টানে পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন লুট্রেল। ২০১৮ সালের ৩ আগস্ট মুসলিম শরিয়াহ্ ও মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রেই শুরু হয় তাদের দাম্পত্য জীবন এবং সেখানে তাদের প্রথম সন্তান ‘ফাতমির ওয়াল ইকরাম লুট্রেল’ জন্ম নেয়।
লুট্রেলের অভিযোগ অনুযায়ী, ভালোই চলছিল তাদের সংসার। তবে ২০২৩ সালের শুরুতে ফারহানা দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হওয়ার পর সম্পর্কে তীব্র ফাটল ধরে। ওই বছরের জুনে ফারহানা তাঁর মা ও বোনের পরিচর্যার কথা বলে সন্তানসহ বাংলাদেশে চলে আসেন। দেশে আসার পর থেকে তিনি স্বামীর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ রহস্যজনকভাবে বন্ধ করে দেন। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে গ্যারিসন নিয়মিত অর্থ পাঠিয়ে আসছিলেন, কিন্তু স্ত্রীর কোনো সাড়া পাননি।
বাংলাদেশে এসে পরকীয়া ও জালিয়াতির আবিষ্কার
দীর্ঘদিন যোগাযোগ করতে না পেরে ২০২৩ সালের অক্টোবরে গ্যারিসন লুট্রেল নিজেই বাংলাদেশে ছুটে আসেন। ফারহানা দেখা করতে অস্বীকৃতি জানালে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ ও স্থানীয়দের সহায়তায় তিনি স্ত্রীর উত্তরাস্থ বাসায় যান। সেখানে গিয়ে গ্যারিসন জানতে পারেন, ফারহানা করিম ৬২ বছর বয়সী এক কানাডিয়ান নাগরিকের (রেইডাস কুইটিন) সঙ্গে বসবাস করছেন এবং নিজেকে তাঁর বিবাহিত স্ত্রী বলে দাবি করছেন। শুধু তাই নয়, এক মাস আগে জন্ম নেওয়া দ্বিতীয় সন্তানকে ফারহানা গ্যারিসনের সন্তান নয় বলে হাসপাতালের কাগজ দেখান।
এরই মধ্যে গ্যারিসনের নামে পুরান ঢাকার একটি কাজী অফিস থেকে পাঠানো মুসলিম পারিবারিক আইনের একতরফা তালাকনামার নোটিশ আসে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তালাকনামা সম্পূর্ণ অবৈধ ও ভিত্তিহীন। কারণ তাদের বিয়ে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট অব মিসৌরির আইন অনুযায়ী, যার বিচ্ছেদ বাংলাদেশের কাজী অফিস থেকে একতরফাভাবে করা যায় না। তাছাড়া, তালাকের নোটিশ ইস্যু করার সময় ফারহানা গর্ভবতী ছিলেন, যা মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ীও অবৈধ।
আদালতের দ্বারে দ্বারে ও স্ত্রীর আত্মগোপন
এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে গ্যারিসন বাংলাদেশে দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন এবং সন্তানদের নিজের জিম্মায় পেতে হাইকোর্টে একটি ‘হেবিয়ার্স কর্পাস’ রিট পিটিশন দাখিল করেন। ২০২৩ সালের ২৮ নভেম্বর বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ আদেশে বলেন, ঢাকার উত্তরা ক্লাবে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার বড় ছেলের সঙ্গে বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সময় কাটাতে পারবেন লুট্রেল। পরবর্তীতে আদালত মামলাটি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে ঢাকার পারিবারিক আদালতকে নির্দেশ দেন।
তবে গ্যারিসন লুট্রেলের আইনি পরামর্শদাতাদের অভিযোগ, আদালতের এই সুস্পষ্ট আদেশ অমান্য করে এবং জিম্মার শর্ত স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে ফারহানা করিম সন্তানসহ অজ্ঞাত স্থানে পালিয়ে আত্মগোপন করেছেন। উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ প্রতিবেদনেও ফারহানার বাসা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ফারহানার জিম্মার আদেশ বাতিল করেছেন এবং দ্রুত ভিকটিম শিশুকে উদ্ধার করে আদালতে উপস্থাপনের জন্য ঢাকা পুলিশ কমিশনার ও উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে আদালতের আদেশ অমান্য করায় ফারহানার আইনজীবীকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
📊 ঘটনার সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র
- ভুক্তভোগী: গ্যারিসন রবার্ট লুট্রেল (মার্কিন নাগরিক)।
- অভিযুক্ত স্ত্রী: ফারহানা করিম (সিরাজদিখান, মুন্সিগঞ্জ ও উত্তরা, ঢাকা)।
- বিয়ের তারিখ: ৩ আগস্ট ২০১৮ (মিসৌরি, যুক্তরাষ্ট্র)।
- মামলার সংখ্যা: উভয়পক্ষে এ পর্যন্ত প্রায় ১৬টি মামলা দায়ের হয়েছে।
- বর্তমান পরিস্থিতি: স্ত্রী সন্তানসহ আত্মগোপনে; পুলিশকে শিশু উদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
দেশের প্রেমে মজেছেন গ্যারিসন
আইনি মারপ্যাঁচে বিগত প্রায় তিন বছর ধরে বাংলাদেশে আটকে থাকলেও এ দেশের সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় মুগ্ধ গ্যারিসন লুট্রেল। তাঁর আইনজীবী ব্যারিস্টার সজীব মাহমুদ আলম জানান, “রাস্তায় বা আদালতে সাধারণ মানুষ যেভাবে গ্যারিসনকে নৈতিক সমর্থন দিয়েছে, তাতে তিনি বাংলাদেশের মানুষের প্রেমে পড়েছেন।” সন্তানদের ফিরে পাওয়ার পাশাপাশি গ্যারিসন এখন বাংলাদেশে একটি ‘নট ফর প্রফিট’ চ্যারিটি সংস্থা খোলার কাজ শুরু করেছেন। এই চ্যারিটির মাধ্যমে তিনি বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের গ্রামীণ ঐতিহ্য তুলে ধরা এবং স্থানীয় মাদ্রাসা, এতিমখানা ও মসজিদ-মন্দিরে অর্থায়নের পরিকল্পনা করছেন।
ফেসবুক ও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে গ্যারিসন বলেন,
“আমি শুধু চাই বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী আমার সন্তানের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হোক এবং তাকে দ্রুত আমার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।”
তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক পটপরিবর্তন দেখলেও এই মার্কিন বাবার ভাগ্য এখনো আদালতের বারান্দায় ঝুলছে, যা আন্তর্জাতিক বিয়ে ও আইনি ফাঁকফোকরের এক বড় নজির।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পারিবারিক আদালত কার্যবিবরণী, হাইকোর্ট রিট পিটিশন রেকর্ড, উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবী প্যানেল (ব্যারিস্টার সজীব মাহমুদ ও এডভোকেট মিজানুর রহমান), মে ২০২৬।



