Homeটুডে ওয়ার্ল্ডগামাল আবদেল নাসের: আরব জাতীয়তাবাদের স্থপতি, বিপ্লবী সেনা কর্মকর্তা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের কিংবদন্তি...

গামাল আবদেল নাসের: আরব জাতীয়তাবাদের স্থপতি, বিপ্লবী সেনা কর্মকর্তা থেকে মধ্যপ্রাচ্যের কিংবদন্তি নেতা

বিশ শতকের মধ্যভাগে আরব বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়া যে কয়েকজন নেতার নাম ইতিহাসে স্থায়ীভাবে লেখা আছে, তাদের মধ্যে গামাল আবদেল নাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল। তিনি শুধু মিসরের রাষ্ট্রপতি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি স্বপ্নের নাম—আরব ঐক্য, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং তৃতীয় বিশ্বের আত্মনির্ভরতার প্রতীক।

কারও কাছে তিনি ছিলেন “আরবদের মুক্তিদূত”, কারও কাছে “স্বৈরাচারী জাতীয়তাবাদী”; তবে একটি বিষয়ে ইতিহাস প্রায় একমত—নাসের ছাড়া আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস কল্পনা করা কঠিন।

জন্ম ও শৈশব: সাধারণ পরিবার থেকে রাজনৈতিক সচেতনতার সূচনা

গামাল আবদেল নাসের জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায়। তাঁর বাবা ছিলেন ডাক বিভাগের একজন সাধারণ কর্মচারী। চাকরির কারণে পরিবারকে বিভিন্ন শহরে থাকতে হতো, ফলে নাসের ছোটবেলা থেকেই মিসরের নানা সামাজিক বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন।

শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন কৌতূহলী এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন। তখনকার মিসর ছিল কার্যত ব্রিটিশ প্রভাবাধীন। বিদেশি আধিপত্য ও রাজতন্ত্রের প্রতি মানুষের ক্ষোভ তাঁর কিশোর মনেও গভীর প্রভাব ফেলে।

মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি প্রথম রাজনৈতিক বিক্ষোভে অংশ নেন। ১৯৩৫ সালে ব্রিটিশবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে পুলিশের লাঠিচার্জের মুখোমুখি হন এবং সাময়িকভাবে আটকও হন।

সেই অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি তৈরি করে।

শিক্ষা: বইয়ের পাশাপাশি সেনাশৃঙ্খলার পাঠ

নাসেরের শিক্ষাজীবন খুব বেশি অভিজাত ছিল না। তিনি কায়রোর বিভিন্ন স্কুলে পড়াশোনা করেন।

তাঁর সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া। কিন্তু তখন সামরিক একাডেমিতে প্রবেশের সুযোগ মূলত অভিজাত পরিবারের সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

অনেক বাধা পেরিয়ে ১৯৩৭ সালে তিনি মিসরের রয়্যাল মিলিটারি একাডেমিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।

সেখানে তাঁর পরিচয় হয় কয়েকজন তরুণ অফিসারের সঙ্গে—যারা পরবর্তীতে মিসরের রাজনীতি বদলে দেবেন।

এই সময় তিনি গভীরভাবে পড়তেন:

• নেপোলিয়ন বোনাপার্ট
• মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক
• মহাত্মা গান্ধী
• আরব জাতীয়তাবাদ বিষয়ক বই

সামরিক প্রশিক্ষণ এবং রাজনৈতিক দর্শনের এই মিশ্রণই পরবর্তী নাসেরকে তৈরি করে।

সেনা কর্মকর্তা থেকে বিপ্লবী

সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর নাসের সুদানে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

মিসরসহ আরব রাষ্ট্রগুলো সেই যুদ্ধে পরাজিত হয়। নাসের মনে করেন দুর্বল নেতৃত্ব, দুর্নীতি এবং অদক্ষ রাজতন্ত্রই এই পরাজয়ের কারণ।

এরপর তিনি কয়েকজন তরুণ সামরিক কর্মকর্তাকে নিয়ে গঠন করেন:

ফ্রি অফিসার্স মুভমেন্ট

এই সংগঠনের লক্ষ্য ছিল—

• রাজতন্ত্রের অবসান
• বিদেশি প্রভাব দূর করা
• জাতীয় পুনর্গঠন

১৯৫২ সালের বিপ্লব: নতুন মিসরের জন্ম

১৯৫২ সালের জুলাই।

নাসের এবং তাঁর সহযোগীরা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান।

রাজা ফারুককে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

প্রথমদিকে Muhammad Naguib সামনে থাকলেও খুব দ্রুত নাসের প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠেন।

১৯৫৬ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মিসরের রাষ্ট্রপতি হন।

তখন থেকেই শুরু হয় তাঁর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রকল্প—

আধুনিক মিসর গঠন।

সুয়েজ সংকট: বিশ্বমঞ্চে নাসেরের উত্থান

১৯৫৬ সালে নাসের এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন যা তাঁকে আরব বিশ্বের নায়ক বানিয়ে দেয়।

তিনি জাতীয়করণ করেন Suez Canal।

এই খাল এতদিন ব্রিটিশ ও ফরাসি নিয়ন্ত্রণে ছিল।

প্রতিক্রিয়ায়:

• ব্রিটেন
• ফ্রান্স
• ইসরায়েল

মিসরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়।

কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থানের কারণে হামলাকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

সুয়েজ সংকটের পর নাসের শুধু মিসরের নেতা ছিলেন না—তিনি আরব বিশ্বের প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত হন।

আরব জাতীয়তাবাদের স্বপ্ন

নাসের বিশ্বাস করতেন, বিভক্ত আরব রাষ্ট্রগুলো একত্রিত হওয়া উচিত।

তাঁর স্বপ্ন ছিল:

এক জাতি, এক আরব পরিচয়

এই ধারণা “নাসেরবাদ” নামে পরিচিতি পায়।

১৯৫৮ সালে মিসর ও সিরিয়া এক হয়ে গঠন করে:

United Arab Republic

যদিও এই রাজনৈতিক পরীক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবুও নাসেরের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছে যায়।

মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বহু স্বাধীনতাকামী আন্দোলন তাঁকে অনুসরণ করতে শুরু করে।

নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম মুখ

শীতল যুদ্ধের সময়ে নাসের যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়নের কোনো শিবিরে পুরোপুরি যেতে চাননি।

তিনি ভারতের Jawaharlal Nehru, যুগোস্লাভিয়ার Josip Broz Tito এবং ইন্দোনেশিয়ার Sukarno–এর সঙ্গে মিলে নিরপেক্ষ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।

এটি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে একটি স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান দেয়।

পরিবার ও ব্যক্তিগত জীবন

নাসের ১৯৪৪ সালে তাহিয়া কাজেমকে বিয়ে করেন।

তাঁদের পাঁচ সন্তান ছিল।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তুলনামূলক সংযত ছিলেন।

তিনি জাঁকজমকপূর্ণ জীবন পছন্দ করতেন না।

মিসরের অনেক মানুষ তাঁকে নিজেদের মতো একজন সাধারণ মানুষ বলে মনে করত।

তাঁর ভাষণ ছিল অত্যন্ত আবেগপূর্ণ এবং জনমোহিনী।

কায়রো রেডিওতে তাঁর ভাষণ শুনতে আরব বিশ্বের লাখো মানুষ অপেক্ষা করত।

পতনের শুরু: ছয় দিনের যুদ্ধ

১৯৬৭ সালে নাসেরের রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে।

Six-Day War-এ মিসর, সিরিয়া এবং জর্ডান ইসরায়েলের কাছে ভয়াবহভাবে পরাজিত হয়।

মাত্র ছয় দিনে:

• সিনাই উপদ্বীপ হারায় মিসর
• আরব সামরিক শক্তির ভাবমূর্তি ভেঙে পড়ে

এই পরাজয়ের পর নাসের টেলিভিশনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

কিন্তু লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে এবং তাঁকে ক্ষমতায় থাকার আহ্বান জানায়।

শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ প্রত্যাহার করেন।

মৃত্যু এবং উত্তরাধিকার

১৯৭০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গামাল আবদেল নাসের মারা যান।

তাঁর মৃত্যুর পর কায়রোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।

এটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ শোকযাত্রা হিসেবে বিবেচিত হয়।

আজও নাসেরকে দুইভাবে দেখা হয়—

একদিকে তিনি আরব বিশ্বের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রতীক।

অন্যদিকে সমালোচকেরা তাঁকে রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনকারী এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা নেতা হিসেবে দেখেন।

তবুও একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা কঠিন—

গামাল আবদেল নাসের শুধু একটি দেশের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি যুগের রাজনৈতিক কল্পনা, যিনি আরব বিশ্বের আত্মপরিচয়কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments