বিনোদন বিশ্লেষণ | Today TV BD
ঈদুল আজহায় মুক্তিপ্রাপ্ত আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা সেন’ এখন দেশের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছে। কবি জীবনানন্দ দাশের জীবন, স্মৃতি, প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও সৃষ্টিশীলতার অন্তর্লোককে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র নিয়ে দর্শক ও সাহিত্যপ্রেমীদের আগ্রহ ছিল অনেক দিনের। পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের নান্দনিক নির্মাণশৈলী এবং চলচ্চিত্রটির পোস্টার প্রকাশের পর থেকেই প্রত্যাশার পারদ ছিল উঁচুতে।
তবে সিনেমাটি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি চরিত্রকে আলাদা করে উল্লেখ করতেই হয়—‘শোভনা’। আর এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী অভিনেত্রী রুপন্তী আকিদ।
বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে জীবনানন্দ দাশ শুধু একজন কবি নন; তিনি এক রহস্যময় অনুভূতির নাম। তাঁর কবিতা, ডায়েরি ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা অনুচ্চারিত অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক নারীর নাম—শোভনা। অনেক গবেষকের মতে, জীবনানন্দের দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের অন্যতম গভীর আবেগ ও প্রেরণার উৎস ছিলেন এই শোভনা।
চলচ্চিত্র ‘বনলতা সেন’-এ রুপন্তী আকিদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল একটি বাস্তব চরিত্রকে কেবল অভিনয় করা নয়, বরং তাকে সময়, স্মৃতি এবং কবিতার ভেতর থেকে পুনর্জন্ম দেওয়া।
গবেষক গৌতম মিত্রের লেখায় উঠে এসেছে, ১৯২০ ও ৩০-এর দশকের সেই সম্পর্কের গল্প, যেখানে একদিকে ছিলেন বিবাহিত কবি জীবনানন্দ দাশ, অন্যদিকে কিশোরী শোভনা। ডিব্রুগড় থেকে কলকাতা, পরে শিলং—যেখানে গেছেন শোভনা, সেখানেই কোনো না কোনোভাবে উপস্থিত হয়েছেন জীবনানন্দ।
এই সম্পর্ককে শুধুমাত্র প্রেম বলে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। এতে ছিল আকর্ষণ, দূরত্ব, প্রত্যাখ্যান, প্রত্যাশা, বিষাদ এবং অসম্পূর্ণতার দীর্ঘ ছায়া। জীবনানন্দের ডায়েরিতে বারবার ফিরে এসেছে ‘Y’ নামের এক রহস্যময় চরিত্র, যাকে গবেষকরা শোভনা বলেই চিহ্নিত করেন।
গৌতম মিত্রের এই লেখাটি সত্যিই এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করে। জীবনানন্দ দাশের ডায়েরির সেই রহস্যময় ‘Y’ বা ‘বেবি’, যিনি আদতে কবির মামাতো বোন শোভনা দাশ—তাঁর জীবনের এই অন্ধকার ও আলোর মিশ্রণটাই ‘বনলতা সেন’ সিনেমাটিকে দেখার আগ্রহ এক ধাক্কায় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের নান্দনিক ভিজ্যুয়াল সেন্স এবং কাস্টিং চয়েস (শোভনা চরিত্রে সিডনিপ্রবাসী রুপন্তী আকিদ এবং জীবনানন্দের চরিত্রে খায়রুল বাসার) যে এই ঈদে দর্শকদের এক ভিন্নমাত্রার কাব্যিক ও মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা দিতে যাচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আপনার ঈদের ওয়াচলিস্টে থাকা ‘রইদ’-এর পাশাপাশি ‘বনলতা সেন’ সিনেমাটির এই ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটকে যুক্ত করে একটি নান্দনিক পাঠ-পর্যালোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:
⏳ ১৯৩২-এর ডায়াশেসন থেকে ১৯২৯-এর ডিব্রুগড়: এক নিষিদ্ধ টানাপোড়েন
গৌতম মিত্রের চমৎকার গবেষণাধর্মী লেখাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনানন্দের সাহিত্যিক প্রেরণার এক বিশাল অংশ জুড়ে ছিলেন এই শোভনা। সম্পর্কটা কেবল প্লেটোনিক বা আত্মিক ছিল না; কবির ডায়েরির নিজস্ব ভাষায় তা ছিল রীতিমতো ‘fleshy’ বা শারীরিক।
- ১৮ বছরের শোভনা ও ৩৩ বছরের মিলুদা: ডায়াশেসন কলেজের হস্টেলের নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা বিবাহিত জীবনানন্দ (মিলুদা) অবহেলা সহ্য করেও বারবার ছুটে যেতেন তাঁর ১৮ বছর বয়সী প্রেমিকার কাছে।
- ডিব্রুগড়ের সেই দীর্ঘ রাত: ১৯২৯ সালে ডিব্রু নদীর পাড়ে ক্লাস নাইনের ছাত্রী ‘বেবি’র (শোভনা) কাছে কবিতা শোনানোর অছিলায় ছুটে যাওয়া এবং এক অলৌকিক রাতে দুজনে একা কাটানো—যা পরবর্তীতে জন্ম দিয়েছিল ‘ক্যাম্পে’ কিংবা ‘হাওয়ার রাত’-এর মতো কালজয়ী সব কবিতা।
📉 জীবনানন্দের ডায়েরি ও বাইবেলের ‘হেরোদিয়াসের কন্যা’
গৌতম মিত্রের লেখায় উঠে আসা সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হলো—পরবর্তী জীবনে এই গভীর প্রেম কীভাবে তীব্র হতাশায় রূপ নিয়েছিল। ১৯৫০ সালের দিকে শোভনা যখন ল্যান্সডাউনের বাড়িতে যেতেন, তখন জীবনানন্দের চেয়ে তাঁর স্ত্রী লাবণ্য দাশের সাথেই বেশি আড্ডা হতো। জীবনানন্দ তাঁর ডায়েরিতে তীব্র ফ্রাস্ট্রেশনের কারণ হিসেবে বারবার লিখেছেন ‘Y’ বা এই শোভনার কথা।
“আমার frustration-এর কারণ এই Herodias’s Daughter (হেরোদিয়াসের কন্যা)।”
— জীবনানন্দ দাশ (তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে)
বাইবেলের গল্প অনুসারে, রানী হেরোদিয়াসের প্ররোচনায় তাঁর কন্যা সালোমে যেভাবে সন্ত জন দ্য ব্যাপটিস্টের খণ্ডিত মস্তক উপহার চেয়েছিলেন, জীবনানন্দও কি পারিবারিক ও মানসিক জটিলতার আবর্তে নিজের সত্তাকে সেই বলিদত্ত জনের জায়গায় কল্পনা করেছিলেন? এই জটিল মনস্তত্ত্বই সিনেমাটিতে রুপন্তী আকিদের অভিনয়কে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ এবং একই সাথে দারুণ সুযোগের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
🎭 কাস্টিং ও এক্সিকিউশনের নান্দনিকতা [এক নজরে চরিত্র ও প্রত্যাশা]
| চরিত্রের নাম | ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট | পর্দায় যিনি ফুটিয়ে তুলছেন | প্রত্যাশা ও নির্মাণশৈলী |
| শোভনা দাশ (বেবি) | জীবনানন্দের মামাতো বোন, প্রথম প্রেম এবং ‘ক্যাম্পে’ কবিতার মূল প্রেরণা। | রুপন্তী আকিদ | সিডনিপ্রবাসী এই অভিনেত্রীর মার্জিত ও ক্ল্যাসিক লুক শোভনার ১৮ ও পরবর্তী রূপের সাথে দারুণ মাননসই। |
| জীবনানন্দ দাশ (মিলুদা) | বিষাদ, ট্রমা, লিবিডো এবং কবিতার সমীকরণে বন্দি এক কালজয়ী কবি। | খায়রুল বাসার | তাঁর মাইম ব্যাকগ্রাউন্ড এবং গম্ভীর কণ্ঠ জীবনানন্দের মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণে নিখুঁত আবহ তৈরি করবে। |
| বনলতা সেন | কবির চিরন্তন অন্বেষণ ও আকাঙ্ক্ষার রূপক নারী। | মাসুমা রহমান নাবিলা | প্রথাগত সৌন্দর্যের বাইরে এক দৃঢ় ও ব্যক্তিত্বময়ী নারীর অবয়ব। |
অনেক সাহিত্য সমালোচকের মতে, জীবনানন্দের সৃষ্ট জগতে ‘বনলতা সেন’, ‘সুচেতনা’, ‘সুরঞ্জনা’ কিংবা আরও অনেক নারীমূর্তির আড়ালে কোথাও না কোথাও শোভনার প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এটি কেবল একটি প্রেমের গল্প বলার চেষ্টা করেনি। বরং দেখানোর চেষ্টা করেছে এমন এক সম্পর্ক, যা কখনো পূর্ণতা পায়নি, কিন্তু সৃষ্টিশীলতাকে অনন্তকাল জ্বালানি জুগিয়েছে।
শোভনার চরিত্রকে ঘিরে যে সাহিত্যিক ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা রয়েছে, তা পর্দায় বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা সহজ কাজ নয়। কারণ এখানে চরিত্রের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার প্রভাব। শোভনা যতটা একজন মানুষ, তার চেয়েও বেশি তিনি জীবনানন্দের স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা এবং অপূর্ণতার প্রতীক।
রুপন্তী আকিদের অভিনয় নিয়ে দর্শকদের আগ্রহের অন্যতম কারণও এখানেই। তাকে শুধু সংলাপ বললেই চলবে না; তাকে বহন করতে হবে জীবনানন্দের কবিতার ভেতরে ছড়িয়ে থাকা নীরব আবেগকে।
জীবনানন্দের ডায়েরিতে শোভনাকে ‘হেরোদিয়াসের কন্যা’ বলে উল্লেখ করার বিষয়টিও গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। বাইবেলের সালোমে চরিত্রের সঙ্গে এই তুলনা ছিল কবির গভীর হতাশা, বেদনা এবং ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের এক প্রতীকী প্রকাশ। সেই মানসিক সংঘাত, আকর্ষণ ও আঘাতের মিশ্র অনুভূতি ‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রে কতটা শক্তিশালীভাবে ফুটে উঠেছে, সেটিই এখন দর্শক মূল্যায়ন করছেন।
বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্যভিত্তিক কাজ খুব বেশি হয় না। আর জীবনানন্দ দাশের মতো জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট একজন কবিকে নিয়ে কাজ করা তো আরও কঠিন। সেই জায়গা থেকে ‘বনলতা সেন’ নিঃসন্দেহে একটি উচ্চাভিলাষী প্রয়াস।
সিনেমাটি দেখার পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—শোভনা এখানে কেবল একটি চরিত্র নন। তিনি জীবনানন্দের সৃষ্টিশীলতার এক দীর্ঘ ছায়া, এক অসমাপ্ত প্রেমের নাম, এক অনন্ত অনুসন্ধানের প্রতীক।
আর সেই শোভনাকে পর্দায় ধারণ করার দায়িত্ব নিয়েছেন রুপন্তী আকিদ। চলচ্চিত্রটির সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ‘শোভনা’ চরিত্রটি যে দর্শকদের মধ্যে নতুন করে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে, সে বিষয়ে সন্দেহের খুব বেশি অবকাশ নেই।



