ইউক্রেনের রাজধানীসহ একাধিক অঞ্চলে রাশিয়ার বড় আকারের হামলায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন। সীমান্তের কাছাকাছি বিস্ফোরণের পর পোল্যান্ডও যুদ্ধবিমান আকাশে তোলে; ফলে যুদ্ধের প্রভাব আবারও ন্যাটো ভূখণ্ডের কাছাকাছি পৌঁছানোর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কিয়েভ, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ দেশটির কয়েকটি অঞ্চলে ১৭ সেপ্টেম্বর রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, কিয়েভে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন এবং মোট আটটি অঞ্চলে হামলার প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামোর পাশাপাশি জ্বালানি ও যোগাযোগ-সংশ্লিষ্ট স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের হিসাবে, কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় রাতভর হামলায় অন্তত ১৯ জন আহত হন, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। ওদেসা ও জাপোরিঝঝিয়াসহ অন্য এলাকাতেও আবাসিক ভবন ও বিভিন্ন স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
সীমান্তের কাছাকাছি হামলায় পোল্যান্ডের যুদ্ধবিমান
ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি হামলার পর পোল্যান্ড বিমানবাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় নেয়। রয়টার্স জানিয়েছে, রাশিয়ার হামলার কারণে পোল্যান্ডের আকাশসীমার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় যুদ্ধবিমান আকাশে ওঠে। রজেসজভ ও লুবলিন বিমানবন্দরের কার্যক্রমও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
এ ঘটনায় পোল্যান্ড সরাসরি আক্রান্ত হয়েছে—এমন দাবি করা হয়নি। তবে সীমান্তের এত কাছে হামলা হওয়ায় ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও আলোচনায় এসেছে।
ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই দিনে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি নতুন ড্রোন হামলার কথা জানান। স্থানীয় ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সীমান্ত চৌকিতে হামলা হয়নি। তবে কাছাকাছি একটি জ্বালানি স্টেশনের আশপাশে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।
কৃষ্ণসাগরে বেসামরিক জাহাজও হামলার শিকার
রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলায় শুধু স্থলভাগ নয়, কৃষ্ণসাগরের একটি বেসামরিক জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, তানজানিয়ার পতাকাবাহী একটি জাহাজে রুশ হামলায় এর ক্যাপ্টেন নিহত এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এই ঘটনা যুদ্ধের সামুদ্রিক মাত্রা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে কৃষ্ণসাগর দিয়ে বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন গুরুত্বপূর্ণ হলেও সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।
জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলা
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জ্বালানি অবকাঠামো এখনো অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু। সাম্প্রতিক হামলায় ইউক্রেনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর পাশাপাশি রাশিয়ার তেল স্থাপনাও পাল্টা হামলার মুখে পড়ছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ইউক্রেন রাশিয়ার ইয়ারোস্লাভল অঞ্চলের একটি তেল শোধনাগারে হামলার দাবি করেছে। অন্যদিকে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের বিভিন্ন বিদ্যুৎ ও শিল্প স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের বিষয়ে আলোচনা হলেও তা বাস্তবে থামেনি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এমন একটি সীমিত সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চললেও মাঠের বাস্তবতায় হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ইউরোপের নিরাপত্তায় বাড়ছে চাপ
সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও অন্যান্য ন্যাটো সদস্যের আশপাশে ড্রোন ও সামরিক তৎপরতার ঘটনা ইউরোপের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে আরও জটিল করেছে। ন্যাটো এরই মধ্যে পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা জোরদারের কথা জানিয়েছে।
পোল্যান্ডের সীমান্তের কাছে হামলা ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ সক্রিয় করেছে—এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে সীমান্তের কাছাকাছি সামরিক তৎপরতা বাড়লে ভুল হিসাব, দুর্ঘটনাজনিত উত্তেজনা বা আরও বড় নিরাপত্তা সংকটের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো সতর্ক রয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম শীতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। ফলে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি আসন্ন শীত মৌসুমে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কতটা বাড়ে, সেদিকেও আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে।
তথ্যসূত্র: Reuters, Associated Press (AP), DW




