‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকের দিনই মমতার দলে বড় বিপর্যয়; শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে দিল্লিতে নাটকীয় বৈঠক
নয়াদিল্লি | ৮ জুন ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর এবার ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়ল তৃণমূল কংগ্রেস। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১০ বা ১১ জুনের দিকে দলটিতে ভাঙন ধরার কথা থাকলেও, দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শুরুর দিনই, অর্থাৎ আজ ৮ জুন সোমবার তৃণমূলের সংসদীয় দলে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে।
আজ বেলা ১১টার দিকে রাজ্যসভায় তৃণমূলের প্রবীণ ও প্রভাবশালী মুখ সুখেন্দু শেখর রায় রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেন। কেবল সংসদ সদস্য পদই নয়, একই সঙ্গে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্যপদও ত্যাগ করেছেন। ইস্তফা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সুখেন্দু শেখর বলেন, “দল যেভাবে চলা উচিত ছিল, সেভাবে চলেনি। এত বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ খতিয়ে দেখার বা বিশ্লেষণ করার কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। নির্বাচনের ফলাফলই প্রমাণ করে যে জনগণ এই দলের ওপর আস্থা হারিয়েছে এবং দল জনমন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।”
সুখেন্দু শেখর রায়ের এই নাটকীয় ইস্তফার পরপরই তৃণমূলের এক ঝাঁক বিক্ষুব্ধ সংসদ সদস্য দিল্লির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের জন্ম দেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সাংসদেরা এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। দল ছাড়ার ঘোষণা দিলেও সুখেন্দু শেখর রায় নিজেও এই বৈঠকে যোগ দেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী।
বিদ্রোহী এই ব্লকের অন্যতম শীর্ষ নেত্রী তথা বারাসাতের সংসদ সদস্য কাকলি ঘোষ দস্তিদার সংবাদমাধ্যমকে জানান, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীই মূলত এই বৈঠকের সমন্বয় ও আহ্বান করেছেন। বৈঠকে তৃণমূলের হেভিওয়েট এবং পরিচিত এক ঝাঁক তারকা মুখসহ বহু সাংসদ উপস্থিত ছিলেন।
📊 লোকসভার শক্তি ও দলত্যাগের আইনি সমীকরণ
সংসদে দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-Defection Law) এড়াতে এবং পৃথক স্বাধীন ব্লক তৈরি করতে দলটির মোট লোকসভা সাংসদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ বা ২১ জন সদস্যের সমর্থনের প্রয়োজন।
| লোকসভায় তৃণমূলের মোট আসন | দল ভাঙার আইনি প্রয়োজনীয়তা (২/৩ অংশ) | বিক্ষুব্ধ শিবিরের দাবি (উপস্থিতি) | বিজেপি সূত্রের দাবি |
| ২৮টি | ২১ জন | ১৯ জন | ২১ জন |
বিজেপির নীতিনির্ধারকদের একাংশ তৃণমূল নেতাদের সরাসরি দলে নেওয়ার ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তি জানালেও, লোকসভা ও রাজ্যসভায় এই সাংসদদের সমর্থনের ওপর তারা ব্যাপক জোর দিচ্ছে। বিজেপির মূল লক্ষ্য হলো দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা, যাতে ভবিষ্যতে সংবিধানে যেকোনো বড় ধরনের সংশোধনী বিল পাস করাতে কোনো বাধার মুখে পড়তে না হয়।
👥 বৈঠকে উপস্থিত উল্লেখযোগ্য সাংসদ ও তারকা মুখেরা
- টলিউডের জনপ্রিয় তারকা সাংসদ: শতাব্দী রায়, জুন মালিয়া, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দেব (দীপক অধিকারী)।
- অন্যান্য প্রভাবশালী সাংসদ: প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় (হাওড়া), অসিত মাল (বীরভূম), পার্থ ভৌমিক (বারাকপুর), বাপি হালদার (মথুরাপুর), জগদীশ বাসুনিয়া (কোচবিহার), শর্মিলা রায় সরকার (বর্ধমান পূর্ব) এবং কালীপদ সোরেন (ঝাড়গ্রাম)।
- অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নাম: আবু তাহের, খলিলুর রহমান এবং সাবেক তারকা ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠান।
🧭 ‘ইন্ডিয়া’ জোট ও মমতা-অভিষেকের জন্য বড় ধাক্কা
যখন দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বাড়িতে তৃণমূলের ২০ জন সাংসদ মোর্চা গঠনের আলোচনা করছেন, ঠিক তখনই তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লির বিরোধী শিবিরের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শীর্ষ বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। নিজেদের দলের সাংসদদের এই আকস্মিক বিদ্রোহ এবং বিজেপির পাশে দাঁড়ানোর এই প্রক্রিয়া বিরোধী জোটের ফ্রন্টেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্য চরম বিড়ম্বনা তৈরি করেছে।
🏥 অবসান ঘটছে দীর্ঘ বিরোধের: পশ্চিমবঙ্গে আসছে ‘আয়ুষ্মান ভারত’
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আজ দিল্লিতে এসে রাজ্যে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প ‘আয়ুষ্মান ভারত’ (Ayushman Bharat) চালুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সাড়ে ছয় কোটি মানুষ সরাসরি বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও কেন্দ্রীয় ৫ লাখ টাকার বিমার আওতাভুক্ত হতে পারবেন। উল্লেখ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন এই প্রকল্পকে পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়ন করতে তীব্র অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, যা নিয়ে দীর্ঘদিন কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত চলে আসছিল।
📌 তথ্যসূত্র: নতুন দিল্লি সংসদীয় কার্যবিবরণী ও বিজেপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রেস নোট।




