সৌদি তেল অবকাঠামোয় হামলার পর বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ; হরমুজ দিয়ে দিনে মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের তথ্য
রিয়াদ | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে সৌদি আরবে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র চারটি কমোডিটি বা পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১০। অথচ ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ শুরুর আগে এই জলপথে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত।
হরমুজে কেন এত কমেছে জাহাজ চলাচল
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের দৈনিক অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয়।
চলমান সংঘাতের কারণে জাহাজ মালিক ও অপারেটররা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। অনেক জাহাজ এই রুট এড়িয়ে যাচ্ছে, আবার কিছু জাহাজ তাদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বন্ধ রেখে চলাচল করছে। ফলে প্রকৃত জাহাজ চলাচল সরকারি বা বাণিজ্যিক ডেটায় আরও বেশি হতে পারে।
এদিকে ইরানি সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, হরমুজে একটি তেলবাহী ট্যাংকার মাইনে আঘাত পেয়ে বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। ঘটনার সময় সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সৌদি ঘাঁটিতে হুথিদের হামলা
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিরা সোমবার সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের খামিস মুশাইত সামরিক ঘাঁটিতে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে।
হুথিদের দাবি, হামলায় বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, রাডার ব্যবস্থা, রানওয়ে ও গোলাবারুদের গুদাম লক্ষ্য করা হয়েছে। তারা বলেছে, ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন হামলার জবাবে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হামলায় ১৩ জন আহত হয়েছেন এবং কয়েকটি বাড়ি ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সৌদি তেল সরবরাহেও বড় চাপ
এর আগে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দরে তেল লোডিং কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরব ইউরোপের জন্য কিছু তেল সরবরাহ স্থগিত করেছে। এতে পোল্যান্ডের মতো বড় ক্রেতারা বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
পাইপলাইনটি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগর উপকূলে তেল পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। ফলে হরমুজে কোনো বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে এই পাইপলাইনের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
তেলের দাম ছুটছে ওপরে
সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের প্রভাব সরাসরি পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২ দশমিক ৮১ ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ৪৯ ডলারে ওঠে। মার্কিন ডব্লিউটিআইয়ের দামও প্রায় ৩ দশমিক ২৯ ডলার বেড়ে ১০৪ দশমিক ৬৮ ডলারে পৌঁছায়।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, সৌদি আরবের সরবরাহ সমস্যা, লিবিয়ার কয়েকটি তেলক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ এবং হরমুজে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার মতো ঘটনা একসঙ্গে চলতে থাকলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
কূটনীতির পথেও অনিশ্চয়তা
হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌচলাচল নিয়ে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর আলোচনাও পিছিয়ে গেছে। ওমানের মধ্যস্থতায় সম্ভাব্য বৈঠক স্থগিত হওয়ায় সংঘাত কমানোর কূটনৈতিক উদ্যোগ নতুন ধাক্কা খেয়েছে।
ফলে হরমুজ এখন শুধু একটি সামুদ্রিক পথ নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: Reuters, Associated Press (AP), Al Jazeera, The Guardian।




