চিকিৎসা শেষ মানেই পুরোপুরি সুস্থতা নয়, দীর্ঘদিন থাকতে পারে ফুসফুস, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি
একসময় যক্ষ্মা বা টিবি ছিল মৃত্যুদণ্ডের মতো ভয়ঙ্কর রোগ। আধুনিক চিকিৎসার কারণে এখন এটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। তবে চিকিৎসা শেষ করে রোগী সুস্থ ঘোষিত হলেও সব ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো বলছে, যক্ষ্মা থেকে সেরে ওঠার পরও অনেক রোগী দীর্ঘমেয়াদে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যক্ষ্মা শুধু একটি সংক্রমণ নয়; এটি ফুসফুস, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
আবারও কি যক্ষ্মা হতে পারে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর—হ্যাঁ।
গবেষণায় দেখা গেছে, যক্ষ্মা থেকে সুস্থ হওয়া ব্যক্তিদের একটি অংশ ভবিষ্যতে আবারও টিবিতে আক্রান্ত হন। এই অবস্থাকে বলা হয় “রিকারেন্স” বা পুনরাক্রমণ।
এটি দুইভাবে ঘটতে পারে—
১. রিল্যাপ্স (Relapse):
প্রথম সংক্রমণের কিছু জীবাণু শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থেকে যায় এবং পরে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
২. রিইনফেকশন (Reinfection):
রোগী নতুন করে অন্য কারও কাছ থেকে যক্ষ্মার জীবাণুতে আক্রান্ত হন।
গবেষণা অনুযায়ী, চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর প্রথম ২ থেকে ৩ বছর পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
বিশেষ করে যাদের—
- ডায়াবেটিস আছে,
- ওষুধ নিয়মিত খাননি,
- ফুসফুসে বড় ধরনের ক্ষত ছিল,
- আগে MDR-TB হয়েছিল, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি।
যক্ষ্মা সেরে গেলেও মৃত্যুঝুঁকি কেন বাড়ে?
এটি সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি।
বিভিন্ন দেশের দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, যক্ষ্মা থেকে সুস্থ হওয়া ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি হতে পারে।
ব্রাজিলের বিশাল এক গবেষণায় দেখা গেছে—
- রোগ শনাক্ত হওয়ার প্রথম বছরে মৃত্যুঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ১১ গুণ বেশি।
- দ্বিতীয় বছরেও ঝুঁকি প্রায় ৩.৫ গুণ বেশি থাকে।
- এমনকি ১০ বছর পরও মৃত্যুঝুঁকি পুরোপুরি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যক্ষ্মা একজন মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৩ থেকে ৪ বছর পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।
ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি: সবচেয়ে বড় সমস্যা
যক্ষ্মার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে ফুসফুসে।
অনেক রোগীর ফুসফুসে স্থায়ী ক্ষত বা দাগ (Scar) থেকে যায়। এর ফলে তৈরি হয় Post-TB Lung Disease (PTLD)।
এই রোগীদের মধ্যে দেখা দিতে পারে—
দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট
সিঁড়ি ভাঙা, হাঁটা বা সামান্য পরিশ্রমেও শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
ব্রঙ্কিয়েক্টেসিস
ফুসফুসের শ্বাসনালী স্থায়ীভাবে প্রসারিত হয়ে যায়।
ফলে—
- দীর্ঘদিন কাশি থাকে,
- নিয়মিত কফ বের হয়,
- বারবার সংক্রমণ হয়।
COPD
যক্ষ্মার ইতিহাস থাকা ব্যক্তিদের COPD হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
এটি এমন একটি রোগ, যেখানে ফুসফুস ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা হারাতে থাকে।
হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ে
যক্ষ্মা শুধু ফুসফুস নয়, হৃদপিণ্ডকেও প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যক্ষ্মা শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করে। এই প্রদাহ রক্তনালীর ভেতরে চর্বি জমার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে।
ফলে বাড়তে পারে—
- হার্ট অ্যাটাক,
- স্ট্রোক,
- এনজাইনা,
- রক্তনালীর ক্ষতি।
একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, যক্ষ্মা থেকে সেরে ওঠা মানুষের হৃদরোগের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ে
গবেষকদের মতে, যক্ষ্মা থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ২ থেকে ৩ গুণ বেশি হতে পারে।
কারণ, যক্ষ্মার ফলে ফুসফুসে তৈরি হওয়া স্থায়ী ক্ষত বা দাগের জায়গা থেকে পরবর্তীতে ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় Scar Carcinoma।
এ কারণে যাদের ফুসফুসে দীর্ঘদিনের ক্ষত রয়েছে, তাদের নিয়মিত চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে থাকা প্রয়োজন।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
গবেষণাগুলো অনুযায়ী নিচের ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ—
- ৪০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ
- পুরুষ রোগী
- ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তি
- এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তি
- ধূমপায়ী
- অপুষ্টিতে ভোগা মানুষ
- MDR-TB রোগী
- যারা ওষুধ নিয়মিত গ্রহণ করেননি
সুস্থ থাকার জন্য কী করবেন?
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দিতে বলেছেন।
নিয়মিত ফলো-আপ
চিকিৎসা শেষ হলেও নির্দিষ্ট সময় অন্তর চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শ্বাসের ব্যায়াম
- ডিপ ব্রিদিং
- ডায়াফ্রামেটিক ব্রিদিং
- ইনসেনটিভ স্পাইরোমেটার ব্যবহার
ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
পুষ্টিকর খাদ্য
খাদ্যতালিকায় রাখতে হবে—
- ডিম
- মাছ
- মাংস
- দুধ
- ডাল
- ফলমূল
- সবজি
ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন
ধূমপান ফুসফুসের ক্ষতি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
প্রয়োজনীয় টিকা
বিশেষজ্ঞদের মতে—
- বার্ষিক ফ্লু ভ্যাকসিন
- কোভিড-১৯ বুস্টার
- নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন
ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুসকে সুরক্ষা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উপসংহার
যক্ষ্মা এখন নিরাময়যোগ্য রোগ হলেও এর প্রভাব অনেক সময় চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও থেকে যায়। ফুসফুসের স্থায়ী ক্ষতি, হৃদরোগ, ক্যান্সার এবং দীর্ঘমেয়াদি মৃত্যুঝুঁকির মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই যক্ষ্মা থেকে সুস্থ হওয়া মানেই স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পূর্ণ শেষ নয়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, পুষ্টিকর খাদ্য এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।



